Published : 14 Nov 2025, 06:29 PM
ভারতের দক্ষিণী রাজ্য কর্নাটক সব নারী কর্মীর জন্য প্রতিমাসে একদিনের সবেতন ঋতুকালীন ছুটি চালু করেছে। নতুন নিয়মে ১৮ থেকে ৫২ বছর বয়সী নারীরা সরকারি-বেসরকারি যে কোনও প্রতিষ্ঠানেই এই ছুটি নিতে পারবেন এবং এর জন্য কোনও মেডিকেল সার্টিফিকেট লাগবে না।
এই নীতির আওতায় প্রাতিষ্ঠানিক খাতের প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার থেকে ৪ লাখ নারী কর্মী একদিনের এই সবেতন ঋতুকালীন ছুটির সুবিধা পাবে। তবে গৃহকর্মী, দিনমজুর বা খন্ডকালীন চাকরি করা আনুমানিক ৬০ লাখ নারী এই সুবিধা পাবে না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রায়োগিক দিক থেকে পরিধি বাড়িয়ে অ-প্রাতিষ্ঠনিক খাতেও এই ছুটি চালু করা উচিত। তারপরও কর্নাটক যে পদক্ষেপ নিয়েছে তা তাৎপর্যপূর্ণ বলেই গণ্য হচ্ছে।
কারণ, রাজ্যটিতে প্রথমবারের মতো বেসরকারি খাতে কর্মরত নারীদেরও ঋতুকালীন ছুটির আওতায় আনা হয়েছে এবং কর্মী কী ধরনের চাকরি করছে বা চুক্তিতে কাজ করছে কিনা সেটি বিবেচ্য বিষয় হিসাবে ধরা হয়নি।
নারীদের জন্য ঋতুকালীন ছুটির ধারণা অবশ্য নতুন নয়। স্পেন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলো বহু আগে থেকেই নারীদের এ সুবিধা দেয়।
ভারতেরও আরও কিছু রাজ্যে সীমিত পরিসরে এই ছুটি চালু আছে। বিহার ও উড়িষ্যা রাজ্য সরকারি নারী কর্মীদের মাসে দুই দিনের ঋতুকালীন ছুটি দেয়। কেরালা ছুটি দেয় বিশ্ববিদ্যালয় ও কারিগরি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানগুলোর নারী কর্মীদের।
তবে ভারতে নারীদের জন্য আলাদাভাবে ঋতুকালীন ছুটি দেওয়া নিয়ে সমালোচনা ও বিতর্ক রয়েছে। অনেকের মতে, এতে কর্মক্ষেত্রে নারী-পুরুষ বৈষম্য সৃষ্টি হতে পারে এবং সমতা ক্ষুন্ন হতে পারে।
আবার অনেকে মনে করেন, এটি নারীদের জন্য অপরিহার্য একটি অধিকার। কারণ, ঋতুস্রাবের সময় অনেক নারীকেই ব্যথা সয়ে কাজ করতে হয়, নইলে বেতন কাটা যায়।
কর্ণাটকের সিদ্ধান্ত নিয়ে বিবিসি-কে রাজ্যটির শ্রম মন্ত্রী সান্তোষ লাড বলেন, “নারীদের জন্য এটি সরকারের বাস্তবায়ন করা সবচেয়ে প্রগতিশীল সিদ্ধান্তগুলোর একটি।”
ভারতের সিলিকন ভ্যালি খ্যাত কর্ণাটকের রাজধানী বেঙ্গালুরুতে অসংখ্য আন্তর্জাতিক আইটি ও গ্রাহকসেবা কেন্দ্র রয়েছে।
এমনই এক আইটি শিল্প সংগঠন ন্যাসকমের কর্মকর্তা বিবিসি-কে বলেন, কর্নাটকের অনেক কোম্পানি আগেই ঋতুকালীন ছুটি দিত; তাই সরকারের নির্দেশনা বাস্তবায়ন কঠিন হবে না।
স্থানীয় পোশাকশ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি প্রতিভা আর বলেন, পোশাক কারখানায় কাজ করা নারীরা বছরে মাত্র ১১ দিন ছুটি পায়। এ নীতি তাঁদের জন্য বড় স্বস্তি। তবে অনেক নারী মনে করেন, বাস্তবে এই নীতি প্রয়োগ করা কঠিন হবে।
ভারতের বহু অঞ্চলে এখনও ঋতুস্রাবকে ট্যাবু মনে করা হয়। পিরিয়ড চলাকালে নারীদের মন্দিরে নিষিদ্ধ করা হয়, বাড়িতে আলাদা রাখা হয় “অশুচি” হিসেবে।
“আমরা যখন এটাকে নিয়েই কথা বলি না, তখন কীভাবে অফিসে গিয়ে ছুটি চাইব? আমাদের সমাজ এখনও সেই জায়গায় পৌঁছায়নি,” বিবিসি-কে বলেন সফটওয়্যার কোম্পানির ব্যবস্থাপক আনুনিতা কুণ্ডু।
আরেক আইটি কর্মী অরুণা পাপিরেড্ডি বলেন, “আমার মতে, আলাদা ছুটি লাগবে না। নারীরা ঋতুস্রাব নিয়ে কখনও আলাদা সুবিধা না চেয়েও উচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছেন।”
সমাজবিজ্ঞানী পুষ্পেন্দ্র বলেন, আসল চ্যালেঞ্জ হল ঋতুস্রাব নিয়ে গভীরভাবে প্রোথিত কুসংস্কার ভাঙা। তার কথায়, “বিহারে কোনও নারী দুই দিনের ছুটি নিলেই সবাই ধরে নেয় সেটি ঋতুব্রাবের কারণে। ছুটি উপকারে আসে বটে, কিন্তু ক্ষমতায়ন ঘটায় না।”
তিনি বলেন, দেশের বহু এলাকায় এখনও দোকানদাররা স্যানিটারি ন্যাপকিন পুরোনো কাগজে মুড়িয়ে দেন। ঋতুস্রাব নিয়ে কুসংস্কার ভাঙার নানা উদ্যোগও হয়েছে।
কেরালায় পুরুষদের জন্য ‘এমপ্যাথি এক্সারসাইজ’ চালু করা হয়েছিল। তবে ২০১৮ সালে কেরালার সাবরিমালা মন্দিরে ঋতুস্রাব চলাকালীন নারীদের প্রবেশাধিকার নিয়ে তীব্র বিক্ষোভও দেখা যায়।
তবু কর্নাটকের অনেক নারী বলছেন, সরকারের এই নীতি আলোচনা তৈরি করবে এবং পিরিয়ড নিয়ে কথা বলা সহজ করবে। “এটিকে ‘মেনস্ট্রুয়াল লিভ’ বলে উল্লেখ করাটাই মূলত লজ্জা ভাঙতে সাহায্য করে,” বলেন বেঙ্গালুরুভিত্তিক শিক্ষিকা শ্রেয়া শ্রী।
কর্নাটকের মাসিক ছুটি কমিটির প্রধান এবং ক্রাইস্ট ইউনিভার্সিটির সহযোগী ডিন সপনা এস নারীদের উৎসাহ দিয়ে বলেন, “সামাজিক মানসিকতা বদলানো জরুরি। মাসিক ছুটি চাইতে নারীদের লজ্জা বা সংকোচ করা উচিত নয়।”