Published : 08 Aug 2026, 04:55 PM
বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান কোম্পানি হওয়ার দৌড়ে অ্যাপল ও এনভিডিয়া একে অন্যকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে। তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দৌড়ে দুই কোম্পানি বেছে নিয়েছে একেবারে ভিন্ন পথ।
কারণটা কী?
ওয়াল স্ট্রিটে এ নিয়ে আলোচনা চলছে, কারণ কখনও অ্যাপল, কখনও এনভিডিয়া বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান কোম্পানির জায়গা দখল করছে। চলতি সপ্তাহের শুরুতে অ্যাপল সেই অবস্থান ফিরে পেলেও বৃহস্পতিবার প্রকাশিত আয়ের প্রতিবেদনের পর কয়েক দিনের মধ্যেই আবার এনভিডিয়ার কাছে জায়গাটি হারায়। এমনটাই উঠে এসেছে সিএনএন-এর এক প্রতিবেদনে।
অ্যাপল এমন ফোন ও কম্পিউটার তৈরি করে, যেগুলো দিয়ে কোটি কোটি মানুষ এআই চ্যাটবট ও এজেন্ট ব্যবহার করেন। তবে এআইয়ে পিছিয়ে পড়ার অভিযোগও রয়েছে কোম্পানিটির বিরুদ্ধে। একইসঙ্গে নতুন এই প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশের তুলনায় অ্যাপলের মূল ব্যবসায় প্রবৃদ্ধির সুযোগ কমে আসতে পারে। এর বাইরে যন্ত্রাংশের ঘাটতিও প্রযুক্তি খাতে চাপ তৈরি করছে।
অন্যদিকে এনভিডিয়া এআই চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় চিপ ও সফটওয়্যার নির্মাতাদের সরঞ্জাম তৈরি করে। ফলে প্রযুক্তিটির ভবিষ্যতের সঙ্গে কোম্পানিটির সম্পর্ক যেমন গভীর, তেমনি এআই খাতের অনিশ্চয়তার ঝুঁকিও তার ওপর বেশি।
র্যাশনাল একুইটি আর্মর ফান্ডের পোর্টফোলিও ব্যবস্থাপক জো টাইগ বলেন, “আমরা যখন এআই তৈরি করার পর্যায়ে থাকি, তখনই এনভিডিয়ার দিকে নজর রাখবেন। ভবিষ্যতে আমরা এমন কোম্পানির দিকে তাকাব, যারা এআই ব্যবহারের মাধ্যমে আয় করবে। আর অ্যাপল অবশ্যই এমন কোম্পানি হতে চায়।”
আইফোনের সুবিধা
বিগ টেকের অনেক প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানির মতো অ্যাপল নতুন ডেটা সেন্টার তৈরিতে শত শত কোটি ডলার ঢালছে না। বরং আইফোন বিক্রিই কোম্পানিটির আয়ের বড় উৎস। বিনিয়োগকারীদের কাছে এমন ধারাবাহিক ও অনুমানযোগ্য ব্যবসার আকর্ষণও বেশি।
সর্বশেষ প্রান্তিকে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় অ্যাপলের আইফোন বিক্রি থেকে আয় বেড়েছে ২২ শতাংশ। একই সময়ে কোম্পানিটির মোট আয় বেড়েছে ১৬ শতাংশ, যা ওয়াল স্ট্রিটের প্রত্যাশাকেও ছাড়িয়ে গেছে।
তবে এআইয়ের যুগে অ্যাপল তার জনপ্রিয় পণ্যগুলো কীভাবে বদলাবে এবং নতুন পণ্য তৈরি করবে কি না, তা নিয়ে বিশ্লেষকদের প্রশ্ন রয়েছে। সিরি এআই সহকারী নিয়ে কোম্পানিটি নানা বাধার মুখে পড়েছে। এই সুবিধাটি চলতি শরতেই চালু হওয়ার কথা।
তবে আপাতত আইফোনের সাফল্য এসব উদ্বেগের কিছুটা কমিয়েছে। বিশেষ করে গুগলের মতো অন্য কোম্পানির সঙ্গে অংশীদার হয়ে তাদের এআই মডেল ব্যবহারের সুযোগ অ্যাপলের সামনে রয়েছে।
ব্লুমবার্গ ইন্টেলিজেন্সের বিশ্লেষক অনুরাগ রানা বলেন, “অ্যাপল এত ভালো করেছে কারণ মানুষ শেষ পর্যন্ত বুঝতে পারছে, এই বাজারে প্রাসঙ্গিক থাকতে তাদের শত শত কোটি ডলার খরচ করার প্রয়োজন নেই। কারণ তারা বাজারে থাকা সবচেয়ে ভালো এআই মডেলটি ব্যবহার করবে, আর সেই মডেল নির্মাতা আইফোনে থাকার সুযোগ পেলে সেটিই তার জন্য বিশেষ সুবিধার হবে।”
তবে এআইয়ের প্রভাব অন্য দিক থেকেও অ্যাপলের ওপর পড়ছে। এআই ডেটা সেন্টার তৈরির কারণে মেমোরি চিপের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এরই মধ্যে ম্যাক কম্পিউটার, আইপ্যাডসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়িয়েছে অ্যাপল। কিছু বিশ্লেষক মনে করছেন, এরপর সম্ভবত আইফোনের দামও বাড়বে।
সম্প্রতি আইফোন, আইপ্যাড, অ্যাপল ওয়াচ ও ম্যাক কেনার বদলে কিস্তিতে ব্যবহারের জন্য গ্রাহকদের একটি লিজিং সুবিধাও চালু করেছে কোম্পানিটি। এতে এসব ডিভাইস গ্রাহকদের কাছে তুলনামূলক সাশ্রয়ী মনে হতে পারে।
অ্যাপল বলছে, সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে মেমোরির খরচ আরও বাড়বে বলে তারা ধারণা করছে। বৃহস্পতিবার আয়ের প্রতিবেদন প্রকাশের পর বাজার বন্ধ হওয়ার পর কোম্পানিটির শেয়ারের দাম ৬ শতাংশের বেশি কমে যায়।
কোম্পানিটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা টিম কুক তার শেষ আর্নিং কলে বলেন, “আমরা অনিচ্ছা সত্ত্বেও দাম বাড়িয়েছি, আমি এটাই বলব। কারণ মেমোরির দামের ক্ষেত্রে আমরা এমন পরিস্থিতির মধ্যে আছি, যাকে আমি শত বছরের বন্যা হিসেবে বর্ণনা করব, যেখানে মেমোরির দাম দ্রুতগতিতে বাড়ছে।”
এআই বুমের প্রতীক এনভিডিয়া
এআই ডেটা সেন্টারের জন্য এনভিডিয়ার চিপ অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। এর ফলে কোম্পানিটির ব্যবসা দ্রুত বড় হয়েছে।
মে মাসে প্রকাশিত সর্বশেষ আয়ের প্রতিবেদনে রেকর্ড আয় জানিয়েছে এনভিডিয়া। আগের প্রান্তিকের তুলনায় আয় বেড়েছে ২০ শতাংশ এবং আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় বেড়েছে ৮৫ শতাংশ।
চলতি বছরের শুরুতে আন্তর্জাতিক ডেটা করপোরেশন সিএনএনকে বলেছিল, ডেটা সেন্টারের চিপ থেকে আয়ের বাজারে এনভিডিয়ার অংশ ৮১ শতাংশ।
তবে এই সাফল্যের কারণে এখন বিনিয়োগকারী ও বিশ্লেষকদের প্রত্যাশাও অনেক বেড়ে গেছে। প্রায় প্রতি প্রান্তিকেই বড় ধরনের প্রবৃদ্ধি দেখাতে হবে এনভিডিয়াকে। দীর্ঘমেয়াদে সেই প্রত্যাশা পূরণ করতে পারবে কি না, তা অনেকটাই নির্ভর করছে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো ডেটা সেন্টারে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ চালিয়ে যাবে কি না, তার ওপর।
এআই কোম্পানিগুলো নিজেদের মধ্যে বিভিন্ন অর্থায়ন চুক্তির মাধ্যমে একে অন্যকে এগিয়ে দিচ্ছে কি না, তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। এই আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে এনভিডিয়া। কোম্পানিটি ওপেনএআই ও অ্যানথ্রপিকের মতো কোম্পানিতে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। আবার ওই কোম্পানিগুলোও এনভিডিয়ার চিপ কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
এআই বুমের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী হয়ে উঠেছে এনভিডিয়া তার চিপ বিক্রির মাধ্যমে। তবে এআই সেবা ব্যবহারের জন্য মানুষের এখনও স্মার্টফোন বা ল্যাপটপ প্রয়োজন, যে ধরনের পণ্য তৈরি করে অ্যাপল।
র্যাশনাল একুইটি আর্মর ফান্ডের টাইগ বলেন, “এনভিডিয়া এআই নামের গাড়ির ইঞ্জিনের হর্স পাওয়ার বিক্রি করছে। অ্যাপল বিক্রি করছে স্টিয়ারিং হুইল।”