১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

ভারতে এবার জরাজীর্ণ সরকারি  ‘স্কুল ঠিক করো’ আন্দোলনে ককরোচ জনতা পার্টি

গ্রামীণ ও জরাজীর্ণ সরকারি স্কুল মেরামতে সিজেপি ভারতের স্বাধীনতার দিন থেকেই  ‘স্কুল ঠিক করো’ নামের দেশব্যাপী সংস্কার ও পরিদর্শন কর্মসূচি শুরু করেছে।

ভারতে এবার জরাজীর্ণ সরকারি  ‘স্কুল ঠিক করো’ আন্দোলনে ককরোচ জনতা পার্টি
স্কুলের ছাদ থেকে খসে পড়ছে প্লাস্টার। ছবি: বিবিসি

নিউজ ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 21 Aug 2026, 06:22 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:52 PM

ভারতের রাজধানী দিল্লির উপকণ্ঠে হরিয়ানার ফরিদাবাদ জেলার খেড়ি কালান গ্রাম। 

সেখানে মেয়েদের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একতলা দোচালা ভবনটি দূর থেকে বেশ রঙিন আর পরিচ্ছন্ন দেখায়, সম্প্রতি নতুন করে রঙ করা হয়েছে। কিন্তু ভেতরে ঢুকতেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক করুণ বাস্তবতা।

স্কুলের সামনের রাস্তায় নোংরা কাদাপানিতে ভরা খানাখন্দ। চত্বরে দাঁড়িয়ে স্থানীয় সামাজিক কর্মী সতপাল নরওয়াত আঙুল তুলে দেখান ছাদ থেকে খসে পড়া প্লাস্টার। 

“বাইরে থেকে নতুন দেখালেও ভেতরে ভবনটি ধসে পড়ছে। আটটি শৌচাগারের চারটিই বর্জ্যে ভরা ও ব্যবহার অনুপযোগী। আর নয়টি শ্রেণিকক্ষের মধ্যে চারটিই পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে, কারণ সেগুলো শিশুদের জন্য বিপজ্জনক,” বলছিলেন নরওয়াত। 

তিনি আরও জানান, বর্ষার দিনে শ্রেণিকক্ষগুলো প্লাবিত হলে শিক্ষার্থীদের বসার আর কোনো জায়গা থাকে না।

এটি ভারতের কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বিশেষ করে গ্রামীণ ভারতের হাজার হাজার সরকারি স্কুল পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ ও নজরদারির অভাবে জরাজীর্ণ অবস্থায় ধুঁকছে।

'স্কুল ঠিক করো' আন্দোলন

সরকারি স্কুলের এই বেহাল পরিকাঠামোর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নেমেছে ভারতের বহুল আলোচিত ব্যঙ্গাত্মক আন্দোলনের দল  ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)। 

মে মাসে ভারতের মেডিকেল প্রবেশিকা পরীক্ষা ‘নিট’-এর প্রশ্নপত্র ফাঁসের পর প্রায় ২০ লাখ পরীক্ষার্থী ভোগান্তিতে পড়ে এবং অন্তত ২০ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করে। 

এর প্রতিবাদে দিল্লির যন্তর মন্তরে সপ্তাহের পর সপ্তাহ চলা সিজেপি-র বিক্ষোভ বিশ্বজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করেছিল, যার জেরে গত মাসে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন ভারতের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান।

শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের পর ককরোচ পার্টি তাদের নতুন কর্মসূচির নাম দিয়েছে ‘#স্কুলঠিককরো’ (#ফিক্সদ্যস্কুল)। এর মূল লক্ষ্য, গ্রামাঞ্চলের অবহেলিত সরকারি স্কুলগুলোর ভগ্নদশা তুলে ধরে কর্তৃপক্ষের ওপর রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা।

সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে বিবিসি-কে বলেন, “গ্রামীণ ভারতের সরকারি স্কুলগুলো কয়েক দশক ধরে চরম অবহেলার শিকার। গ্রামের শিশুরা শহরের শিশুদের মতো সুযোগ-সুবিধা পায় না; ফলে পড়ালেখা শেষে বাধ্য হয়ে তারা কৃষিকাজ, দিনমজুরি বা নির্মাণশ্রমিকের কাজে নামছে।”

বৃহস্পতিবার দীপকে জানান, তিনি দেশের ২০টিরও বেশি গ্রামীণ স্কুল ঘুরে দেখেছেন এবং একটিও ভালো পরিবেশের স্কুল পাননি। 

তিনি বলেন, “কোথাও বসার বেঞ্চ নেই, বাথরুম নেই, সুপেয় পানি নেই। এমনকি পশুপাখিও এমন জায়গায় রাখা যায় না। ২০ বছর আগে স্কুলে গরমের ছুটিতে গ্রামে গিয়ে যা দেখেছিলাম, আজ এত বছর পরও কিছুই বদলায়নি।”

ইনস্টাগ্রামে ২ কোটি ৬০ লাখ অনুসারী থাকা সিজেপির নেতারা ফুটো ছাদ, নোংরা শৌচাগার ও মেঝেতে বসে ক্লাস করা শিক্ষার্থীদের অসংখ্য ভিডিও শেয়ার করছেন। 

দীপকে বলেন, “আমরা চাই শিশুরা অন্তত বসার বেঞ্চ, ব্যবহারযোগ্য বাথরুম ও সুপেয় পানি পাক। তাদের জন্য স্মার্ট ক্লাসরুম দরকার, যাতে তারা অনুভব করতে পারে যে শহরের শিশুদের মতোই তারাও সমানমানের শিক্ষা পাচ্ছে।”

শিক্ষার্থীদের নিজেদের মোবাইল বিদ্রোহ

ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) এই উদ্যোগের পর ভারতের বিভিন্ন প্রান্তের শিক্ষার্থীরা নিজেদের মোবাইল ফোনে স্কুলের বেহাল দশার ভিডিও ধারণ করে সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করতে শুরু করেছে, যা স্থানীয় প্রশাসনকে পদক্ষেপে বাধ্য করছে, মহারাষ্ট্রের রায়গড়ে স্কুলে যাওয়ার রাস্তার অবস্থা নিয়ে কয়েকজন ছাত্রী ভিডিও বানিয়ে তা সামাজিক মাধ্যমে দিলে কর্তৃপক্ষ দ্রুত রাস্তাটি মেরামত করে।

উত্তর প্রদেশে শিক্ষার্থীরা সরাসরি জেলা প্রশাসকের দপ্তরে ঢুকে রাস্তা তৈরির দাবিতে বিক্ষোভ করে। অন্য একটি ভিডিওতে এক ছাত্রীকে জেলা কর্মকর্তাকে সরাসরি প্রশ্ন করতে দেখা যায়, তিনি নিজের সন্তানকে এমন জরাজীর্ণ স্কুলে পাঠাবেন কি না।

সাংবাদিক ও লেখক নীলাঞ্জন মুখোপাধ্যায় বলেন, “যন্তর মন্তরের আন্দোলন শুধু একটি পরীক্ষা বা মন্ত্রীর পদত্যাগের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। মানুষ পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার গলদ নিয়ে কথা বলছিল।  ‘#ফিক্সদ্যস্কুল’ বা স্কুল ঠিক করো আন্দোলনটি একটি দীর্ঘস্থায়ী ও শক্তিশালী রূপ নিতে চলেছে।”

তবে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সরকার কিংবা তার দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ককরোচ পার্টির এই আন্দোলন নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনও মন্তব্য করেনি।

জিডিপির কত শতাংশ শিক্ষায় খরচ করে ভারত?

ভারত তাদের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) মাত্র ৪ দশমিক ১ শতাংশ শিক্ষায় ব্যয় করে। এটি ইউনেস্কোর নির্ধারিত সর্বনিম্ন ৪ শতাংশের সীমা ছুঁলেও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে বেশ পিছিয়ে। 

ফ্রান্স, জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশগুলো শিক্ষায় জিডিপির ৫ শতাংশের বেশি ব্যয় করে, বেলজিয়াম বা সুইডেন ব্যয় করে আরও বেশি। ভারত সরকারের নিজস্ব ‘জাতীয় শিক্ষা নীতি’ (এনইপি) এবং শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা এই বাজেট বরাদ্দ অন্তত ৬ শতাংশ করার সুপারিশ করেছিলেন।

সরকারি তথ্যানুযায়ী, ২০১৪-১৫ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মধ্যে ভারতে প্রায় ৯৪ হাজার সরকারি স্কুল বন্ধ হয়ে গেছে। 

সরকারি নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান 'নীতি আয়োগ'-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা বাড়াতে কিছু স্কুল একীভূত করা হলেও মানসম্মত অবকাঠামোর অভাবে বেসরকারি স্কুলের প্রতি ঝোঁক বাড়ায় সরকারি স্কুলে শিক্ষার্থী ভর্তির হার আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে।

শিক্ষক সংকট ও সামাজিক বৈষম্য

স্কুলগুলোর বেহাল অবস্থার পেছনে আরেকটি বড় কারণ হল শিক্ষক ও অন্যান্য কর্মীর সংকট। ফরিদাবাদের খেড়ি কালানের পাশেই আত্মাদপুর গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এবং হরিয়ানা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির কোষাধ্যক্ষ চতর সিং এক করুণ পরিসংখ্যান তুলে ধরেন।

চতর সিং জানান, তাদের স্কুলে ৯১০ জন শিক্ষার্থীর জন্য ৪০ জন শিক্ষক বরাদ্দ থাকলেও বুধবার বিবিসি যখন পরিদর্শনে যায়, সেদিন দেখা যায় ভোটার তালিকা হালনাগাদের কাজে ৩০ জন শিক্ষককে পাঠিয়েছে সরকার। চারজন অসুস্থ থাকায় মাত্র ৬ জন শিক্ষককে দিয়ে ৯১০ জন শিক্ষার্থীকে সামলাতে হচ্ছে।

“শিক্ষকদের কাজ পড়ানো, কিন্তু সরকার তাদের আদমশুমারি ও নির্বাচনের কাজে নিয়োজিত করে। জুলাই মাস থেকেই আমার বেশিরভাগ শিক্ষক ভোটার তালিকার কাজে ব্যস্ত। এতে শিক্ষার মান ধসে পড়ছে,” আক্ষেপ চতর সিংয়ের।

তিনি আরও বলেন, “কোনও আমলা বা রাজনীতিকের সন্তান কি সরকারি স্কুলে পড়ে? না। তারা সামর্থ্য অনুযায়ী সন্তানকে বেসরকারি স্কুলে পাঠায়। সরকারি স্কুলে মূলত কারখানা শ্রমিক ও সমাজের অনগ্রসর সম্প্রদায়ের সন্তানরাই পড়ে, যে কারণে এটি দিনের পর দিন অবহেলিত।”

খেড়ি কালান গ্রামের ৬২ বছর বয়সী সতপাল নরওয়াত ১৯৬৮ থেকে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত এই বালিকা বিদ্যালয়েই পড়াশোনা করেছিলেন, তখন এটি পুরো গ্রামের একমাত্র যৌথ বিদ্যালয় ছিল। 

প্রায় ১৫ বছর আগে স্কুলের বাইরের রাস্তাটি উঁচু করার কারণে প্রাঙ্গণটি নিচু হয়ে জমা পানির মারাত্মক সমস্যা তৈরি হয়। নরওয়াত বহু বছর ধরে মুখ্যমন্ত্রী থেকে শুরু করে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে আবেদন করেও ফল পাননি।

তবে সিজেপির লড়াই মানুষকে ভয় না পেয়ে অধিকার আদায়ের সুযোগ তৈরি করে দেওয়ায় তিনি নতুন করে আশাবাদী হয়ে উঠছেন।