রোমানদের ১৬০০ বছরের পুরনো কাচশিল্পের রহস্য উদ্ধার
চতুর্থ শতকের এ মূল পাত্রটিতে হোমারের ‘ইলিয়াড’-এর ষষ্ঠ খণ্ড থেকে নেওয়া কিং লাইকারগাসের পৌরাণিক কাহিনীর খোদাইচিত্র রয়েছে।
কাচশিল্পে প্রাচীন রোমানদের দক্ষতা তৈরি করেছিল বেশ কিছু কালজয়ী বিস্ময়, যেগুলোর মধ্যে ১ হাজার ৬০০ বছরের পুরনো অসাধারণ এক শিল্পকর্মকে টেক্কা দেওয়া কঠিন, যা বর্তমানে ব্রিটিশ মিউজিয়ামে সংরক্ষিত রয়েছে।
আলোর উৎসের অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে এই পাত্র বা ‘লাইকারগাস কাপ’-এর রং পরিবর্তিত হয়। সাধারণ আলোতে এর রং দেখায় সবুজ। তবে পেছনের দিক থেকে আলো ফেললে এটা হয়ে ওঠে চুনি পাথরের মতো লাল।
অপটিকাল বিজ্ঞানের এ বিস্ময়কর কৌশল শত শত বছর ধরে ইতিহাসবিদ ও কাচশিল্পীদের দারুণভাবে বিস্মিত করে এসেছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান।
অবশেষে এ প্রাচীন রোমান ‘ডাইক্রোয়িক’ বা দ্বিবর্ণিল কাচের মূল টুকরা থেকে পাওয়া সূত্রে ‘ইউনিভার্সিটি অফ শেফিল্ড’-এর বিজ্ঞানীরা এই বিস্ময়কর রূপান্তর সফলভাবে পুনরায় তৈরি করেছেন।
বিষয়টিকে ‘ভালোবাসা ও নিষ্ঠার কাজ’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন ‘ইউনিভার্সিটি অফ শেফিল্ড’-এর কেমিক্যাল, মেটিরিয়ালস অ্যান্ড বায়োলজিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং অনুষদের টেকনিশিয়ান ড. লিসা হল্যান্ডস।
তিনি বলেছেন, “মানুষ আগে এটা তৈরির চেষ্টা করে সীমিত সফলতা পেয়েছিল। তবে আমার কাছে এটা এক পরম জাদু।”
চতুর্থ শতকের এ মূল পাত্রটিতে হোমারের ‘ইলিয়াড’-এর ষষ্ঠ খণ্ড থেকে নেওয়া কিং লাইকারগাসের পৌরাণিক কাহিনীর খোদাইচিত্র রয়েছে।
সেখানে গভীর নিখুঁত কারুকাজে দেখানো হয়েছে মদ্যদেব ডায়োনিসাসের হাতে রাজা লাইকারগাসের পরাস্ত হওয়ার দৃশ্য, যেখানে লাইকারগাস একটি লতা দিয়ে বন্দী অবস্থায় রয়েছেন।
২০২২ সালে কাচ বিশেষজ্ঞদের আন্তর্জাতিক প্যানেল এটাকে বিশ্বের সাতটি অনন্য কাচ-বিস্ময়ের একটি হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
ড. হল্যান্ডস প্রখ্যাত রোমান কাচ বিশেষজ্ঞ প্রফেসর ক্যারোলিন জ্যাকসনের সঙ্গে তাদের প্রাথমিক গবেষণা পরিচালনা করেছেন।
এরপর তাদের সামনে মূল চ্যালেঞ্জ হিসেবে আসে কাচের ভেতর সোনা ও রূপার ন্যানোকণা যোগ করা, যেগুলো বালুকণার চেয়েও হাজার গুণ ছোট।
গবেষকরা কাচ গলিয়ে এক প্রকার ঘন তরল তৈরি করেছেন। এক হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রা থেকে কাচটি যখন ঠান্ডা হতে শুরু করে তখন এর ভেতরের কণাগুলোকে ঘিরে সোনা ও রূপার ন্যানো-ক্রিস্টাল জমাট বাঁধতে শুরু করে।
এ বৈজ্ঞানিক কৌশল ব্যাখ্যা করে ড. হল্যান্ডস বলেছেন, “সাদা আলো বিভিন্ন রঙের আলোর মিশ্রণ, যা আমরা আকাশে রংধনু উঠলে দেখতে পাই।
“ন্যানোকণাগুলো আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্যের চেয়ে অনেক ছোট হওয়ায় নির্দিষ্ট কিছু পরিস্থিতিতে পরমাণুর ইলেকট্রনকে প্রভাবিত করে বিশেষ কিছু রংকে আটকে দেয়।
“এই কাচের ক্ষেত্রে, যখন আলো এর ভেতর দিয়ে প্রবেশ করে তখন সোনা ও রূপার কণাগুলো নীল ও সবুজ রংকে আটকে দেয় এবং কেবল লাল ও কমলা রংকে পার হতে দেয়। আবার যখন আলো এর ওপর প্রতিফলিত হয়, তখন এসব কণা আলোকে চারদিকে ছড়িয়ে দেয়। ফলে আমরা দেখতে পাই অস্পষ্ট সবুজ রং।
“রোমানরা যদি আমাকে এটা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে দেখত তবে হয়ত হেসে বলত ‘এই সামান্য জিনিসটা বানাতে উনি এত সময় নিচ্ছেন কেন?’”
রোমানদের এই প্রাচীন জাদুকরী প্রভাবকে জীবন্ত করে তুলতে কাচশিল্পী এলিয়ট ওয়াকারকে দিয়ে সমসাময়িক এক কাচের ভাস্কর্য তৈরি করিয়েছে ‘ইউনিভার্সিটি অফ শেফিল্ড’।
লাইকারগাসের গল্প ও ‘ফার্নেস অ্যাটলাস’ ভাস্কর্যকে একত্র করে শিল্পকর্মটি তৈরি করা হয়েছে, যেখানে অ্যাটলাসের কাঁধের গোলকটির পরিবর্তে বসানো হয়েছে একটি কাপ।
এর মাধ্যমে প্রাচীন রোমান শিল্পীদের প্রতি সম্মান জানানো হয়েছে। শিল্পী এলিয়ট ওয়াকার বলেছেন, “আমার কাছে বিষয়টা রোমান কারিগরদের সঙ্গে এক গভীর সংযোগ।”
আগামী ৬ থেকে ১৫ নভেম্বর ‘ইউনিভার্সিটি অফ শেফিল্ড’-এর ‘ফেস্টিভাল অফ দ্য মাইন্ড’ চলাকালীন মিলেনিয়াম গ্যালারিতে এটা প্রদর্শনের জন্য উন্মুক্ত থাকবে এবং পরে এটা ‘টার্নার মিউজিয়াম অফ গ্লাস’-এ স্থায়ীভাবে দেখানো হবে।
‘ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন’-এর প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদানের ইমেরিটাস অধ্যাপক ইয়ান ফ্রিকস্টোন বলেছেন, ১৯৬০-এর দশকে অনুরূপ রঙের কাচ অনুকরণের চেষ্টা করা হয়েছিল। তবে শেফিল্ডের প্রকল্পটি আসল লাইকারগাস কাপের সবুজ ও লাল রঙের ছায়ার বেশি কাছাকাছি।
“এটা আরও বেশি উচ্চাভিলাষী ও নিখুঁত। আমি রোমাঞ্চিত হয়েছিলাম কারণ প্রথমবারের মতো আমি বুঝতে পেরেছি এসব রং ফুটিয়ে তোলা কতটা কঠিন ছিল। এটা আমাদের বুঝতে সাহায্য করবে, রোমান কারিগররা আসলে কীভাবে কাজ করতেন।
“রংটি চুল্লির ভেতরের পরিবেশের ওপর নির্ভরশীল ছিল। চুল্লিতে কাচের অবস্থান একটু এদিক-সেদিক হলেই রঙের ভিন্নতা চলে আসত... রঙের ওপর চুল্লির অবস্থানের এ সংবেদনশীলতা থেকে বোঝা যায়, রোমানদের পক্ষে রং নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন ছিল।
“বিষয়টি আমাকে ভাবায় যে, লাইকারগাস কাচের ক্ষেত্রে তারা যেন একরকম জ্যাকপট পেয়ে গিয়েছিল।”
লাল ও সবুজ রঙের তাৎপর্য সম্পর্কে ফ্রিকস্টোন বলেছেন, এসব রং আঙুরের পরিপক্বতা নির্দেশ করে।
“এখানে যে দৃশ্য ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, সেখানে আঙুরের লতাগুলো লাইকারগাসকে পাতালপুরীর দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে, যা হয়ত কোনো ধরনের পানীয় পানের উৎসবে ব্যবহার করা হত।”
