Published : 11 Jan 2026, 01:46 PM
সরকারের রক্তক্ষয়ী দমনপীড়ন উপেক্ষা করে শনিবার রাতেও ইরানের বিভিন্ন শহরে রাস্তায় নেমেছে বিক্ষোভকারীরা।
গত তিনদিনে দেশটিতে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের হাতে শতাধিক হতাহত হয়েছে বিভিন্ন গণমাধ্যমে এমন ধারণা দেওয়া খবরও তাদের দমিয়ে রাখতে পারেনি বলে জানিয়েছে বিবিসি।
সত্যতা নিশ্চিত হওয়া একাধিক ভিডিও এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশটির সরকার যে বিক্ষোভ দমনে ক্রমশ কঠোর হচ্ছে তারও ইঙ্গিত মিলেছে। দেশটির বিস্তৃত অংশে ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট এখনও বহাল আছে।
ইরানের অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ মোভাহেদি আজাদ শনিবার বলেছেন, যে-ই বিক্ষোভে নামবেন তিনি ‘আল্লাহর শত্রু’ বলে গণ্য হবেন। দেশটিতে এমন অপরাধের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড।
দুই সপ্তাহ আগে সরকারবিরোধী এ আন্দোলন শুরু হওয়ার পর এখন পর্যন্ত দেশটিতে কয়েক হাজার বিক্ষোভকারী আটক হয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
লাগামহীন মূল্যস্ফীতির কারণে সৃষ্ট এ বিক্ষোভ এরই মধ্যে ইরানের প্রতিটি প্রদেশে দেখা গেছে; শতাধিক শহরে মিছিলের খবর মিলেছে। বিক্ষোভকারীরা এখন ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মোল্লাতন্ত্রের অবসান চাইছেন।
খামেনি এ দাবি উড়িয়ে দিয়ে বিক্ষোভকারীদের ‘একদল গোলমালকালকার’ আখ্যা দিয়েছেন, যারা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পকে ‘খুশি করতে চাইছে’।
তিন বছর আগে ‘উইমেন, লাইফ, ফ্রিডম’ আন্দোলনের সময় ইন্টারনেটের ওপর যেমন বিধিনিষেধ ছিল, এবার তার চেয়েও কঠোর বিধিনিষেধ চলছে বলে জানিয়েছেন এক বিশেষজ্ঞ।
এখন বাইরের বিশ্বের সঙ্গে ইরানিদের যোগাযোগের একমাত্র উপায় স্টারলিংক, কিন্তু সরকার এগুলোর উৎস চিহ্নিত করে ফেলতে পারে বিধায় বিক্ষোভকারীদের সতর্কভাবে সেগুলো ব্যবহার করতে হচ্ছে।
বিবিসিসহ অনেক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমই ইরানের ভেতর থেকে খবর সংগ্রহ করতে পারছে না, যে কারণে তথ্য সংগ্রহ এবং সেখান থেকে যেসব তথ্য আসছে সেগুলোর সত্যতা যাচাইও বেশ কঠিন হয়ে পড়ছে।
তা সত্ত্বেও অনেক ভিডিও ফুটেজ মিলছে, বিবিসি দেশটির ভেতরে থাকা অনেকের সঙ্গে ফোনে কথাও বলতে পারছে।
তেমনই এক ভিডিওতে শনিবার রাতে বিক্ষোভকারীদের তেহরানের ঘিশা জেলার বিভিন্ন সড়কে দেখা গেছে। বিবিসি ভিডিওটির সত্যতা নিশ্চিত হতে পেরেছে।
একাধিক ভিডিওতে ইরানের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মাশহাদে ভাকিল আবেদ বুলভার্ডে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষের ছবিও এসেছে। এসব ভিডিওর সত্যতা যাচাই করেও নিশ্চিত হয়েছে বিবিসি।
ভিডিওতে মুখোশ পরিহিত বিক্ষোভকারীদের ময়লার গাড়ি ও আগুনের পেছনে লুকাতে দেখা যাচ্ছে, দূরে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ানো রয়েছে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা। বাসের মতো মনে হওয়া একটি গাড়িতে আগুন জ্বলছে।
একাধিক গুলির শব্দ ও থালা-বাসনের আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে, সবুজ লেজারের আলো থেকে থেকে জ্বলছে। কাছাকাছি একটি পদচারী সেতুর ওপর একজনকে দেখা গেছে, যিনি একাধিক দিকে গুলি ছুড়ছেন বলে মনে হচ্ছে; কিছু লোকজন বুলভার্ডের ধারে একটি বেড়ার পেছনে লুকানোর চেষ্টা করছেন।
রাজধানী তেহরান থেকে আসা আরও কিছু ভিডিওর কথাও বলছে। এর মধ্যে একটিতে পশ্চিম তেহরানের পুনাক চত্বরে বিপুল সংখ্যক বিক্ষোভকারীকে দেখা গেছে। শোনা গেছে থালা-বাসন পিটিয়ে করা শব্দের আওয়াজ। ভিডিওটির সত্যতা নিশ্চিত হয়েছে বিবিসি।
গত কয়েকদিন ধরে ইরানজুড়ে যে বিক্ষোভ চলছে পুনাক চত্বর তার অন্যতম কেন্দ্র।
যাচাই করে নিশ্চিত হওয়া আরেকটি ভিডিও ক্লিপে উত্তর-পূর্ব তেহরানের হেরাভি জেলায় একদল বিক্ষোভকারীকে মিছিল করে মোল্লাতন্ত্রের বিলুপ্তি চাইতে দেখা যাচ্ছে।
শনিবার ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, “ইরান স্বাধীনতার দিকে তাকিয়ে আছে, যেমনটা সম্ভবত আগে কখনোই হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র সাহায্য করতে প্রস্তুত।”
তিনি এ নিয়ে আর বিস্তারিত কিছু বলেননি। তবে মার্কিন গণমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানে সামরিক হামলা সংক্রান্ত বিকল্পের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তাকে জানানো হয়েছে।
নিউ ইয়র্ক টাইমস ও ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এই ব্রিফিংয়ের খবর দিয়েছে। একে ‘প্রাথমিক আলোচনা’ আখ্যা দিয়েছে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল। অনামা এক কর্মকর্তা তাদেরকে এও বলেছেন, এখনই ইরানে হামলার ‘তেমন সম্ভাবনা’ নেই।
গত বছরই যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে বিমান হামলা চালিয়েছিল।
ইরানের বিক্ষোভকারীদের সমর্থনে একাধিকবার পোস্ট দিয়েছেন মার্কিন সেনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম।
“ইরানের জনগণের প্রতি: আপনাদের দীর্ঘ দুঃস্বপ্ন শেষ হয়ে আসছে। আপনাদের সাহস এবং নিষ্পেষণের অবসানের আকাঙ্ক্ষা মার্কিন প্রেসিডেন্টের নজরে পড়েছে। সাহায্য আসছে,” বলেছেন তিনি।