হোয়াইট হাউসের এআই বৈঠক থেকে কেন দূরে রইল অ্যাপল?
অন্যান্য সকল শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি কোম্পানির প্রধান ট্রাম্পের সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজে অংশ নিলেও বৈঠকে দেখা যায়নি অ্যাপলের চেয়ারম্যান টিম কুক ও সিইও জন টার্নাসকে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করতে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর শীর্ষ নির্বাহীদের হোয়াইট হাউসে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প।
তবে মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত এ উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে গুরুত্বপূর্ণ এক প্রযুক্তি জায়ান্টের অনুপস্থিতি সবার নজরে এসেছে।
কােম্পানিটি অ্যাপল।
অন্যান্য সকল শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি কোম্পানির প্রধানরা ট্রাম্পের সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজে অংশ নিলেও বৈঠকে দেখা যায়নি অ্যাপলের নির্বাহী চেয়ারম্যান টিম কুক বা সিইও পদে তার উত্তরসূরি জন টার্নাসকে।
এ বিষয়ে আমেরিকান সংবাদমাধ্যম সিএনবিসি’র মন্তব্যের অনুরাধে সাড়া দেয়নি অ্যাপল ও হোয়াইট হাউস।
অ্যাপলের এ অনুপস্থিতির পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছে, এআই প্রযুক্তির দৌড়ে প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় কিছুটা পিছিয়ে থাকার কারণেই হয়ত অ্যাপলকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি।
এদিকে, সিলিকন ভ্যালির প্রভাবশালী বিনিয়োগকারী ও ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের ঘনিষ্ঠ মিত্র ‘অল্টিমিটার ক্যাপিটাল’-এর সিইও ব্র্যাড গার্স্টনার সিএনবিসি’র ‘স্কোয়াক বক্স’ অনুষ্ঠানে অ্যাপলের এই না থাকাকে ‘গুরুত্বহীন’ বিষয় বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।
“আমি আপনাদের আশ্বস্ত করতে পারি, এ বিষয়ে তারা সম্পূর্ণভাবে ওয়াকিবহাল রয়েছে ও আমার বিশ্বাস, এখানকার সবকিছুর সঙ্গেই তাদের মত রয়েছে।”
তিনি বলেছেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকারি মহলে অ্যাপলের প্রধান মুখ হিসেবে টিম কুক কেবল এক সপ্তাহ আগেই হোয়াইট হাউসে উপস্থিত ছিলেন। সে সময় তিনি চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে ট্রাম্পের আয়োজিত রাষ্ট্রীয় ভোজেও অংশ নিয়েছিলেন।
গেল সেপ্টেম্বরে অ্যাপলের দীর্ঘদিনের প্রধান নির্বাহীর পদ থেকে সরে দাঁড়ান টিম কুক এবং হার্ডওয়্যার বিশেষজ্ঞ জন টার্নাসের হাতে কোম্পানির চাবিকাঠি তুলে দেন।
দায়িত্ব হস্তান্তরের অংশ হিসেবে অ্যাপল বলেছিল, নির্বাহী চেয়ারম্যান হিসেবে টিম কুক কোম্পানির হয়ে ‘বিশ্বের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষার’ কাজটি চালিয়ে যাবেন।
গেল সপ্তাহে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় ভোজে তার উপস্থিতি সেই নতুন ভূমিকাকেই আরও স্পষ্ট করেছে।
বহু বছর ধরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সুসম্পর্ক ধরে রাখতে কাজ করে গেছেন টিম কুক। ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের বিভিন্ন ইভেন্টে তিনি ১০ বারেরও বেশি প্রকাশ্যে উপস্থিত হয়েছেন।
এর মধ্যে রয়েছে ট্রাম্পের অভিষেক অনুষ্ঠান, ওভাল অফিস, ডাভোসের বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম ও একাধিক মহাদেশে আয়োজিত রাষ্ট্রীয় ভোজসভা। হোয়াইট হাউসে ‘মেলানিয়া’ চলচ্চিত্রের প্রদর্শনীতেও তিনি অংশ নিয়েছিলেন।
গত দুই বছরে ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনার সময় টিম কুক সবসময় সুনির্দিষ্ট বার্তায় অটল ছিলেন, যেখানে অ্যাপলের উৎপাদন স্বার্থ ও বাণিজ্য ইস্যুগুলো সুরক্ষিত রাখা, বিশেষ করে যখন কোম্পানির পণ্যগুলো শুল্কের মুখে পড়তে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রে আইফোন উৎপাদনের জন্য ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের দাবির মুখেও অ্যাপল মার্কিন মুলুকে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির মাধ্যমে ট্রাম্প প্রশাসনকে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করে গেছে।
এদিকে, সম্প্রতি বিশ্বজুড়ে যন্ত্রাংশের দাম আকাশচুম্বী হওয়ায় অ্যাপল চীনা প্রযুক্তির মেমোরি চিপ ব্যবহারের চেষ্টা করছে বলে খবর প্রকাশ পেয়েছে, যার জন্য মার্কিন বাণিজ্য বিভাগের লাইসেন্স প্রয়োজন।
তবে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মার্কিন বাণিজ্য সচিব লুটনিক বলেছেন, “ট্রাম্প প্রশাসন এর পক্ষে নয়”।
অ্যাপলের ভিন্ন কৌশল
গার্স্টনার বলেছেন, হোয়াইট হাউসের মধ্যাহ্নভোজে আমন্ত্রিত বিভিন্ন কোম্পানি হল সেসব কোম্পানি, যারা ‘মডেল উন্নয়নের ক্ষেত্রে সত্যিই সীমানা ছাড়িয়ে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে’।
তবে অ্যাপল ঠিক সেই তালিকায় পড়ে না।
ওপেনএআই বা অ্যানথ্রপিকের মতো কোম্পানি যেখানে বড় ও শক্তিশালী ‘ফ্রন্টিয়ার’ মডেল নিয়ে কাজ করছে সেখানে আইফোন নির্মাতা কোম্পানি অ্যাপল নিজস্ব এআই মডেলগুলো অনেক ছোট ও সক্ষম।
অ্যাপলের তৈরি এআই মডেল আইফোন ও ম্যাক কম্পিউটারের নিজস্ব সিলিকন চিপে চলার উপযোগী করে ডিজাইন করা হয়েছে।
এগুলোর মাধ্যমে সিরির কিছু কাজ পরিচালিত হয়, অন্যদিকে ওপেনএআই ও অ্যানথ্রপিকের মডেলগুলো পরিচালনা করতে এনভিডিয়ার তৈরি বড় চিপ ক্লাস্টার প্রয়োজন।
অ্যাপল ভোক্তা প্রযুক্তি কোম্পানি হলেও ফ্রন্টিয়ার ল্যাবগুলোর এআই প্রতিযোগিতা এন্টারপ্রাইজ বা প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে হয়। নিজেদের মডেল তৈরির জন্য অ্যাপল গুগলের সঙ্গে পার্টনারশিপ করেছে।
এ ছাড়া, গুগল, মাইক্রোসফট, মেটা ও অ্যামাজন যে পরিমাণ মূলধনী ব্যয় করছে তার তুলনায় অ্যাপলের এই খাতের বিনিয়োগ বেশ সামান্যই বলা চলে।
কিছু বিনিয়োগকারী এআই প্রযুক্তির দৌড়ে অ্যাপল পিছিয়ে পড়ছে কি না তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হলেও বাজার এটাকে অধিক ব্যয়বহুল অন্যান্য টেক জায়ান্টের বিপরীতে নিরাপদ ও স্থিতিশীল বিকল্প হিসেবে দেখছে।
কোম্পানিটি সম্প্রতি একটি নতুন এআই সক্ষমতাওয়ালা সিরি বাজারে এনেছে, যা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ইতিবাচক রিভিউ পেয়েছে।
২০২৬ সালে এখন পর্যন্ত অ্যাপলের শেয়ারের দাম ২২.৫ শতাংশ বেড়েছে, যা নাসডাক সূচক ও এনভিডিয়া ছাড়া প্রায় অন্য সব শীর্ষ প্রযুক্তি জায়ান্টের তুলনায় বেশি। এনভিডিয়ার শেয়ার মূল্যও প্রায় একই রকম বেড়েছে।
অ্যাপল এআইয়ের সক্ষমতা ও প্রযুক্তির ভবিষ্যতে এর ভূমিকার কথা জোরালোভাবে প্রচার করলেও ট্রাম্পের মধ্যাহ্নভোজের মূল আলোচ্য বিষয়, অর্থাৎ এআই নিরাপত্তা নিয়ে জনসচেতনতামূলক বিতর্কে কোম্পানিটির নির্বাহীদের খুব একটা দেখা যায় না।
ওপেনএআই, অ্যানথ্রপিক, মেটা বা মাইক্রোসফটের মতো কোম্পানিগুলোর প্রধানরা যেমন দীর্ঘ ইশতেহার প্রকাশ করেছেন অ্যাপলের পক্ষ থেকে তেমন কাউকে কিছু লিখতে দেখা যায়নি।
মঙ্গলবারের এ বৈঠকের অংশ হিসেবে হোয়াইট হাউস ও শীর্ষ এআই কোম্পানি বিভিন্ন নিরাপত্তা ব্যবস্থায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়ে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে।
বৈঠকের পর এনভিডিয়ার সিইও জেনসেন হুয়াং, ওপেনএআইয়ের সিওও গ্রেগ ব্রকম্যান, মেটার সিইও মার্ক জাকারবার্গ, গুগলের সিইও সুন্দার পিচাই ও অ্যানথ্রপিকের সিইও দারিও আমোদেই সবাই সেই নথিতে স্বাক্ষর করেছেন।
টিম কুক বিগত বছরগুলোতে বেশ কয়েকবার বলেছেন, যেসব নীতি ‘আমাদের কোম্পানির সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে সম্পৃক্ত’, কেবল সেসব নীতিনির্ধারণী বিষয়েই অ্যাপল প্রকাশ্যে মন্তব্য করার সম্ভাবনা বেশি রাখে।
ফ্রন্টিয়ার লেভেলের এআই নিরাপত্তা সংক্রান্ত জটিলতাগুলোর সঙ্গে অ্যাপল সরাসরি কাজ করছে না।
২০২১ সালের এক ‘ডিলবুক’ সাক্ষাৎকারে টিম কুক বলেছিলেন, “বিষয়টি যদি আমাদের নীতির সঙ্গে না মেলে এবং এমন হয় যে সেখানে আমরা কেবল আরেকটি কণ্ঠস্বর হয়ে থাকব ও আমাদের কোনো অনন্য দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরার সুযোগ থাকবে না তবে আমরা সে বিষয়ে কোনো কথাই বলি না।”
