৩০ অক্টোবর ২০২৬, ১৪ কার্তিক ১৪৩৩

দুর্ঘটনার আগে কী ঘটেছিল স্পেনের সেই ট্রেনে? অডিওতে বড় তথ্য ফাঁস

অডিওর কথপোকথন থেকে দেখা গেছে, রেললাইনে আরেকটি ট্রেন দাঁড়িয়ে থাকার পরও পেছনের দ্রুতগতির ট্রেনটিকে এগিয়ে যাওয়ার সবুজ সংকেত দেওয়া হয়েছিল।

দুর্ঘটনার আগে কী ঘটেছিল স্পেনের সেই ট্রেনে? অডিওতে বড় তথ্য ফাঁস

ছবি: রয়টার্স

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 29 Oct 2026, 11:21 PM

Updated : 29 Oct 2026, 11:21 PM

স্পেনের মাদ্রিদ থেকে সেভিলেগামী দ্রুতগতির রেললাইনে ভয়াবহ দুর্ঘটনার ঠিক কয়েক মিনিট আগে দুই ট্রেনের চালক ও রেল নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রের কর্মকর্তাদের কথোপকথনের তিনটি অডিও রেকর্ডিং সংবাদমাধ্যমে ফাঁস হয়েছে। আর এ থেকেই বেরিয়ে এসেছে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পেছনের বড় তথ্য।

স্পেনের রেল ইতিহাসের অন্যতম বড় গাফিলতির চিত্র সামনে এসেছে। অডিওর কথপোকথন থেকে দেখা গেছে, রেললাইনে আরেকটি ট্রেন দাঁড়িয়ে থাকার পরও পেছনের দ্রুতগতির ট্রেনটিকে এগিয়ে যাওয়ার সবুজ সংকেত দেওয়া হয়েছিল। এতেই ঘটে যায় দুই ট্রেনের ভয়াবহ সংঘর্ষ, যা কেড়ে নিয়েছে অন্তত ৬৯ জনের প্রাণ।

স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদ এবং দক্ষিণের আনদালুসিয়াকে সংযোগকারী রেললাইনে দুই ট্রেনের সংঘর্ষে এই দুর্ঘটনা ঘটেছে গত বুধবার স্থানীয় সময় সকালে। যে দু'টি ট্রেনের মধ্যে ধাক্কা লেগেছে, সেটির একটি আইরো এবং অন্যটি রেনফে। আইরোতে ছিলেন ১৪৭ জন যাত্রী এবং রেনফেতে ছিলেন ৩৯৭ জন যাত্রী।

বিবিসি জানায়, বৃহস্পতিবার দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত শুরু করেছে কর্তৃপক্ষ। দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পর প্রধানমন্ত্রী পেড্রো সানচেজ বলেছেন, কর্তৃপক্ষ এই মর্মান্তিক ঘটনার আসল কারণ এবং সব খুঁটিনাটি উদঘাটন করতে 'দিন-রাত' কাজ করে যাচ্ছে।

স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম এল পাইস এবং আরটিভিই প্রকাশ করেছে দুর্ঘটনার কয়েকমিনিট আগে চালকদের সঙ্গে রেল নিয়ন্দ্রণকেন্দ্রের কর্মকর্তাদের অডিও রেকর্ডিং। এতে দেখা গেছে, সিগন্যাল ব্যবস্থার ত্রুটি থাকার পরও কন্ট্রোল রুম থেকে চালককে ভুল সবুজ সংকেত দেওয়া হয়েছিল, যা এই ভয়াবহ দুর্ঘটনার মূল কারণ বলে ধারণা করা হচ্ছে।

কম্পিউটার নষ্ট হওয়ায় সিগন্যাল সিস্টেমে সমস্যা দেখা দেয়, যার কারণে মাদ্রিদ-সেভিল হাই-স্পিড রেললাইনে সব ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তবে পরে রেনফে ট্রেনটিকে 'ভুলবশত' সামনে এগিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।

স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল ও ট্রেন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম বিকল হওয়ায় ওই লাইনে থাকা দুটি ট্রেনসহ মোট ৬টি ট্রেন স্বয়ংক্রিয়ভাবে লাইনে থমকে দাঁড়িয়েছিল। এর মধ্যে সামনে ছিল ১৪৭ জন যাত্রীবাহী বেসরকারী অপারেটর ‘ইরিও' ট্রেন এবং তার ঠিক ২৫ কিলোমিটার পেছনে ছিল ৩৯৭ যাত্রী বাহী রাষ্ট্রীয় অপারেটর 'রেনফে' ট্রেন।

অডিওতে যা শোনা গেছে

কন্ট্রোল রুমের অপারেটর পেছনের 'রেনফে' ট্রেনের চালককে নির্দেশ দেন তার ট্রেনের গতি মনিটরিং সিস্টেমটি একবার বন্ধ করে আবার চালু করতে। এরপর অপারেটর বলেন, "আপনার যাত্রা শুরু করুন এবং স্বাভাবিক গতিতে ট্রেন চালান।”

নির্দেশ শুনে চালক কিছুটা অবাক হয়ে পাল্টা প্রশ্ন করেন, "স্বাভাবিক গতিতে?" কন্ট্রোল রুম থেকে তখন বলা হয়, "হ্যাঁ, স্বাভাবিক গতিতে।"

ওদিকে, সামনে থাকা ইরিও ট্রেনের চালক আরেক অডিওতে কন্ট্রোল রুমে যোগাযোগ করে জানান যে, সিগন্যাল চলে যাওয়ায় তার ট্রেনটি উর্দাগামী প্রবেশ লাইনের সামনে লাইনে আটকা পড়ে আছে।কন্ট্রোল রুম সেই ট্রেনকেও যাত্রা শুরুর চেষ্টা করতে বলে।

দুর্ঘটনার ৫ মিনিট আগে ইরিও ট্রেনের চালক ফের কন্ট্রোল রুমে অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হয়ে জানান যে, তার ট্রেনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা কোনোভাবেই কাজ করছে না এবং ট্রেনটি কোনোভাবেই স্টার্ট নিচ্ছে না

সামনে ট্রেনটি সম্পূর্ণ অচল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে জানার পরও, অডিও রেকর্ড অনুযায়ী, কন্ট্রোল রুম থেকে পেছনের দ্রুতগতিতে ধেয়ে আসা রেনফে ট্রেনটিকে থামার জন্য কোনও নির্দেশ পাঠানো হয়নি।

কন্ট্রোল রুমের সবুজ সংকেত পেয়ে রেনফে ট্রেনটি প্রায় ঘণ্টায় ১২৪ মাইল গতিতে এগিয়ে আসছিল। উর্দো শহরের কাছে কিলোমিটার ১১৮-এ এসে লাইনের বাঁকে হঠাৎ সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ইরিও ট্রেনটিকে দেখতে পান চালক। কিন্তু প্রচণ্ড গতি থাকায় ব্রেক চেপেও শেষ রক্ষা হয়নি। রেনফে ট্রেনটি তীব্র গতিতে আইরিও ট্রেনের পেছনে আছড়ে পড়ে।

প্রচণ্ড ধাক্কায় ইরিও ট্রেনের পেছনের বগিগুলো লাইনচ্যুত হয়ে বাঁধের নিচে ছিটকে পড়ে। এই দুর্ঘটনায় অন্তত ৬৯ জন যাত্রী নিহত এবং ১০০ জনের বেশি মানুষ গুরুতর আহত হন।

রেললাইনের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ত্রুটির পরেও একটি ট্রেনকে স্বাভাবিক গতিতে চলার অনুমতি দেওয়ার কথাটি স্পেনের পরিবহণমন্ত্রী নিজেও জানিয়েছেন। রেলের কন্ট্রোলরুমের এই সিদ্ধান্তকে ‘ব্যাখ্যাতীত’ বলে উল্লেখ করেছেন তিনি।

অডিও ফাঁস নিয়ে সমালোচনা:

অডিও রেকর্ডিংগুলো ফাঁস হওয়ার ঘটনায় কিছু স্প্যানিশ রাজনীতিবিদ সমালোচনা করেছেন। বামপন্থি সুমার জোটের আইনপ্রণেতা আলবের্তো ইবানিয়েস এক্সে এক পোস্টে এই তথ্য ফাঁসকে নিন্দনীয় বলে মন্তব্য করেছেন।

পডেমোস দলের নেতা আইরেনে মনতেরো বলেন, দুর্ঘটনার দায় কোনও একজন কর্মীর ওপর চাপানো উচিত নয়। রেল খাতের বেসরকারীকরণ নিয়ে চালক এবং বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।