৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৪ আশ্বিন ১৪৩৩

সুপার এল নিনিও: যেভাবে মোকাবিলার প্রস্তুতি নিচ্ছে বিভিন্ন দেশ

এল নিনিওর প্রভাব অনুভূত হতে শুরু করায় পুরো পৃথিবী এখন ‘চরম প্রতিকূল আবহাওয়ার বিপজ্জনক অঞ্চলে’ প্রবেশ করেছে বলে সতর্ক করেছেন জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস।

সুপার এল নিনিও: যেভাবে মোকাবিলার প্রস্তুতি নিচ্ছে বিভিন্ন দেশ

সম্প্রতি ঢাকায় তাপপ্রবাহের সময় মাথায় পানি ঢালছেন এক রিকশাচালক। ফাইল ছবি।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 30 Sep 2026, 01:05 AM

Updated : 30 Sep 2026, 01:07 AM

পৃথিবীর জলবায়ুতে ক্রমেই স্পস্ট হচ্ছে প্রকৃতির ধ্বংসাত্মক খামখেয়ালিপনা সুপার এল নিনিওর প্রভাব। কোন অঞ্চল পুড়ছে তীব্র তাপপ্রবাহে, কোথাও চলছে অতিবৃষ্টি। দক্ষিণ এশিয়া ও আফ্রিকায় আশঙ্কা করা হচ্ছে মারাত্মক খরার। দক্ষিণ পূর্ব আমেরিকায় হানা দিতে পারে অতিবৃষ্টি ও বন্যা।

এরই মধ্যে জাতিসংঘ সাবধান করেছে, চলমান সুপার এল নিনিওটি অতীতের যে কোনো এল নিনিওর তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী ও প্রলয়ংকর। কারণ এরইমধ্যে প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি বেড়ে অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। এটি ৪ ডিগ্রিতেও পৌঁছাতে পারে সতর্কতা রয়েছে।

বিশ্বজুড়ে এল নিনিওর প্রভাব অনুভূত হতে শুরু করায় পুরো পৃথিবী এখন ‘চরম প্রতিকূল আবহাওয়ার বিপজ্জনক অঞ্চলে’ প্রবেশ করেছে বলে সতর্ক করেছেন জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস।

এছাড়া সুপার এল নিনিওর প্রভাবে চলতি সেপ্টেম্বর থেকে আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ছয় মাসে বিশ্বব্যাপী প্রায় সাড়ে চার লাখের বেশি মানুষের মৃত্যু ঘটতে পারে বলে সতর্ক করেছে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট ল্যাব। এই সময়ে ভূমির গড় তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ১.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি থাকতে পারে বলেও সতর্ক করেছে তারা।

সতর্ক করা হয়েছে এল নিনিওর প্রভাবে খরায় খাদ্য সংকট নিয়েও। ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট ল্যাব বলছে, খরার কারণে প্রায় পাঁচ কোটি মানুষ মারাত্মক দুর্ভিক্ষের মুখোমুখি হতে পারে। বিশেষ করে নাইজেরিয়া, ইন্দোনেশিয়া, সুদান ও ভারতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বেশি।

এমন পরিস্থিতিতে আবহাওয়ার এই মারাত্মক খামখেয়ালি মোকাবেলায় বিভিন্ন দেশ কি প্রস্তুতি নিচ্ছে সে বিষয়ে এক বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বিবিসি। আবহাওয়া নিয়ে কাজ করা বিবিসির ছয় সাংবাদিককের লেখা ওই প্রতিবেদনটি গত সেপ্টেম্বর প্রকাশ হয়।

Image

ছবি: বিবিসি

সুপার এল নিনিও কি

এল নিনিও মূলত প্রশান্ত মহাসাগরের ক্রান্তীয় অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের পানির অস্বাভাবিক উষ্ণ হয়ে ওঠার জলবায়ুগত একটি পর্যায়; যা স্বাভাবিক বায়ুপ্রবাহ ও সমুদ্রের তাপমাত্রার ভারসাম্য বদলে দেয়। সাধারণত ২ থেকে ৭ বছর পরপর এটি ঘটে। এল নিনিও ৯ থেকে ১২ মাস পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।

তবে এবারের এল নিনিওটি আখ্যা পেয়েছে ‘সুপার’ হিসেবে। এটি হল জলবায়ু চক্রের এমন শক্তিশালী ও তীব্র রূপ, যখন নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের গড় তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি বেড়ে যায়। এর প্রভাবে খরা, তাপ প্রবাহ, অতিবৃষ্টি, ঘূর্ণিঝড়ের ফলে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি ও খাদ্য উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে।

এছাড়া অতিরিক্ত তাপমাত্রা এবং জলবায়ুর চরম পরিবর্তনের ফলে জনজীবন ও স্বাস্থ্যের ওপরও মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হয়।

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার (ডব্লিউএমও) বরাতে বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, চলতি বছরের জুন মাসে সুপার এল নিনিও শুরু হয়। এটি আগামী নভেম্বর বা ডিসেম্বর থেকে প্রবল হয়ে ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত বজায় থাকতে পারে।

Image

এল নিনিওর প্রভাবে পূর্ব আফ্রিকা তথা কেনিয়ার মত দেশগুলোতে অতিবৃষ্টি ও বন্যার পূর্বাভাস রয়েছে। ছবি: বিবিসি।

মোকাবেলায় কি ব্যবস্থা নিচ্ছে দেশগুলো

সুপার এল নিনিওর প্রভাবে মৃত্যু, বাস্তুচ্যুতি এবং পরিবেশগত ক্ষতি কমাতে বিশ্বজুড়ে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, তা নিয়ে বিভিন্ন দেশের সরকার ও বিজ্ঞানীদের সঙ্গে কথা বলেছে বিবিসি। প্রত্যেক দেশই বলছে, পূর্ব সতর্কীকরণ ব্যবস্থাগুলোকে জোরদার করা হয়েছে এবং আগাম চিকিৎসা সহায়তা পাঠানোর প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।

তারপরও এবারের এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের ভয়াবহতা বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা নিয়ে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। জাতিসংঘের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান ডব্লিউএমও বলেছে, এল নিনিও সম্পর্কিত চরম আবহাওয়ার পূর্বাভাসগুলো যত সম্ভব বেশি সংখ্যক মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে তারা এক ‘ব্যাপক সর্বাত্মক উদ্যোগ’ হাতে নিয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, এরইমধ্যে প্রশান্ত মহাসাগরের তলদেশে তাপমাত্রা আরও বেশি অস্বাভাবিক রূপ নিয়েছে; কিছু জায়গায় তা স্বাভাবিকের চেয়ে ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।

ভারত মহাসাগর, ক্রান্তীয় আটলান্টিক এবং অস্ট্রেলিয়া উপকূলের আশপাশের এলাকাসহ বিশ্বের অন্যান্য অংশেও সমুদ্রের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি থাকার আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষ করে প্রচুর সামুদ্রিক জীবে সমৃদ্ধ হওয়ায় মহাসাগরের এই তাপমাত্রা বৃদ্ধি অস্ট্রেলিয়ার জন্য বিশেষ উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অস্ট্রেলিয়ার বিজ্ঞান সংস্থার প্রধান গবেষক ড. অ্যালিস্টার হবডে বিবিসিকে বলেন, “এল নিনিও একটি প্রাকৃতিক ঘটনা হলেও এটি এমন চরম তাপপ্রবাহ নিয়ে আসে; যা প্রাকৃতিক বিপর্যয়গুলোকে ত্বরান্বিত করে।

বিবিসি বলছে, অস্ট্রেলিয়া সম্প্রতি সামুদ্রিক সংকটের জন্য আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা চালু করেছে। এর মধ্যে মৎস্য খাতের জন্য আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করা, বিপন্ন প্রজাতিগুলোকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া এবং প্রবাল পর্যবেক্ষণ বাড়ানোর মত উদ্যোগ রয়েছে।

এল নিনিওর মারাত্মক প্রভাবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, মধ্য আমেরিকা এবং দক্ষিণ আমেরিকার উত্তরাঞ্চলের একটি বড় অংশজুড়ে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক শুষ্ক আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, যা সেখানে তীব্র খরা এবং দাবানলের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। আবার বৃষ্টিপাত কমার পূর্বাভাসের কারণে পানামা খালের মধ্য দিয়ে জাহাজ চলাচলের সংখ্যা ১০ শতাংশেরও বেশি কমানো হচ্ছে।

চলতি শুষ্ক মৌসুমে ইন্দোনেশিয়া দেশজুড়ে বিভিন্ন স্থানে দাবানল নিয়ন্ত্রণে লড়াই করছে। এরইমধ্যে দাবানলে ১ লাখ ৭ হাজার হেক্টরেরও বেশি জমির ফসল ও গাছপালা পুড়ে ছাই হয়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যান্য অংশের মত ইন্দোনেশিয়াকেও এ বছর দীর্ঘমেয়াদী খরার মুখোমুখি হতে হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

Image

শ্রীলঙ্কার আমপারা জেলায় শুকিয়ে যাওয়া নদীতে পানির সন্ধানে গর্ত খুঁড়েছেন এক ব্যক্তি। ছবি: রয়টার্স।

দেশটির সরকার বলেছে, দাবানলের আগুন নেভাতে কৃত্রিম বৃষ্টির জন্য ‘ক্লাউড-সিডিং’ বিমান পাঠাচ্ছে। এছাড়া আগুন নিয়ন্ত্রণে সম্পদের পর্যাপ্ত সরবরাহের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তারা। একইসঙ্গে অবৈধভাবে জমি পরিষ্কারের জন্য আগুন লাগানোর অভিযোগে বহু মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

ল্যাটিন আমেরিকার দেশ পেরুও এল নিনিওর কারণে বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ এর দীর্ঘ উপকূলীয় সীমান্ত পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরের সঙ্গে যুক্ত। ইকুয়েডর ও ব্রাজিলের কিছু অংশের পাশাপাশি পেরুর বিভিন্ন অঞ্চলে আগে থেকেই ভারী বৃষ্টিপাত দেখা গেছে, যার ফলে সেখানে হঠাৎ বন্যা এবং ভূমিধসের সৃষ্টি হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্র গত মাসের শেষের দিকে ঘোষণা করেছে, তারা এল নিনিও আরও মারাত্মক রূপ নেওয়ার আগেই অতিরিক্ত চিকিৎসা সহায়তা ও প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম সরবরাহ করতে পেরুর উপকূলে বিশেষ জাহাজ পাঠাচ্ছে।

শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় ও ভূমিধসের ঝুঁকি

চীনে এ বছরই অন্তত ৭টি টাইফুন বা ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানতে পারে বলে সতর্ক করেছেন দেশটির বিশেষজ্ঞরা। এটি সুপার এল নিনিওর প্রভাবের সঙ্গে সম্পর্কিত বলেও মনে করছেন তারা।

এর আগে কেবল জুলাই মাসেই চীন ‘বাভি’, ‘নাউল’ এবং ‘মেসাক’ নামে অন্তত তিনটি শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়ের মুখোমুখি হয়, যাতে ডজন খানেক মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। সে ধাক্কা কাটতে না কাটতেই অগাস্টে ঘূর্ণিঝড় ডলফিনের আঘাতে চীনে ভারী বৃষ্টি ও প্রচণ্ড ঝড়ো হাওয়ার কারণে ১০ লাখেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়।

একইভাবে পূর্ব আফ্রিকা, দক্ষিণ ব্রাজিল এবং দক্ষিণ যুক্তরাষ্ট্রে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টির ধারণা করা হচ্ছে, যা মারাত্মক বন্যার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দিচ্ছে।

ডব্লিউএমও মহাসচিব সেলেস্তে সাওলো বলেন, “আমরা ইতিমধ্যেই খরা এবং বন্যার কারণে নানা ধরনের ধ্বংসলীলা দেখতে পাচ্ছি। এল নিনিও যত তীব্র হবে, এই প্রভাবগুলো তত বাড়বে বলেই আমাদের আশঙ্কা।”