উষ্ণ প্রস্রবণের এই অ্যামিবা গড়ল তাপ সহনশীলতার নতুন রেকর্ড
অ্যামিবা গোত্রের নতুন প্রজাতিটি এমন চরম তাপমাত্রায় বেঁচে থাকতে ও বংশবৃদ্ধি করে, যা অন্য যে কোনো পরিচিত জটিল প্রাণকে নিমেষেই ধ্বংস করে দিতে পারে।
ক্যালিফোর্নিয়ার ক্যাসকেড পর্বতমালায় অবস্থিত লাসেন ভলকানিক ন্যাশনাল পার্কের হট স্প্রিংস বা প্রাকৃতিক উষ্ণ জলধারা থেকে পৃথিবীর অন্যতম চরম পরিবেশ সহনশীল এক নতুন অণুজীব আবিষ্কার করেছেন বিজ্ঞানীরা।
ভূপৃষ্ঠের অনেক গভীরে থাকা গলিত শিলার প্রভাবে তৈরি হওয়া এসব উষ্ণ প্রস্রবণ, যার একটির ভেতর এ বিস্ময়কর অণুজীবের সন্ধান মিলল বলে প্রতিবেদনে লিখেছে রয়টার্স।
অ্যামিবা গোত্রের নতুন প্রজাতিটি এমন চরম তাপমাত্রায় বেঁচে থাকে ও বংশবৃদ্ধি করে, যা অন্য যে কোনো পরিচিত জটিল প্রাণকে নিমেষেই ধ্বংস করে দিতে পারে।
নির্দিষ্ট আকৃতি ছাড়াই স্বাধীনভাবে রূপ বদলানোর সক্ষমতার জন্য পরিচিত এ এককোষী জীবটির নাম ‘ইনসেন্টিয়ামোইবা ক্যাসকাডেনসিস’।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, প্রজাতিটির বৈজ্ঞানিক নামকরণে এর তাপ সহনশীলতার বিষয়টি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, যার মানে ‘ক্যাসকেডের আগুনের অ্যামিবা’।
গবেষণায় দেখা গেছে, অ্যামিবাটি ১৪৫.৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা ৬৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপমাত্রায় কোষ বিভাজন বা মাইটোসিস সম্পন্ন করতে পারে।
এই অ্যামিবা ১৪৭.২ ফারেনহাইট বা ৬৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত সক্রিয় থেকে খাবার সংগ্রহ ও নিজের পরিবেশ ঘুরে দেখতেও পারে। ১৫৮ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপমাত্রার মুখে পড়ার পরও স্বাভাবিক তাপমাত্রায় ফিরিয়ে আনলে অ্যামিবাটি পুরোপুরি পুনরুজ্জীবিত হয়।
পৃথিবীর সব প্রাণী জগৎ, উদ্ভিদ, ছত্রাক ও অ্যামিবাসহ প্রোটিস্ট অণুজীবকে অন্তর্ভুক্তকারী বড় পরিসরের শ্রেণি ‘ইউক্যারিওটস’-এর ইতিহাসে তাপ সহনশীলতায় এটা নতুন রেকর্ড।
ব্যাকটেরিয়া বা জীবের বিপরীতে ইউক্যারিওটদের কোষে ঝিল্লি-ঘেরা নিউক্লিয়াস ও অন্যান্য উপ-কোষীয় গঠন থাকে বলে এদের জটিল প্রাণের মর্যাদা দেওয়া হয়।
মঙ্গলবার গবেষণাটি প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘সেল’-এ।
এ গবেষণার প্রধান লেখক ও নিউ ইয়র্কের ‘সিরাকুস ইউনিভার্সিটি’র জীববিজ্ঞানী বেরিল র্যাপাপোর্ট বলেছেন, “এ তাপমাত্রা ইউক্যারিওট বা জটিল প্রাণের ক্ষেত্রে এর আগে যা অসম্ভব বলে মনে করা হত, তা ছাড়িয়ে গেছে ও জটিল প্রাণের টিকে থাকার সীমা কতদূর সে বিষয়ে নতুন করে প্রশ্নও তুলেছে।”
গঠনগত নমনীয়তা, টিকে থাকার নানাবিধ কৌশল ও বিবর্তনীয় অভিযোজন সক্ষমতার কারণে অ্যামিবা সফল একটি অণুজীব।
সিউডোপড বা ‘মিথ্যা পা’ প্রসারিত করে অনবরত আকৃতি পরিবর্তনের মাধ্যমে চলাফেরা করতে পারে এরা। শত কোটি বছর ধরে পৃথিবীর নানা প্রতিকূল ও বৈচিত্র্যময় পরিবেশে নিজেদের অস্তিত্ব ধরে রেখে চলেছে এককোষী এসব জীব।
এর আগে ‘সায়ানিডিওশিজন মেরোলাই’ নামের কিছু প্রজাতি লাল শৈবাল ও ‘থার্মোমাইসেস ল্যানুজিনোসাস’-এর মতো কিছু ছত্রাক প্রায় ১৪০ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা ৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা সহ্য করে ইউক্যারিওট বা জটিল প্রাণের মধ্যে সর্বোচ্চ তাপ সহনশীলতার রেকর্ড ধরে রেখেছিল।
ব্যাকটেরিয়া, আর্কিয়া বা ভাইরাসের মতো কিছু অনুজীব ইউক্যারিওটের অন্তর্ভুক্ত নয়। কারণ এদের সুনির্দিষ্ট কোনো নিউক্লিয়াস বা ছোট জিনোম থাকে না।
এর মধ্যে ‘মেথানোপাইরাস ক্যান্ডলারি’ নামের এক আর্কিয়া প্রজাতি গভীর সমুদ্রের হাইড্রোথার্মাল ভেন্টের প্রায় ২৫২ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা ১২২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপমাত্রা সহ্য করে পৃথিবীতে সমস্ত প্রাণের মধ্যে সর্বোচ্চ তাপ সহনশীলতার রেকর্ড ধরে রেখেছে, যা ফুটন্ত পানির চেয়েও গরম।
একটি অণুবীক্ষণিক শিকারী
‘সিরাকুস ইউনিভার্সিটির’ জীববিজ্ঞানী ও এ গবেষণার জ্যেষ্ঠ লেখক অ্যাঞ্জেলা অলিভেরিও বলেছেন, লাসেনের ড্রেকসব্যাড এলাকার কাছাকাছি উষ্ণ ঝরনা ‘হট স্প্রিংস ক্রিক’-এর একটি উপনদী থেকে ‘ইনসেন্টিয়ামোইবা’ প্রজাতিটি আবিষ্কার করেছেন তারা।
লাসেনের হাতে গোনা যে কয়েকটি নিরপেক্ষ বা পিএইচ-নিউট্রাল বা অ্যাসিডিক বা ক্ষারীয় নয় এমন জিওথার্মাল বা ভূ-তাপীয় স্থান রয়েছে এটা তার মধ্যে একটি এবং এই পরিবেশেই স্বাচ্ছন্দ্যে বেড়ে উঠেছে প্রজাতিটি।
অনেক তাপমাত্রা সহ্য করার এই সক্ষমতা ইনসেন্টিয়ামোইবার জন্য বড় আশীর্বাদ। উষ্ণ প্রস্রবণের এই পরিবেশে তাপসহিষ্ণু ব্যাকটেরিয়া খেয়ে বেঁচে থাকা জীবটি এখানকার সর্বোচ্চ শিকারী বা শীর্ষ প্রিডেটর।
গবেষক র্যাপাপোর্ট বলেছেন, “ইনসেন্টিয়ামোইবা ক্যাসকাডেনসিসের এত বেশি তাপমাত্রা সহ্য করার সক্ষমতার একটি সম্ভাব্য সুবিধা হল, এ পরিবেশে নিজেদের জাতের আর কোনো জীব না থাকায় এরা খাবার বা অন্যান্য সম্পদের জন্য অন্য কোনো প্রজাতির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পড়ে না।
এ ছাড়া, এ তাপমাত্রায় অ্যামিবা শিকার করে এমন কোনো অণুবীক্ষণিক প্রাণী না থাকায় এটা শত্রুর আক্রমণ বা শিকার হওয়া থেকেও বেঁচে থাকে।”
অতিরিক্ত তাপমাত্রায় কীভাবে অ্যামিবাটি নিজের আকৃতি পরিবর্তন করে প্রতিরক্ষামূলক বাইরের আবরণ তৈরি করে নিজেদের রক্ষা করে তা নথিভুক্ত করেছেন গবেষকরা।
পাশাপাশি, এ পরিস্থিতিতে ডিএনএ মেরামত ও কোষের অভ্যন্তরীণ পরিবহন ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত জিনগুলোর কার্যকারিতাও বৃদ্ধি পেতে দেখেছেন তারা।
পৃথিবীর জীবকুলের এই অসাধারণ স্থিতিস্থাপকতা বিজ্ঞানীদের ভাবিয়ে তুলেছে।
অ্যাঞ্জেলা অলিভেরিও বলেছেন, “আমার মনে হয়, এ গবেষণার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় এটা ইউক্যারিওটিক প্রাণের টিকে থাকার সক্ষমতা ও অবস্থান সম্পর্কে আমাদের ধারণাকে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
“জটিল কোষের মৌলিক সীমাবদ্ধতা ও সেগুলোর বিবর্তন কেমন হতে পারে বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞানের এসব বিষয় অনুধাবনে এর গভীর প্রভাব রয়েছে। একইসঙ্গে পৃথিবী ও মহাবিশ্বের অন্যান্য স্থানে প্রাণের সন্ধান পাওয়ার পরিসরকে আরও বাড়িয়েছে এই অ্যামিবা।
“প্রতিকূল ও বাস অযোগ্য পরিবেশেও জীবন কত শত উপায়ে টিকে থাকতে পারে সে সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান যখনই প্রসারিত হয় তখনই তা আমার কাছে বিস্ময়কর রকম আশাব্যঞ্জক বলে মনে হয়।”
