০৮ অক্টোবর ২০২৬, ২৩ আশ্বিন ১৪৩৩

প্রচলিত ঘড়িকে পেছনে ফেলে তৈরি হল বিশ্বের প্রথম নিউক্লিয়ার ক্লক

১৯৪৯ সালে প্রথম উদ্ভাবিত নির্ভুল ‘অ্যাটমিক ক্লক’ বা পারমাণবিক ঘড়ির পরবর্তী প্রজন্ম হচ্ছে এ দুটি নতুন ডিভাইস।

প্রচলিত ঘড়িকে পেছনে ফেলে তৈরি হল বিশ্বের প্রথম নিউক্লিয়ার ক্লক

নিউক্লিয়ার ক্লক এখনও এর কাঙ্ক্ষিত সক্ষমতা থেকে ‘অনেক দূরে’ রয়েছে এবং গবেষকরা এই প্রযুক্তির পূর্ণতা দেওয়ার জন্য কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। ছবি: রয়টার্স

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 08 Oct 2026, 11:38 AM

Updated : 08 Oct 2026, 11:38 AM

সময় পরিমাপের ধারণায় বড় পরির্বতন এনে ভিয়েনা ও বেইজিংয়ে আলাদাভাবে কাজ করা দুটি বিজ্ঞানী দল বিশ্বের প্রথম দুটি কার্যকর ‘নিউক্লিয়ার ক্লক’ বা পারমাণবিক নিউক্লিয়াসভিত্তিক ঘড়ি তৈরি করেছেন।

গবেষকরা বলছেন, সময় গণনার এই অগ্রগতি ভবিষ্যতে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সুদূরপ্রসারী ব্যবহারিক প্রয়োগের পাশাপাশি মৌলিক পদার্থবিদ্যা নিয়ে গবেষণার নতুন দুয়ার উন্মোচন করবে।

১৯৪৯ সালে প্রথম উদ্ভাবিত নির্ভুল ‘অ্যাটমিক ক্লক’ বা পারমাণবিক ঘড়ির পরবর্তী প্রজন্ম হচ্ছে এই দুটি নতুন ডিভাইস।

বুধবার বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘নেচার’-এ প্রকাশ পাওয়া আলাদা দুটি গবেষণাপত্রে এ অর্জনের বিবরণ দিয়ে গবেষক দলগুলো বলেছে, প্রচলিত সেরা পারমাণবিক ঘড়িগুলোকেও ছাড়িয়ে যাওয়ার সক্ষমতা রয়েছে নতুন দুই নিউক্লিয়ার ঘড়ির। তবে বর্তমানে এগুলো সেই পর্যায়ে পৌঁছায়নি।

অনেকের মনে হতে পারে, পরমাণু সংযোজন বা বিভাজন শক্তির ওপর ভিত্তি করে এগুলো তৈরি। ফলে এগুলোর নাম নিউক্লিয়ার ক্লক। তবে একটি পরমাণুর নিউক্লিয়াসের সঙ্গে আলোর (উচ্চ সক্ষমতার লেজার রশ্মি) মিথস্ক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করে সময় গণনা করা হয় বলেই এদের এমন নামকরণ হয়েছে।

এ দুটি নিউক্লিয়ার ঘড়িই ‘থোরিয়াম-২২৯’ নামের বিশেষ এক আইসোটোপের ওপর ভিত্তি করে তৈরি, যা কঠিন অবস্থার ক্যালসিয়াম ফ্লোরাইড স্ফটিকের মধ্যে আবদ্ধ থাকে।

বেইজিং ঘড়ি তৈরির পেছনের গবেষক দলের নেতৃত্ব দেওয়া ‘সিংহুয়া ইউনিভার্সিটি’র পদার্থবিদ শিকিয়ান ডিং বলেছেন, “দুটি দল সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কাজ করেছে ও ভিন্ন পরীক্ষামূলক পদ্ধতির মাধ্যমে প্রায় একই সময়ে কার্যকর থোরিয়াম-২২৯ নিউক্লিয়ার ক্লক তৈরি করতে পেরেছে।”

ভিয়েনা ঘড়ির পেছনের গবেষক দলের নেতৃত্বে থাকা অস্ট্রিয়ার ‘ইউনিভার্সিটি অফ ভিয়েনা’র পদার্থবিদ থরস্টেন শুম বলেছেন, “নিউক্লিয়ার ঘড়ি তৈরি করাটা গত প্রায় ৫০ বছর ধরে পদার্থবিদদের একটা বড় স্বপ্ন ছিল। আমার দল ২০০৮ সাল থেকেই এই লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে।”

শুম বলেছেন, স্যাটেলাইটভিত্তিক ন্যাভিগেশন, ডেটা ট্রান্সফার সিংক্রোনাইজেশন, সার্ভেয়িং ও মেট্রোলজি বা পরিমাপবিদ্যার মতো ক্ষেত্রগুলোতে নিউক্লিয়ার ঘড়ির ব্যাপক ব্যবহার তিনি দেখতে পাচ্ছেন।

প্রচলিত পারমাণবিক ঘড়িগুলো সিজিয়াম বা স্ট্রনশিয়ামের মতো উপাদান ব্যবহার করে লেজার বা মাইক্রোওয়েভের সাহায্যে পরমাণুর খোলসে থাকা বিভিন্ন ইলেকট্রনকে এক শক্তিস্তর থেকে অন্য শক্তিস্তরে লাফাতে বাধ্য করে সময় পরিমাপ করে।

অন্যদিকে, নতুন নিউক্লিয়ার ঘড়িগুলো লেজার ব্যবহার করে পরমাণুর নিউক্লিয়াসের ভেতরে থাকা প্রোটন ও নিউট্রনকে (এই ক্ষেত্রে থোরিয়াম-২২৯) শক্তিস্তরের মধ্যে চলাচল করানোর মাধ্যমে সময় মাপে।

ইলেকট্রন যেখানে থাকে পরমাণুর সেই বাইরের খোলসের চেয়ে এর নিউক্লিয়াস অনেক ছোট হওয়ায়, পরমাণুর নিউক্লিয়াসের ভেতরের এসব পরিবর্তন ট্র্যাক করা গেলে আরও বেশি নিখুঁত সময় মাপা সম্ভব হবে।

প্রযুক্তির ‘পূর্ণতা’ আনার চেষ্টা

গবেষক শুম বলেছেন, নিউক্লিয়ার ক্লক এখনও এর কাঙ্ক্ষিত কার্যসক্ষমতা থেকে ‘অনেক দূরে’ রয়েছে এবং গবেষকরা এই প্রযুক্তির পূর্ণতা দেওয়ার জন্য কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।

“এখানে দারুণ বিষয় হচ্ছে, ভিয়েনা ঘড়ির থোরিয়াম স্ফটিকগুলো কিছুটা ভালো মানের, যাতে উচ্চ ঘনত্ব ও উন্নত অপটিক্যাল বৈশিষ্ট্য রয়েছে। অন্যদিকে, বেইজিং দলের কাছে রয়েছে শক্তিশালী লেজার। এসব উপাদান একত্র করলেই আমরা আরও উন্নত একটি ঘড়ি তৈরি করতে পারব।”

বর্তমানে সেরা প্রচলিত পারমাণবিক ঘড়িগুলো বিলিয়ন বছরে কেবল এক সেকেন্ড ভুল করতে পারে। বৈশ্বিক ন্যাভিগেশন স্যাটেলাইট সিস্টেম এবং ইন্টারনেট, সেলুলার ও ফাইবার-অপটিক যোগাযোগের মতো প্রযুক্তির ক্ষেত্রে এই অতি-নির্ভুলতা গুরুত্বপূর্ণ।

গবেষকরা বলছেন, নিউক্লিয়ার ঘড়িগুলো এক পর্যায়ে আরও নিখুঁতভাবে কাজ করতে পারবে এবং এগুলো কম ওজনের ও কম ভঙ্গুর করে তৈরি করা সম্ভব হবে।

নিউক্লিয়ার ঘড়িগুলো মৌলিক পদার্থবিদ্যা নিয়ে গবেষণার নতুন দুয়ার খুলে দিতে পারে।

ভিয়েনা দল তাদের ঘড়ি দিয়ে একটি নিখুঁত পদার্থবিদ্যা পরীক্ষা চালিয়ে দেখতে চেয়েছিল যে, ডার্ক ম্যাটারের উপস্থিতি ধরা যায় কি না, যা এখন পর্যন্ত মানুষের চোখের আড়ালে রয়েছে।

তবে সেই পরীক্ষায় ডার্ক ম্যাটারের সন্ধান না মিললেও নিউক্লিয়ার ঘড়িটি সেরা পারমাণবিক ঘড়িগুলোর সমান সক্ষমতা দেখিয়েছে বলে দাবি গবেষক দলটির।

গবেষক শুম বলেছেন, “এটা পদার্থবিদ্যার সম্পূর্ণ নতুন এক জগতের দুয়ার খুলে দিয়েছে।”