Published : 06 Mar 2026, 12:43 AM
পাঁচ দিন আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান বাহিনী ইরানের ওপর বোমা হামলা শুরু করার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, এই যুদ্ধ থেকে তিনি শুধু ‘ইরানি জনগণের স্বাধীনতা’ চান।
বিশ্লেষকদের ধারণা অবশ্য অন্যরকম। মার্কিন প্রেসিডেন্টের বক্তব্য আর তার কর্মকর্তাদের ঘোষিত অন্যান্য লক্ষ্য ওজন করেই তারা বলছেন, ট্রাম্পের আসল উদ্দেশ্য ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা ভেঙে ফেলা।
প্রথম আঘাতেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লা আলি খামেনিকে হত্যার মধ্য দিয়ে সেই লক্ষ্য পূরণে প্রাথমিক সাফল্য পেয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। কিন্তু গত শনিবার থেকে যে পথ ধরে যুদ্ধ এগোচ্ছে, তাতে ট্রাম্পের চূড়ান্ত সাফল্য পাওয়ার সম্ভাবনা কতটা?
এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আল জাজিরা কথা বলেছে স্টিমসন সেন্টারের জ্যেষ্ঠ গবেষক কেলি গ্রিয়েকোর সঙ্গে। তার ভাষ্য, মাটিতে সৈন্য না নামিয়ে কেবল আকাশযুদ্ধ চালিয়ে ইরানের রাজনৈতিক কাঠামো উল্টে দেওয়া অসম্ভব না হলেও খুবই কঠিন।

প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প কি তা জানেন না? নাকি তিনি শেষ পর্যন্ত ইরানে সৈন্য পাঠানোর কথাই ভাববেন?
কেলি গ্রিয়েকো বলেন, “ইরানের শাসন কাঠামো পাল্টে দেওয়ার জন্য যে খরচ গুনতে হবে, মার্কিন প্রশাসন সম্ভবত সেজন্য প্রস্তুত নয়। সে কারণে তারা সম্ভবত দ্বিতীয় সারির কিছু লক্ষ্য ঠিক করেছে। অর্থাৎ, কেবল আকাশপথে হামলায় যদি শাসন কাঠামো পাল্টে দেওয়া সম্ভব নাও হয়, দ্বিতীয় সারির লক্ষ্যগুলো পূরণ হলেও তাদের চলবে।”
হামলা শুরুর পর ট্রাম্প ইরানি জনগণকে বলেছিলেন, তাদের ‘স্বাধীনতার মুহূর্ত’ সমাগত।
“আমাদের কাজ শেষ হলে আপনারাই আপনাদের সরকারের দায়িত্ব নেবেন। সেটা আপনাদের জন্যই থাকবে।”
ট্রাম্পের এ কথায় স্পষ্ট, ইরানের শাসন কাঠামো পাল্টে দেওয়াই যুক্তরাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য।

তবে সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির নির্বাহী সহ-সভাপতি ম্যাথু ডাস আল জাজিরাকে বলেছেন, শুধু আকাশপথে হামলা চালিয়ে ইরানের শাসন কাঠামো ভেঙে দেওয়া সম্ভব নয়।
“আপনি ভবন ধ্বংস করতে পারেন, শাসন কাঠামোকে আঘাত করতে পারেন। কিন্তু শুধু এয়ার পাওয়ার ব্যবহার করে শাসন কাঠামো পাল্টে দেওয়ার কোনো উদাহরণ আমাদের জানা নেই।”
আল জাজিরা লিখেছে, ২০১১ সালে লিবিয়ায় নেটোর নেতৃত্বে চালানো বিমান হামলায় মুয়াম্মার গাদ্দাফি ক্ষমতাচ্যুত হন। কিন্তু সেখানে স্থলযুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছিল লিবিয়ার বিদ্রোহীরাই।
ট্রাম্প এবং মার্কিন কর্মকর্তারা ইরানিদের সরকারবিরোধী আন্দোলনে নামার আহ্বান জানালেও, তেহরানের বর্তমান শাসকগোষ্ঠীকে মোকাবিলা করতে পারে–এমন কোনো সংগঠিত শক্তিকে এখন পর্যন্ত মাঠে দেখা যাচ্ছে না।

সেনা নামাবে যুক্তরাষ্ট্র?
যুক্তরাষ্ট্র স্থলসেনা পাঠানোর সম্ভাবনা পুরোপুরি নাকচ করেনি। তবে তাতে মার্কিন সেনাদের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি হবে। এবং তা হবে দ্রুত সামরিক অভিযান শেষ করার ট্রাম্পের নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
ডাস বলেন, “ইরানে এখনো কোনো মার্কিন সেনা মাটিতে না নামলেও এই যুদ্ধ ইতিমধ্যেই অজনপ্রিয়।”
রয়টার্সের এক সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, মাত্র এক-চতুর্থাংশ মার্কিন নাগরিক এই যুদ্ধ সমর্থন করেন।
এ প্রসঙ্গে ম্যাথু ডাস ২০০৩ সালের ইরাক আগ্রাসনের সঙ্গে তুলনা টানেন। বিভিন্ন জরিপ অনুযায়ী, তখন ৫৫ শতাংশের বেশি মার্কিন নাগরিক সেই যুদ্ধকে সমর্থন করেছিলেন।
তিনি বলেন, “যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, বিশেষ করে যদি মার্কিন স্থলসেনা নামে, জনসমর্থন আরও কমবে।”
মঙ্গলবার প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে গোপন শুনানির পর ডেমোক্র্যাট সেনেটর রিচার্ড ব্লুমেনথাল সাংবাদিকদের বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানে স্থল অভিযান চালাতে পারে—এমন আশঙ্কা তার বেড়েছে।
তিনি বলেন, “এই ব্রিফিংয়ের পর আমার আগের চেয়ে বেশি ভয় হচ্ছে, আমরা হয়ত স্থলযুদ্ধে নামাতে যাচ্ছি। সরকারের লক্ষ্য পূরণে হয়ত মার্কিন সেনা নামানোর প্রয়োজন হবে।”

অন্য লক্ষ্যগুলো
গত কয়েক দিনে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ও পেন্টাগন প্রধান পিট হেগসেথ ইরানের শাসন কাঠামো বদলানোর চেয়ে তুলনামূলকভাবে সীমিত কিছু লক্ষ্যের কথা তুলে ধরেছেন। সেগুলোর মধ্যে রয়েছে ইরানের পারমাণবিক ও ড্রোন কর্মসূচি এবং নৌবাহিনীকে ধ্বংস করা।
রুবিওর দাবি, বিদেশি হামলার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জনের জন্য ইরান বড় পরিসরে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ভাণ্ডার গড়ে তুলছিল, যাতে তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সুযোগ পায়।
অন্যদিকে হেগসেথ জোর দিয়ে বলেছেন, ইরানে এই অভিযান ‘চিরস্থায়ী যুদ্ধে’ পরিণত হবে না।
“আমরা নিশ্চিত করে বলতে চাই. এই মিশন আমরা সম্পন্ন করব। তবে আমাদের অবস্থান স্পষ্ট, আগের প্রেসিডেন্টদের আমলের মত আমরা এমন যুদ্ধে জড়াতে চাই না, যেখানে লক্ষ্যই স্পষ্ট ছিল না।”
গবেষক কেলি গ্রিয়েকো অবশ্য মনে করছেন, ট্রাম্পের নিজের লক্ষ্যও স্পষ্ট নয়।

তিনি বলেন, “সবকিছু কীসের জন্য? আমরা কী অর্জন করতে চাই? প্রশাসনের বক্তব্যে ধারাবাহিকতা নেই। একরকম বার্তা তারা দিতে পারছে না।”
মঙ্গলবার ব্রিফিং শেষে ডেমোক্র্যাট সেনেটর এলিজাবেথ ওয়ারেনও একই ধরনের মন্তব্য করেন।
এক ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, “পরিস্থিতি আপনার ভাবনার চেয়েও খারাপ। উদ্বিগ্ন হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে।”
এলিজাবেথ ওয়ারেন বলেন, “ট্রাম্প প্রশাসনের ইরান নিয়ে কোনো পরিকল্পনা নেই। এই অবৈধ যুদ্ধ মিথ্যার ওপর দাঁড়িয়ে, এবং আমাদের দেশের বিরুদ্ধে কোনো তাৎক্ষণিক হুমকি ছাড়াই এটা শুরু হয়েছে। এই যুদ্ধ কেন, তার একটি স্পষ্ট কারণ ট্রাম্প এখনো দেখাতে পারেননি। কীভাবে এবং কখন এটা শেষ হবে, তারও কোনো পরিকল্পনা নেই।”
শনিবার ভোরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল হামলা শুরুর পর থেকে নিহত বেসামরিক মানুষের সংখ্যা ইতোমধ্যে হাজার ছাড়িয়েছে। এর পাল্টায় ইসরায়েল এবং আশপাশের বিভিন্ন দেশে মার্কিন ঘাঁটি ও জ্বালানি স্থাপনায় ইরান ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাচ্ছে। তাতে সংঘাত দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে।
ইরান-সমর্থিত ইরাকের বিভিন্ন গোষ্ঠীও যুদ্ধে যুক্ত হয়েছে, তারা যুক্তরাষ্ট্র-সম্পর্কিত লক্ষ্যবস্তুতে ড্রোন হামলা করছে। লেবাননে হিজবুল্লাহও সংঘাতে জড়িয়েছে। ইসরায়েল দক্ষিণ লেবাননেও হামলা চালাচ্ছে।

কত দীর্ঘ হবে যুদ্ধের দিন
হেগসেথ যদিও বলেছেন, এ যুদ্ধ অনির্দিষ্টকাল চলবে না; কিন্তু যুদ্ধের সময়সীমা নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের বক্তব্য বারবার বদলেছে।
ট্রাম্প বলেছেন, সংঘাত ছড়িয়ে পড়লেও যুক্তরাষ্ট্র তার মিশন সম্পন্ন করার পথে সময়ের আগেই এগিয়ে আছে।
একই সঙ্গে তিনি আবার বলেছেন, যুদ্ধ চার থেকে পাঁচ সপ্তাহ—এমনকি ‘তার চেয়েও অনেক দীর্ঘ’ হতে পারে।
ট্রাম্পের মিত্ররাও এ যুদ্ধকে ‘সফল’ হিসেবে দেখাতে চাইছেন। তারা বলছেন, ইরানের ক্ষমতাসীনদের পতন কেবল সময়ের ব্যাপার।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে ফোনালাপের পর রিপাবলিকান সেনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম এক্সে লিখেছেন, “আমরা এখনো লক্ষ্যে পৌঁছাইনি। তবে আমার বিশ্বাস, ইরানের সন্ত্রাসী শাসকগোষ্ঠীর পতন হবে কি না–সেটা প্রশ্ন নয়, প্রশ্ন হল কখন সেটা ঘটবে।”

তিনি বলেন, ইরানি শাসকগোষ্ঠীর পতনের পর যে ‘শান্তির দুয়ার’ খুলবে, তাতে ইসরায়েল ও আরব রাষ্ট্রগুলোর সম্পর্ক ‘নতুন উচ্চতায়’ যাবে, আঞ্চলিক ‘সমৃদ্ধি ও নিরাপত্তার নতুন স্তরে’ নিয়ে যাবে।
তবে ডাসের মতে, ট্রাম্পের লক্ষ্য যেহেতু স্পষ্ট নয়, সেহেতু যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রগতি কতটা হল, তা বোঝাও কঠিন।
“এই যুদ্ধ কেন প্রয়োজন, সে যুক্তিও তারা ঠিকঠাক তৈরি করেনি। কী অর্জন করতে চায়, কীভাবে ও কখন–সেটাও ব্যাখ্যা করেনি। ফলে আমাদের সামনে আছে শুধু এই হত্যাযজ্ঞ।”
যুদ্ধ শুরুর পর এখনো এক সপ্তাহ পুরো হয়নি। তবে ট্রাম্প যেসব অভিযানের কথা গর্ব করে বলেন, যেমন গত জানুয়ারিতে ভেনেজুয়েলার নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণ বা জুনে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা–এবারের যুদ্ধ তার চেয়ে দীর্ঘ সংঘাতের রূপ নিতে পারে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
গ্রিয়েকো বলেন, “সমস্যা হল, তিনি (ট্রাম্প) মনে হচ্ছে আকাশযুদ্ধের সক্ষমতায় খুব বেশি আস্থা রাখতে শুরু করেছেন। এবং তিনি মনে করেন, কেবল এ দিয়েই সবকিছু অর্জন করা সম্ভব।”