১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

ট্রাম্প ডাকছেন আলোচনায়, আরাকচি রাশিয়ায়

সোমবার দিনের শুরুতে এশিয়ার বাজারে তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী এবং মার্কিন স্টক ফিউচারের অধোগতি দেখা গেছে।

ট্রাম্প ডাকছেন আলোচনায়, আরাকচি রাশিয়ায়
ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচিকে সেন্ট পিটার্সবার্গে স্বাগত জানাচ্ছেন রুশ কর্মকর্তারা। ছবি: টেলিগ্রাম/রয়টার্স

নিউজ ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 27 Apr 2026, 02:03 PM

Updated : 26 Aug 2026, 03:29 PM

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, যুদ্ধ বন্ধে আলোচনা চাইলে ইরান যুক্তরাষ্ট্রকে টেলিফোন করতে পারে। 

তার এ আহ্বানের কিছুক্ষণের মধ্যেই সোমবার ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি রাশিয়ায় নেমেছেন, তিনি সেখানে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সমর্থন চাইতে গেছেন বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

ট্রাম্প শনিবার তার দুই দূত স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনারের ইসলামাবাদ সফর বাতিল করে দেওয়ার পর থেকেই তেহরান-ওয়াশিংটন শান্তি প্রচেষ্টা পুনরুজ্জীবনের সম্ভাবনা ফিকে হয়ে যায়। 

এর মধ্যেই রোববার আরাকচি দুই মধ্যস্থতাকারী দেশ ওমান ও পাকিস্তান ঘুরে যান, এরপর রওনা দেন রাশিয়ার উদ্দেশ্যে। 

২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ইরানে হামলায় নামলে মধ্যপ্রাচ্যে শুরু হয় রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। তেহরান ইসরায়েলের পাশাপাশি উপসাগরীয় দেশগুলোতে থাকা মার্কিন স্বার্থ সংশ্লিষ্ট স্থাপনায় লাগাতার ক্ষেপণাস্ত্র-ড্রোন পাঠিয়ে জবাব দিতে থাকে। পাশাপাশি বন্ধ করে দেয় হরমুজ প্রণালি। পাল্টাপাল্টি এ ‍যুদ্ধ বিশ্বজুড়ে তেলের দাম বাড়িয়ে দেয়, বিশ্ব অর্থনীতিকে অস্থির করে তোলে। 

পরে ৮ এপ্রিল থেকে দুই পক্ষের মধ্যে যুদ্ধবিরতি শুরু হয়; কিন্তু ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও হরমুজের ভবিষ্যৎ নিয়ে তেহরান ও ওয়াশিংটন এখনও দুই মেরুতে থাকায় শান্তি প্রচেষ্টা সামনে এগোচ্ছে না।

সোমবার দিনের শুরুতে এশিয়ার বাজারে তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী এবং মার্কিন স্টক ফিউচারের অধোগতি দেখা গেছে।

“তারা যদি কথা বলতে চায়, তারা আমাদের কাছে আসতে পারে বা ফোন করতে পারে। আপনারা জানেন, টেলিফোন আছে। আমাদের রয়েছে চমৎকার, নিরাপদ লাইন।

“তারা জানে ‍চুক্তিতে কী থাকতে হবে। খুবই সহজ- তাদের পারমাণবিক অস্ত্র থাকতে পারবে না। তা না হলে দেখা করার কোনো কারণ নেই,” ফক্স নিউজের ‘দ্য সানডে ব্রিফিংয়ে’ ট্রাম্প এমনটাই বলেছেন।

এদিকে ইরান চাইছে, ওয়াশিংটন তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকারকে স্বীকৃতি দিক। তেহরানের দাবি, তারা শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে ব্যবহারের লক্ষ্যেই ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য পশ্চিমা দেশগুলোর অভিযোগ, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার সুযোগ কাজে লাগিয়ে ইরান যে কোনো সময় পারমাণবিক অস্ত্র বানিয়ে ফেলতে পারে।  

দেশের ভেতর চাপে ট্রাম্প

রোববার এক প্রতিবেদনে অ্যাক্সিওস জানায়, যুদ্ধ বন্ধ ও অর্থনৈতিকভাবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ইরান যুক্তরাষ্ট্রকে নতুন প্রস্তাব দিয়েছে। একইসঙ্গে তারা পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা পরবর্তী পর্যায়ের জন্য মুলতুবি রাখতে চায়। 

অনামা এক মার্কিন কর্মকর্তা ও বিষয়টি সম্বন্ধে অবগত দুটি সূত্রের বরাত দিয়ে এ খবর দেয় অ্যাক্সিওস। তাদের এ প্রতিবেদন বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও হোয়াইট হাউসের কোনো মন্তব্য যোগাড় করতে পারেনি রয়টার্স। 

জনসমর্থন কমতে থাকা ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রে তুমুল অজনপ্রিয় এ যুদ্ধ থামাতে দেশের ভেতর ব্যাপক চাপের মুখে রয়েছেন।  

এদিকে যুদ্ধের কারণে সামরিকভাবে তুলনামূলক দুর্বল হয়ে পড়লেও হরমুজ প্রণালিতে নৌচলাচল বন্ধ করে দিয়ে আলোচনায় নিজেদের সুবিধাজনক অবস্থান ধরে রাখতে পেরেছে তেহরান। যুদ্ধের আগে ওই প্রণালি দিয়েই বিশ্বের তেল-গ্যাসের এক পঞ্চমাংশ সরবরাহ হতো। 

ইরান প্রণালিটি কার্যত বন্ধ করে রাখায় যুক্তরাষ্ট্রও সম্প্রতি সব ইরানি বন্দরের ওপর অবরোধ আরোপ করেছে। 

আরাকচি রোববার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার অন্যতম মধ্যস্থতাকারী ওমানে আলোচনা শেষে ফের একবার পাকিস্তান যান, এরপর সেখান থেকে রাশিয়ার উদ্দেশ্যে উড়াল দেন। 

“বহিঃশত্রুর হুমকির মুখে দেশের স্বার্থ এগিয়ে নেওয়ার কূটনৈতিক জিহাদের ধারাবাহিকতায় আরাকচি পুতিনের সঙ্গে দেখা করবেন,” এক্সে দেওয়া পোস্টে এমনটাই বলেছেন রাশিয়ায় ইরানের দূত কাজেম জালালি।

“স্বাধীন ও ন্যায়প্রত্যাশী দেশের পাশাপাশি যেসব দেশ এককেন্দ্রীক ও পশ্চিমা আধিপত্যমুক্ত বিশ্ব চায় তাদের বিরুদ্ধে বিশ্বের সর্বগ্রাসী শক্তিগুলোর অভিযানের মধ্যে ইরান ও রাশিয়া একটি ঐক্যবদ্ধ ফ্রন্ট হিসেবে হাজির হয়েছে,” বলেছেন তিনি। 

শনিবার আরাকচি যখন পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করছিলেন, সেসময় ফ্লোরিডায় দেওয়া বক্তৃতায় ট্রাম্প জানান, তিনি তার দূতদের ইসলামাবাদ সফর বাতিল করে দিয়েছেন।

“ইরান অনেক কিছু দিতে চায়, কিন্তু সেসব যথেষ্ট নয়,” বলেছিলেন তিনি। 

একইদিন ইরানি প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ফোনে পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফকে বলেন, হুমকি বা অবরোধের মুখে ‘চাপিয়ে দেওয়া আলোচনায়’ যাবে না তেহরান। 

যুক্তরাষ্ট্রকে আগে তার নৌ-অবরোধসহ সব বাধা সরিয়ে নিতে হবে, এরপর আলোচকরা একটি সমাধানের ভিত্তি স্থাপনের কাজ শুরু করবেন, পেজেশকিয়ান এ কথা বলেছেন বলে ইরানের বিবৃতিতে জানানো হয়েছে।

লেবানন, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিয়েও মতপার্থক্য

তেহরান ও ওয়াশিংটনের বিরোধ কেবল পারমাণবিক কর্মসূচি ও হরমুজ প্রণালিতেই আটকে নেই। এর বাইরেও অনেক ইস্যুতে দুই পক্ষের মধ্যে দূরত্ব ব্যাপক। 

ট্রাম্প চান, লেবাননের হিজবুল্লাহ ও গাজার হামাসের মতো আঞ্চলিক বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রতি ইরানের সমর্থনের মাত্রা কমাতে। পাশাপাশি ইরান যেন তাদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে ইসরায়েলসহ মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন মিত্র দেশগুলোর ওপর আঘাত হানতে না পারে তারও নিশ্চয়তা চান তিনি।

অন্যদিকে ইরান চায়, তাদের ওপর দেওয়া সব নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হোক, এবং ইসরায়েল হিজবুল্লাহ’র ওপর আক্রমণ বন্ধ করুক। 

রোববারও লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ১৪ জন নিহত ও ৩৭ জন আহত হয়েছে বলে জানিয়েছে লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। 

ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী দক্ষিণ লেবাননে তাদের দখল করা স্বঘোষিত ‘বাফার জোনের’ বাইরের ৭টি শহর থেকেও বাসিন্দাদের সরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। 

ইসরায়েল-লেবানন যুদ্ধবিরতির আগেই ওই তথাকথিত ‘বাফার জোন’টির নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিল ইসরায়েল। দুই পক্ষের মধ্যে যুদ্ধবিরতি এখনও চলছে, তবে এই যুদ্ধবিরতিও দক্ষিণ লেবাননে সহিংসতা থামিয়ে রাখতে পারছে না।