Published : 07 Jul 2025, 01:42 AM
বিল গেটসের পারমাণবিক শক্তি বিষয়ক নতুন কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করেছে মার্কিন সার্চ জায়ান্ট গুগল। কোম্পানি দুটির এমন পদক্ষেপ বিশ্বে ফিউশন শক্তির প্রথমদিকের বাণিজ্যিক চুক্তিগুলোর মধ্যে একটি, যেটিকে ভবিষ্যতে প্রযুক্তির ওপর বড় বাজি হিসাবে দেখছেন অনেকে।
মার্কিন বাণিজ্য দৈনিক ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল প্রতিবেদনে লিখেছে, এ চুক্তির আওতায় বিদ্যুৎ তৈরিতে নিউক্লিয়ার ফিউশন শক্তি ব্যবহার করবে তারা। নিউক্লিয়ার ফিউশন এমন এক শক্তি, যা সূর্য বা এমন নক্ষত্রের শক্তি উৎপাদন পদ্ধতির ওপর ভিত্তি করে তৈরি। এর আগে কখনও বাণিজ্যিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ফিউশন শক্তির ব্যবহার হয়নি। গুগল এ চুক্তিটি করেছে নতুন কোম্পানি ‘কমনওয়েলথ ফিউশন সিস্টেমস’ বা সিএফএস-এর সঙ্গে।
বিল গেটসের প্রযুক্তি তহবিল ‘ব্রেকথ্রু এনার্জি ভেঞ্চার্স’-এর সহায়তায় পরিচালিত কোম্পানি সিএফএস-এর লক্ষ্য রয়েছে ২০৩০-এর দশকে বাণিজ্যিকভাবে ফিউশন থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করার।
এ নতুন ধরনের বিদ্যুৎ উৎপাদন পদ্ধতি ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়ার চেস্টারফিল্ড কাউন্টিতে নিজেদের প্রথম বিদ্যুৎ কেন্দ্র বানাচ্ছে সিএফসি। এ কেন্দ্র থেকে গুগলের কাছে ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বিক্রির চুক্তি করেছে তারা, যা প্রায় ৭৫ হাজার বাড়ির বিদ্যুত চাহিদার সমান। কোনো গ্রাহক ও ফিউশন এনার্জি কোম্পানির মধ্যে এটিই প্রথম সরাসরি চুক্তি এবং এ ধরনের বিদ্যুৎ সরবরাহের দিক থেকেও সবচেয়ে বড় চুক্তি এটি।
এ চুক্তিতে প্ল্যান্ট যা বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে তার অর্ধেক আগাম কিনে নিয়েছে গ্রাহক এবং ভবিষ্যতে আরও প্ল্যান্ট তৈরি হলে সেখান থেকেও বিদ্যুৎ কেনার সুযোগ থাকবে।
২০২৩ সালে ‘হেলিয়ন এনার্জি’ নামের এক ফিউশন শক্তি কোম্পানির সঙ্গে ৫০ মেগাওয়াট ফিউশন বিদ্যুৎ কেনার চুক্তি করেছে মাইক্রোসফট। এ বিদ্যুৎ ‘কনস্টেলেশন এনার্জি’ নামের এক কোম্পানির মাধ্যমে সরবরাহ করবে তারা। চুক্তিতে ২০২৮ সালের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে কোম্পানিটি।
যুক্তরাষ্ট্রের ‘ম্যাসাচুসেটস ইন্সটিটিউট অফ টেকনোলজি’ বা এমআইটি-এর ‘প্লাজমা সায়েন্স অ্যান্ড ফিউশন সেন্টার’ থেকে আলাদা হয়ে তৈরি হয়েছে সিএফএস। এখন পর্যন্ত তারা দুইশো কোটি ডলারের বেশি অর্থ সংগ্রহ করেছে। গুগলের সঙ্গে নিজেদের চুক্তির সঠিক অর্থের পরিমাণ না জানালেও কোম্পানিটি বলেছে, গুগলের সঙ্গে তাদের বড় অঙ্কের চুক্তি হয়েছে।
ফিউশন হচ্ছে শক্তি উৎপাদনের একটি পদ্ধতি, যেখানে বিভিন্ন পরমাণুকে একসঙ্গে মিলিয়ে শক্তি তৈরি করা হয়। বর্তমানে যেসব পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র আছে, তারা নিউক্লিয়ার ফিশন ব্যবহার করে অর্থাৎ পরমাণু ভেঙে শক্তি তৈরি করে। ফিউশন প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রচুর পরিমাণে ও প্রায় সীমাহীন শক্তি তৈরি করা সম্ভব, বিশেষ করে হাইড্রোজেনের মতো সাধারণ উপাদান ব্যবহার করে। এর আরেকটি বড় সুবিধা হচ্ছে, ফিউশন প্রযুক্তি বর্তমানের ফিশনের তুলনায় অনেক বেশি নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব।
ডব্লিউএসজে প্রতিবেদনে লিখেছে, এখনও পর্যন্ত কোনো কোম্পানি বাণিজ্যিকভাবে ফিউশন শক্তি তৈরি না করলেও এ প্রযুক্তিকে বাস্তবে ব্যবহারযোগ্য করে তোলার চেষ্টা করছে অনেক স্টার্টআপ। আবার অনেকে একে পরিবেশবান্ধব শক্তির ‘হলি গ্রেইল’ বা চূড়ান্ত সমাধান হিসেবেও দেখছেন।
এদিকে, সিএফসি কোম্পানি ‘টোকামাক’ ফিউশন পদ্ধতি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা করছে, যেখানে উচ্চ-তাপমাত্রার ‘সুপারকন্ডাক্টিং ম্যাগনেট’ বা এক ধরনের শক্তিশালী চুম্বক ব্যবহার করবে তারা, যা এমআইটি’র সঙ্গে মিলে তৈরি করছে কোম্পানিটি।
গুগলের সঙ্গে চুক্তি নিয়ে সিএফএস-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী বব মুমগার্ড বলেছেন, “এ চুক্তি থেকেই ইঙ্গিত মেলে, ফিউশন শক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে মানুষ এখন আশাবাদী এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান একসঙ্গে মিলে এটিকে সফল করতে আগ্রহী, যা এ পুরো খাতের জন্য বড় এক ইতিবাচক বার্তা।”
মুমগার্ড আরও বলেছেন, এ চুক্তি পুরো ফিউশন শিল্পকে আরও সক্রিয় করতে সাহায্যের পাশাপাশি এ প্রযুক্তির জন্য ভবিষ্যতে আরও ক্রেতাকে আকৃষ্ট করবে।
“ফিউশনকে এমন জায়গায় নিয়ে যাচ্ছে এ চুক্তি, যেখানে ফিউশন শক্তির মাধ্যমে বিদ্যুৎ তৈরির বিষয়টি কেবল ভবিষ্যতের কল্পনা হয়ে থাকবে না। এটি এখন বাস্তব।”
এদিকে, নিউক্লিয়ার শক্তিকে এগিয়ে নিতে চাইছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পও। তিনি এমন কিছু নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেছেন, যা আগামী ২৫ বছরে নিউক্লিয়ার শক্তি উৎপাদন চার গুণ বাড়াতে পারে।
তবে এসব চুক্তি বেশিরভাগই ফিউশন প্রযুক্তি নয়, বরং ফিশন শক্তির উপর নির্ভর করে তৈরি হবে। আর এ প্রযুক্তি বেশ পুরানো ও যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৫৭ সাল থেকে ব্যবহৃত হচ্ছে।