১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

হিমবাহ রক্ষায় ভেড়ার পশম: নতুন উদ্যোগ সুইজারল্যান্ডের

এসব সূর্যালোক প্রতিফলক কভার তাপ শোষণ কমিয়ে বরফ গলা কিছুটা ধীর করে।

হিমবাহ রক্ষায় ভেড়ার পশম: নতুন উদ্যোগ সুইজারল্যান্ডের
এবারের গ্রীষ্মের রেকর্ড তাপমাত্রা অন্যান্যবারের চেয়ে কয়েক সপ্তাহ আগেই হিমবাহের তুষার গলিয়ে দিয়েছে। ছবি: রয়টার্স

প্রযুক্তি ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 04 Sep 2026, 07:07 PM

Updated : 17 Sep 2026, 02:54 AM

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে নিজেদের হিমবাহ বা গ্লেসিয়ারের দ্রুত গলে যাওয়া ঠেকাতে আল্পস পর্বতমালায় ব্যতিক্রমী এক পরীক্ষা চালাচ্ছেন সুইজারল্যান্ডের গবেষকরা।

প্রকৃতির রক্ষাকবচ হিসেবে তারা বেছে নিয়েছেন দেশটির অবহেলিত এক প্রাকৃতিক সম্পদ ভেড়ার পশম বা উল।

বিগত কয়েক সহস্রাব্দ ধরে আল্পসের রূপ নির্ধারণকারী বরফাবৃত বিভিন্ন হিমবাহকে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের হাত থেকে রক্ষা করতে বছরের পর বছর ধরে গ্রীষ্মকালে সিন্থেটিক টারপোলিন বা কৃত্রিম ত্রিপল ব্যবহার করা হচ্ছিল।

এসব সূর্যালোক প্রতিফলক কভার তাপ শোষণ কমিয়ে বরফ গলা কিছুটা ধীর করে। তবে প্লাস্টিকনির্ভর এসব কৃত্রিম ত্রিপল পরিবেশবান্ধব নয় এমন ‘মাইক্রোফাইবার’ ছড়ায়।

পরিবেশবাদী সংগঠন ‘সামিট ফাউন্ডেশন’ ও ‘ইউনিভার্সিটি অফ লোজান’-এর যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত ‘কিপ ইট উল’ প্রকল্পে এখন প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে উল ব্যবহৃত হচ্ছে, যা পশ্চিম সুইজারল্যান্ডের ‘সানফ্লোরোঁ হিমবাহ’-এর বরফ গলে যাওয়া ঠেকাতে পরীক্ষামূলকভাবে বিছানো হয়েছে।

গ্রীষ্মের রেকর্ড তাপমাত্রা অন্যান্যবারের চেয়ে কয়েক সপ্তাহ আগেই হিমবাহের তুষার গলিয়ে দিয়েছে। এর ফলে ব্যাপক বরফক্ষয় ঘটছে, যা পাহাড়ের ধস বা রকস্লাইডের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।

২০২৫ সালে সুইজারল্যান্ডের ‘ব্লাটেন’ গ্রাম ধ্বংসের পেছনেও এমন ধস দায়ী ছিল, যার রেশ ধরে গেল সপ্তাহে হিমালয় অঞ্চলেও এক প্রলয়ঙ্করী আকস্মিক বন্যা দেখা দিয়েছে।

প্রকল্প ব্যবস্থাপক টিমোথি স্টেইনার বলেছেন, প্রতি বছর সুইজারল্যান্ডের মোট উলের ৪০ থেকে ৭০ শতাংশই ফেলে দেওয়া বা নষ্ট হয়। সেই বর্জ্যকে কাজে লাগানোর পাশাপাশি কৃত্রিম ত্রিপলের পরিবেশবান্ধব ও পচনশীল বিকল্প খুঁজে বের করাই তাদের প্রধান লক্ষ্য।

‘ইউনিভার্সিটি অফ লোজান’-এর চারজন স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থীর মাথায় প্রথম এ ধারণা আসে এবং তারা তা বাস্তবায়নে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেন।

এ বছরের জুনে সুইজারল্যান্ডের প্রযুক্তি কোম্পানি ‘ফিসোল্যান’-এর তৈরি দুটি উলের বিশেষ কম্বল সানফ্লোরোঁ হিমবাহের ২০০ বর্গমিটার এলাকায় বিছানো হয়।

গ্রীষ্মকালজুড়ে গবেষকরা এসব কম্বলের কার্যকারিতা সাধারণ প্রথাগত জিওটেক্সটাইল কভারের সঙ্গে তুলনা করে দেখেছেন। প্রাথমিক ফলাফল তাদের প্রত্যাশাকেও ছাড়িয়ে গেছে।

প্রকল্প ব্যবস্থাপক স্টেইনার বলেছেন, প্রতি দুই সপ্তাহ অন্তর নেওয়া পরিমাপ অনুসারে বরফ গলা ঠেকাতে কৃত্রিম কভারগুলোর মতোই কার্যকর ভূমিকা রেখেছে উলের তৈরি এ কম্বল।

উপাদানের স্থায়িত্ব দেখে নিজেই বিস্ময় প্রকাশ করেছেন ফিসোল্যান-এর নিকলাউস সেগেসার। তিনি বলেছেন, “আমি ভেবেছিলাম এটা অতটা টেকসই হবে না।”

গবেষক দলের সদস্য ও শিক্ষার্থী এলিয়ট গ্যাফিওট বলেছেন, কাজ শুরুর আগে তারাও ফলাফল নিয়ে নিশ্চিত ছিলেন না।

“এখন আমরা হাত দিয়ে স্পর্শ করার মতো এক বাস্তব ফলাফল পেয়েছি, যা বিস্ময়কর রকমের ভালো কাজ করেছে।”

তবে এ প্রকল্পের উদ্যোক্তারা বলেছেন, উলের কম্বল কখনোই বৈশ্বিক উষ্ণায়নের স্থায়ী সমাধান নয়। বর্তমানে সুইজারল্যান্ডের হিমবাহ এলাকার কেবল ০ দশমিক ০২ শতাংশ জায়গা সুরক্ষামূলক কভার দিয়ে ঢেকে রাখা সম্ভব হয়েছে।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, মূল সমস্যা সমাধানে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে নিঃসৃত গ্রিনহাউস গ্যাসের নির্গমন কমানোই বরফক্ষয় রোধের একমাত্র কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদী উপায়।