১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

জলবায়ুতে বেশি প্রভাব ফেলে অর্গানিক পদ্ধতিতে উৎপাদিত ডিম?

জৈব মুক্তচারণ পদ্ধতি পানি দূষণের ঝুঁকি, মাটির অম্লতা বৃদ্ধি এবং জমির ব্যবহার, এই তিন ক্ষেত্রেই সবচেয়ে খারাপ ফল দেখিয়েছে। একই সঙ্গে এই পদ্ধতিতে মুরগির মৃত্যুহারও সবচেয়ে বেশি ছিল।

জলবায়ুতে বেশি প্রভাব ফেলে অর্গানিক পদ্ধতিতে উৎপাদিত ডিম?
বিশ্বজুড়ে খাঁচায় পালন করা প্রাণীদের মধ্যে ডিমপাড়া মুরগিই সবচেয়ে বড় দল। ছবি: ম্যাগনিফিক

প্রযুক্তি ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 29 Jul 2026, 02:41 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:45 PM

জৈব বা মুক্তচারণ পদ্ধতিতে উৎপাদিত মুরগির ডিমকে অনেকেই পরিবেশবান্ধব বলে মনে করেন। তবে নতুন এক গবেষণা বলছে, জলবায়ুর ওপর প্রভাবের হিসাবে এই ধারণা সব ক্ষেত্রে মিলছে না। গবেষকদের হিসাবে, খাঁচায় পালন করা মুরগির ডিমের তুলনায় জৈব মুক্তচারণ পদ্ধতির ডিম উৎপাদনে গ্রিনহাউস গ্যাসের নির্গমন উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি হতে পারে।

যুক্তরাজ্যের সব ডিম যদি জৈব মুক্তচারণ পদ্ধতিতে উৎপাদন করা হয়, তাহলে গ্রিনহাউস গ্যাসের নির্গমন দাঁড়াতে পারে কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্যাসের হিসাবে প্রায় ২৩ লাখ ১৬ হাজার টন। বিপরীতে পুরো উৎপাদন যদি খাঁচাভিত্তিক ব্যবস্থায় হয়, তাহলে নির্গমন হবে প্রায় ১১ লাখ ৮৪ হাজার টন হতে পারে বলে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ানে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

গবেষকদের মতে, একই সংখ্যক ডিম উৎপাদনের জন্য জৈব মুক্তচারণ পদ্ধতিতে বেশি সংখ্যক মুরগির প্রয়োজন হয়। কারণ খাঁচায় পালন করা মুরগি তুলনামূলকভাবে বেশি ডিম উৎপাদন করে। এ কারণে মুক্তচারণ পদ্ধতিতে মোট পরিবেশগত প্রভাবও বেড়ে যায়।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, জৈব মুক্তচারণ পদ্ধতি পানি দূষণের ঝুঁকি, মাটির অম্লতা বৃদ্ধি এবং জমির ব্যবহার, এই তিন ক্ষেত্রেই সবচেয়ে খারাপ ফল দেখিয়েছে। একই সঙ্গে এই পদ্ধতিতে মুরগির মৃত্যুহারও সবচেয়ে বেশি ছিল।

তবে, গবেষকরা নিজেরাই গবেষণার একটি সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করেছেন। এতে ব্যবহৃত তথ্য ২০০৯ থেকে ১০ সালের। ফলে সাম্প্রতিক সময়ে ডিম উৎপাদন ব্যবস্থায় যে পরিবর্তন এসেছে, তা এতে প্রতিফলিত হয়নি। এ ছাড়া কীটনাশকের ব্যবহার বা জীববৈচিত্র্যের মতো অন্যান্য পরিবেশগত প্রভাবও এই গবেষণায় বিবেচনায় আনা হয়নি।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের স্মিথ স্কুল অফ এন্টারপ্রাইজ অ্যান্ড দ্য এনভায়রনমেন্টের জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহযোগী এবং গবেষণার অন্যতম লেখক ডক্টর হ্যারিয়েট বার্টলেট বলেন, বিশ্বজুড়ে খাঁচায় পালন করা প্রাণীদের মধ্যে ডিমপাড়া মুরগিই সবচেয়ে বড় দল। একই সঙ্গে বিশ্বব্যাপী ডিমের ব্যবহারও বাড়ছে। তাই তাদের কল্যাণের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি বলেন, “আমার মনে হয় টেকসই উন্নয়ন নিয়ে আলোচনায় এটি কিছুটা উপেক্ষিত একটি বিষয়। মাংস ও দুগ্ধ খাতের পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে বেশি আলোচনা হয়, কিন্তু ডিম উৎপাদন নিয়ে তুলনামূলকভাবে কম গবেষণা হয়েছে।”

রয়াল সোসাইটি ওপেন সায়েন্স সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণাটিতে যুক্তরাজ্যের পোলট্রি খামারের তথ্য বিশ্লেষণ করে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন, জমির ব্যবহার এবং বিভিন্ন ধরনের দূষণের প্রভাব হিসাব করা হয়েছে। পাশাপাশি মুরগির মৃত্যুহার এবং নির্দিষ্ট সংখ্যক ডিম উৎপাদনে কতটি মুরগি প্রয়োজন, সে মূল্যায়নও ছিল।

বার্টলেট বলেন, “এরপর আমরা পরিবেশগত এবং প্রাণী কল্যাণসংক্রান্ত ফলাফল নির্ণয়ের জন্য মডেলিং করেছি।”

গবেষণার ফল নিয়ে তিনি আরও বলেন, “আমরা একটি গুরুত্বপূর্ণ আপসের বিষয়ও খুঁজে পেয়েছি। প্রাণী কল্যাণের দিক থেকে যেসব খামারকে সাধারণভাবে ভালো ধরা হয়, যেমন জৈব ও মুক্তচারণ ব্যবস্থা, সেখানে একই পরিমাণ ডিম উৎপাদনের জন্য বেশি মুরগি লাগে। কারণ এসব পদ্ধতি তুলনামূলকভাবে কম দক্ষ এবং পরিবেশগত প্রভাবও বেশি হতে পারে।”

তবে তিনি এটিও বলেছেন যে, এই গবেষণা শিল্পভিত্তিক খামার ব্যবস্থার পুরো চিত্র তুলে ধরে না। তার ভাষায়, “কীটনাশকের বিষক্রিয়া কিংবা খামারের জীববৈচিত্র্যের মতো বিষয়ে জৈব পদ্ধতি আরও ভালো ফল দেখাতে পারে।”

যুক্তরাজ্যের সয়েল অ্যাসোসিয়েশন সার্টিফিকেশনের নিয়ন্ত্রক ও বাণিজ্যবিষয়ক প্রধান লি হোল্ডস্টক বলেন, এই গবেষণা “কিছু গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতার বিষয় সামনে এনেছে”, তবে এটি পরিবেশগত প্রভাবের “অসম্পূর্ণ চিত্র” তুলে ধরে।

তার ভাষায়, “নিবিড় খামার ব্যবস্থায় প্রতি একক উৎপাদনে নির্গমন কম হতে পারে, কারণ সেখানে মুরগির খাদ্য আরও দক্ষভাবে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু এটি পুরো চিত্রের একটি অংশ মাত্র। সত্যিকারের টেকসই খাদ্যব্যবস্থা বিবেচনা করতে হলে প্রকৃতি, মাটির স্বাস্থ্য, পানির গুণগত মান, কৃত্রিম উপকরণের ব্যবহার এবং প্রাণী কল্যাণকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।”

লি হোল্ডস্টক এই গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না।

গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে যুক্তরাজ্যে খাঁচাভিত্তিক, বার্ন, অজৈব মুক্তচারণ এবং জৈব মুক্তচারণ, এই চার ধরনের উৎপাদন ব্যবস্থার সমন্বয়ে ডিম উৎপাদন থেকে মোট কার্বন ডাই-অক্সাইড সমতুল্য প্রায় ১৪ লাখ ৩৯ হাজার টন গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গত হয়।