বিদ্যুৎ চলে গেলে কম্পিউটারের প্লাগ খুলে রাখা কেন জরুরি?
বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার কারণে হঠাৎ কম্পিউটার বন্ধ হয়ে যাওয়া মানেই সেটি নিরাপদ আছে এ ধারণা পুরোপুরি সঠিক নয়। পিসি এ দিক থেকে সংবেদনশীল।
বিদ্যুৎ যাওয়ার নির্দিষ্ট কোনো সময় থাকে না। আলো চলে গেলে বেশিরভাগ মানুষই ঘরের কোণে টর্চলাইট বা ফ্ল্যাশলাইট খুঁজতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন, কম্পিউটারের সুরক্ষার কথা তখন কারও মাথায় থাকে না।
অথচ বিদ্যুৎ ফিরে আসার পরও পিসি যদি ইলেকট্রিক সকেটে প্লাগ করা অবস্থায় থাকে তবে তা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে প্রযুক্তি সংবাদের সাইট এনগ্যাজেট।
অনেকেরই ধারণা, বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার কারণে হঠাৎ কম্পিউটার বন্ধ হয়ে যাওয়া মানেই সেটি নিরাপদ আছে। এ ধারণা পুরোপুরি সঠিক নয়। একটি বন্ধ কম্পিউটারও ঘরের ইলেকট্রিক ওয়্যারিংয়ের সঙ্গে যুক্ত থাকে। এ সংযোগই বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
পিসি এ দিক থেকে সংবেদনশীল। কারণ এর মাদারবোর্ড, র্যাম ও এসএসডি’র মতো বিভিন্ন যন্ত্রাংশ খুব সূক্ষ্ম সার্কিট দিয়ে তৈরি, যা অপ্রত্যাশিত ভোল্টেজের ওঠানামা একেবারেই সহ্য করতে পারে না।
ঝুঁকির মাত্রাটা কেমন তা স্পষ্ট করা প্রয়োজন। গ্রিড ওভারলোড, যন্ত্রপাতির ত্রুটি বা সার্কিট ট্রিপের কারণে অপ্রত্যাশিতভাবে বিদ্যুৎ চলে গেলে ইলেকট্রিক সিস্টেম নিমিষেই চুপচাপ বন্ধ হয়ে যায় না।
বিদ্যুৎ যাওয়ার আগের ও পরের মুহূর্তে ভোল্টেজে তীব্র তারতম্য ঘটতে পারে ও বিদ্যুৎ ফিরে আসার ঠিক মুহূর্তে যে বৈদ্যুতিক সার্জ বা অতিরিক্ত ভোল্টেজের ধাক্কা লাগে তা বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার চেয়েও ক্ষতিকর।
এ বিষয়ে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা প্রায়ই সতর্ক করে বলেন, “বিদ্যুৎ বিভ্রাটের চেয়ে বিদ্যুৎ ফিরে আসার সময়কার ভোল্টেজ সার্জ বা ওঠানামাই কম্পিউটারের হার্ডওয়্যারের জন্য বেশি ক্ষতিকর।”
গৃহস্থালি বিভিন্ন সার্কিটে নির্দিষ্ট মাত্রার ভোল্টেজ প্রবাহিত হলেও এর চেয়ে সামান্য বেশি মাত্রার ভোল্টেজের ধাক্কাই কম্পিউটারের সংবেদনশীল বিভিন্ন যন্ত্রাংশকে চিরতরে নষ্ট করার জন্য যথেষ্ট।
কারো কম্পিউটার সেটআপ কীভাবে সুরক্ষিত রাখতে হবে সে বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা থাকলে ব্যবহারকারী বড় ধরনের মেরামত খরচ, মূল্যবান ডেটা হারানোর ঝুঁকি ও খুচরা যন্ত্রপাতির অপ্রয়োজনীয় ঝামেলা থেকে সহজেই রক্ষা পেতে পারেন।
বিদ্যুৎ চলে যাওয়া পেছনে লুকিয়ে থাকা ঝুঁকি
বিদ্যুৎ যাওয়ার আগে পিসি বন্ধ করা হলেও তা পুরোপুরি নিরাপদ নয়। কম্পিউটার স্ক্রিন বন্ধ বা কালো থাকলেও বিদ্যুৎ ফিরে আসার পর বৈদ্যুতিক তারের মাধ্যমে কারেন্ট সরাসরি ভেতরের যন্ত্রাংশে পৌঁছাতে পারে।
পাওয়ার সার্জ বা হঠাৎ ভোল্টেজ বেড়ে যাওয়ায়ই এর সবচেয়ে বড় কারণ। বজ্রপাত বা আশপাশের পাওয়ার লাইনে কোনো ত্রুটির কারণে বৈদ্যুতিক স্রোতে হঠাৎ তীব্র উল্লম্ফন ঘটলে এ সার্জ দেখা দেয়।
ব্যবহারকারীর বাড়িতে সরাসরি বজ্রপাত না হলেও স্থানীয় ট্রান্সফর্মার হয়ে ঘরের ওয়ারিংয়ে এ অতিরিক্ত ভোল্টেজ ঢুকে পড়তে পারে। বিদ্যুৎ বিভ্রাটের পর গ্রিড পুনরায় চালু হলে প্রায়ই অতিরিক্ত ভোল্টেজের ধাক্কা বা স্পাইক দেখা যায়। ফলে আলো ফিরে আসার মানে এই নয় যে কম্পিউটারের বিপদ কেটে গেছে।
পাশাপাশি, বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার সময় কারো পিসি চালু থাকলে সেই আকস্মিক বিদ্যুৎহীনতাও নানা সমস্যার জন্ম দিতে পারে।
অপারেটিং সিস্টেম আপডেট বা ফাইল সেইভ করার সময় হুট করে বিদ্যুৎ চলে গেলে ডেটা করাপ্ট বা নষ্ট হয়ে যেতে পারে, যা ব্যবহারকারীর পুরো সিস্টেমকে অকার্যকর করে তুলতে পারে।
এ ছাড়া, কম্পিউটারে প্রচলিত ‘হার্ড ডিস্ক ড্রাইভ’ বা এইচডিডি থাকে তবে হঠাৎ পাওয়ার কাটের কারণে সেটার মেকানিক্যাল হেডও স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
পাওয়ার কাটের সময় পিসি সুরক্ষার বিভিন্ন উপায়
ঝড়-বৃষ্টি বা দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া শুরু হওয়ার পূর্বাভাস পেলে কোনো ঝুঁকি না নিয়ে কম্পিউটার শাট ডাউন করে ওয়ালের প্লাগ খুলে ফেলা উচিত। এরইমধ্যে বিদ্যুৎ চলে গিয়ে থাকলে কম্পিউটারটি আনপ্লাগ করে দেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
ব্যবহারকারীর ইন্টারনেট রাউটারটিও খুলে রাখুন। কারণ কালবৈশাখী বা বজ্রঝড়ের সময় সবচেয়ে বেশি পুড়ে যাওয়া বিভিন্ন ডিভাইসের মধ্যে রাউটার অন্যতম।
রাউটার নিয়মিত রিস্টার্ট করাও এর ‘স্বাস্থ্যের’ জন্য ভালো। ফলে তা আনপ্লাগ করা বাড়তি কোনো ক্ষতি করবে না। কারো বাসায় থাকা টেলিভিশন বা অন্যান্য দামি ইলেকট্রনিক্স সামগ্রীও সুরক্ষিত রাখতে একইভাবে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে রাখুন।
ডেস্কটপ পিসির ক্ষেত্রে ‘পাওয়ার সাপ্লাই ইউনিট’ বা পিএসইউ-এর সুইচ বন্ধ রাখলে সিস্টেমে কারেন্ট প্রবেশ করা কিছুটা ঠেকানো সম্ভব। তবে সরাসরি বজ্রপাতের মতো চরম কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘটলে তাতেও ক্ষতি হতে পারে।
এর চেয়ে ভালো উপায় একটি ভালো মানের সার্জ প্রটেক্টর ব্যবহার করা। একটি মানসম্মত সার্জ প্রটেক্টর প্রথম সারির প্রতিরক্ষা হিসেবে কাজ করে ও ডিভাইসে পৌঁছানোর আগেই অতিরিক্ত ভোল্টেজের ধাক্কা বা স্পাইক শুষে নেয়।
এ ক্ষেত্রে আরও ভালো সমাধান হতে পারে একটি ‘আনইন্টারাপ্টিবল পাওয়ার সাপ্লাই’ বা ইউপিএস ব্যবহার করা। একটি ইউপিএসে সার্জ সুরক্ষার পাশাপাশি ব্যাটারি ব্যাকআপের সুবিধাও থাকে।
ইউপিএস বিভিন্ন ডিভাইসকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সচল রাখার জন্য তৈরি না হলেও তা সংক্ষিপ্ত পাওয়ার কাটের সময় হঠাৎ শাট ডাউন হওয়া রোধ করে। ফলে কাজের ফাইল সেইভ করার ও হুট করে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার বদলে নিরাপদে পিসি শাট ডাউন করার যথেষ্ট সময় পাওয়া যায়।
পুরো বাড়ির নিরাপত্তার জন্য আরও বড় পরিসরে ভাবতে চাইলে কোনো লাইসেন্সপ্রাপ্ত ইলেকট্রিশিয়ানকে দিয়ে সরাসরি বৈদ্যুতিক প্যানেলে সার্জ প্রোটেকশন ইনস্টল করিয়ে নিতে পারেন, যা ঘরের প্রতিটি আউটলেটকে সুরক্ষিত রাখবে।
এ ছাড়া, বিদ্যুৎ ফিরে আসার সঙ্গে সঙ্গেই তাড়াহুড়ো করে সবকিছুর প্লাগ আবার লাইনে লাগিয়ে দেবেন না। বিদ্যুৎ আবার চলে যাওয়ার আশঙ্কা এড়াতে কয়েক মিনিট অপেক্ষা করুন।
সংযোগ দেওয়ার সময় প্রথমে সার্জ প্রটেক্টরটি প্লাগ ইন করুন, এরপর পিসি ও অন্যান্য পেরিফেরাল বা অনুষঙ্গ ডিভাইসগুলোর সংযোগ দিন। পাওয়ার কাটের সময় পিসির প্লাগ খুলে রাখতে কেবল কয়েক সেকেন্ড সময় লাগে, অথচ শখের ও দামি কম্পিউটারটি সুরক্ষিত রাখার তা অন্যতম কার্যকর উপায়।
