Published : 30 Aug 2026, 12:11 AM
ভারতে কংগ্রেস নেত্রী সনিয়া গান্ধীর আত্মজীবনী ‘বিলংগিং: আ জার্নি অব লাভ’ প্রকাশ করা নিয়ে জটিলতা দেখা দিয়েছে। বইটি প্রকাশিত হওয়ার আগেই তা ঘিরে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক বিতর্ক। ‘পেঙ্গুইন র্যান্ডম হাউস ইন্ডিয়া’র বইটি প্রকাশের কথা থাকলেও তারা পিছিয়ে এসেছে।
আমেরিকার পেঙ্গুইন র্যান্ডম হাউসের প্রকাশনা সংস্থা ‘আলফ্রেড এ নফ’ বইটি ১০ নভেম্বরে প্রকাশ করবে বলে জানালেও শুক্রবার তাদের ভারতীয় শাখা ‘পেঙ্গুইন ইন্ডিয়া’ বিবৃতি দিয়ে জানায়, ভারতে তারা বইটি প্রকাশ করছে না।
এরপরই কংগ্রেস অভিযোগ করেছে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সরকার এবং ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) চাপের কারণেই বইটি প্রকাশের সিদ্ধান্ত থেকে পিছিয়ে এসেছে পেঙ্গুইন র্যান্ডম হাউস ইন্ডিয়া।
বিশেষ করে বইটিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) কার্যকলাপ এবং চীনের ভারতীয় ভূখণ্ডে অনুপ্রবেশ সংক্রান্ত প্রসঙ্গ নিয়েই আপত্তি তোলা হয়েছিল বলে কংগ্রেসের দাবি।
ঘটনার সূত্রপাত প্রকাশক ও লেখকের মধ্যে পাণ্ডুলিপি নিয়ে আলোচনাকে কেন্দ্র করে।
‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’ জানায়, বইটি প্রকাশের আগে পেঙ্গুইন ইন্ডিয়ার পক্ষ থেকে পাণ্ডুলিপির কিছু অংশ বাদ দেওয়া এবং সম্পাদনাগত পরিবর্তন করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই প্রস্তাব মানতে রাজি হননি সোনিয়া। এরপরই ভারতে বইটি প্রকাশের সম্ভাবনা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
সোনিয়ার আত্মজীবনী নিয়ে ভারতে রাজনৈতিক মহলে তো বটেই, বইপ্রেমীদের মধ্যেও কৌতূহল ছিল বেশ। সম্প্রতি তা নিয়ে সোশাল মিডিয়ায় আবেগঘন বার্তা পোস্ট করেন রাহুল গান্ধীও। কিন্তু তার পর পরই ঘটে ওই ঘটনা এবং পেঙ্গুইন বইটি প্রকাশ না করার সিদ্ধান্ত নেয়।
প্রকাশনা সংস্থার পক্ষ থেকে বিবৃতি দিয়ে বলা হয়, ভারতে সোনিয়ার আত্মজীবনীর প্রকাশক তারা নয়। কেন তারা বইটি প্রকাশ করতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে সে বিষয়ে পেনগুইন র্যান্ডম হাউস ইন্ডিয়া বিস্তারিত কিছু বলেনি।
ওদিকে, সোনিয়ার সঙ্গে মতবিরোধ নিয়ে যে তথ্য সামনে আসছে, তাও সত্য নয় বলে দাবি করেছে তারা। পেঙ্গুঈনের বিবৃতিতে বলা হয়, “লেখিকা কিছু কাটছাঁট না করার কারণে বইটি প্রকাশ করা হচ্ছে না সে ধারণা ঠিক নয়।
“আমরা বইটি প্রকাশে অত্যন্ত আন্তরিক এবং আগ্রহী। কিন্তু প্রকাশনা সংস্থা হিসেবে সত্যতা যাচাই করা এবং বইয়ের জন্য লেখকদের উপযুক্ত পরামর্শ দেওয়া আমাদের অধিকার এবং দায়িত্বও। বই প্রকাশের স্বাভাবিক পদ্ধতি এটি।”
তবে কংগ্রেস পার্টির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে যে, পাণ্ডুলিপি জমা দেওয়ার ধাপে লেখক ও প্রকাশকের মধ্যে যে অংশগুলো আলোচনায় এসেছিল, তা মূলত তিনটি বিষয়ের সঙ্গেই সম্পর্কিত ছিল:
কি সেই বিষয়গুলো?
প্রথমেই ছিল চীন সীমান্ত বিরোধ। বইতে ভারতীয় ভূখণ্ডে চীনের অনুপ্রবেশ এবং সীমান্তের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে বিশেষভাবে আলোচনা করা হয়েছে—যে বিষয়টি সোনিয়া গান্ধী এবং লোকসভায় বিরোধীদলীয় নেতা ও তার ছেলে রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে কংগ্রেস সংসদে ও সংসদের বাইরে বারবার উত্থাপন করেছে।
বইতে সোনিয়া গান্ধী প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্ব ও কাজের ধরন এবং কেন্দ্র সরকারের বেশ কয়েকটি প্রধান নীতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।
তৃতীয়টি হল, রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস)। যে দলটি ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) মাতৃসংগঠন এবং এমন একটি দল যেখানে মোদী পূর্ণকালীন রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার আগে কাজ করেছিলেন।
আত্মজীবনীতে জাতীয় বিভিন্ন বিষয় এবং ভারতের সামাজিক কাঠামোর ওপর আরএসএস এর প্রভাব সম্পর্কে সোনিয়া তার দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন।
কংগ্রেস সূত্র জানায়, পেঙ্গুইনের আইনি বিভাগ বইয়ের ওই অংশগুলো বাদ দেওয়া এবং একাধিক জায়গায় পরিবর্তন ঘটাতে বললেও সোনিয়া জানান, খাতায়-কলমে নিজের জীবনের খুঁটিনাটি তুলে ধরেছেন তিনি। কারও কথায় নিজের জীবনীতে কাটছাঁট করবেন না। কারণ, এতে লেখকের গল্প বলার পদ্ধতিতেই হস্তক্ষেপ করা হয়।
কংগ্রেসের অভিযোগ, ক্ষমতাসীন বিজেপি’র পরোক্ষ রাজনৈতিক চাপেই ওই অংশগুলো বাদ দিতে বলা হয়েছে, যা মূলত স্বাধীন প্রকাশনা ও বাক্স্বাধীনতার ওপর এক ধরনের অদৃশ্য সেন্সরশিপ।
কংগ্রেস নেতা অশোক গহলৌত বলেন, “ভারতে কেন বইটি প্রকাশ হবে না? একধরনের চাপ আসছে। মোদী, চীন এবং আরএসএস নিয়ে কিছু লেখা হয়েছে বলেই। গণতন্ত্র কোথায় দেশে? বাক স্বাধীনতা নিষিদ্ধ করা হচ্ছে।”
বেশ কিছু বছর ধরেই বইটি লিখছিলেন সোনিয়া। যুদ্ধকালীন ইতালিতে জন্ম, রাজীব গান্ধীর সঙ্গে আলাপ, ভারতে পদার্পণ এবং তার পর জীবনের গতিপথ বদলে যাওয়া, সবকিছু তুলে ধরেছেন তিনি।
ভারতে প্রকাশিত না হলেও, বিদেশে কোনও কাটছাঁট ছাড়াই প্রকাশিত হবে বইটি। আগামী ১০ নভেম্বর আন্তর্জাতিক বাজারে ‘আলফ্রেড এ নফের’ প্রকাশ করার কথা রয়েছে সোনিয়ার এই আত্মজীবনী।
তাদের বক্তব্য, “সোনিয়ার বইটি তথ্যসমৃদ্ধ। মিতভাষী সোনিয়া খুবই আন্তরিক এবং অকপট ভঙ্গিতে নিজের জীবনের খুঁটিনাটি তুলে ধরেছেন। বইটি কেবল তার ভবিষ্যৎই নয়, তাকে দত্তক নিয়েছে যে ভারত, তার ভবিষ্যৎকেও নতুন রূপ দেবে।”