১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

এতো প্রযুক্তিবান্ধব, তারপরও ঘন ঘন কেন চাকরি হারাচ্ছে জেন জি?

৩৯ শতাংশ নিয়োগদাতা যোগাযোগ দক্ষতার দুর্বলতার কথা বলেছেন। ৩৮ শতাংশের মতে, অনেক তরুণ কর্মী গঠনমূলক মতামত গ্রহণ করতে পারেন না। ৩৪ শতাংশ বলেছেন, সমস্যা সমাধানের সক্ষমতাও প্রত্যাশার তুলনায় কম।

এতো প্রযুক্তিবান্ধব, তারপরও ঘন ঘন কেন চাকরি হারাচ্ছে জেন জি?
জেন জি কর্মীরা অনেক উচ্চ প্রত্যাশা নিয়ে কর্মক্ষেত্রে আসছেন, তবে কর্মক্ষেত্রের বাস্তবতা সম্পর্কে প্রকৃত ধারণা না নিয়েই। ছবি: ম্যাগনিফিক, এআই ব্যবহার করে তৈরি

প্রযুক্তি ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 24 Jun 2026, 09:30 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:27 PM

অফিসে নতুন একজন কর্মী যোগ দিলেন। প্রযুক্তিতে দক্ষ, আত্মবিশ্বাসী, নতুন নতুন ধারণায় ভরপুর। কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যেই চাকরি চলে গেল তার। এমন ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়, বরং অনেক প্রতিষ্ঠানে এখন এটি নতুন এক বাস্তবতা হয়ে উঠছে। 

বিশেষ করে জেন জি প্রজন্মের কর্মীদের নিয়ে নিয়োগদাতাদের অভিজ্ঞতা ক্রমেই আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসছে।

শিক্ষা ও ক্যারিয়ারবিষয়ক পরামর্শ প্ল্যাটফর্ম ইন্টেলিজেন্টের এক জরিপ বলছে, প্রায় প্রতি ছয়জন নিয়োগদাতার একজন জেন জি কর্মী নিয়োগ দিতে দ্বিধায় আছেন। তাদের যুক্তি, এই প্রজন্মের অনেক কর্মী নিজেদের নিয়ে অতিরিক্ত উচ্চ ধারণা রাখেন এবং সহজেই বিরক্ত বা আহত হন বলে উঠে এসেছে এমএসএন-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে।

জেন জি বলতে সাধারণত ১৯৯৭ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে জন্ম নেওয়া প্রজন্মকে বোঝানো হয়। এই প্রজন্ম দ্রুত চাকরির বাজারে প্রবেশ করছে। ফলে তাদের কাজের ধরন, প্রত্যাশা ও মানসিকতা অনেকটাই নির্ধারণ করবে ভবিষ্যতের কর্মক্ষেত্র কেমন হবে।

ইন্টেলিজেন্ট ডটকম যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় এক হাজার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের ওপর জরিপ চালিয়েছে। এতে দেখা গেছে, ২০২৪ সালের স্নাতকদের কিছু সীমাবদ্ধতা বা ঘাটতি নিয়োগদাতাদের ভবিষ্যৎ নিয়োগ কৌশলেও প্রভাব ফেলছে। আর এর ফল ভবিষ্যৎ স্নাতকদের জন্য মোটেও সুখকর নয়।

ইন্টেলিজেন্টের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত জরিপ অনুযায়ী, ৬০ শতাংশ নিয়োগদাতা নতুন নিয়োগ দেওয়া জেন জি কর্মীদের যোগদানের কয়েক মাসের মধ্যেই চাকরি থেকে সরিয়ে দিয়েছেন।

এর পেছনের কারণগুলোও বেশ স্পষ্ট। প্রায় অর্ধেক নিয়োগদাতা বলেছেন, তরুণ কর্মীদের মধ্যে নিজ উদ্যোগে কাজ শুরু করার প্রবণতা কম। ৪৬ শতাংশ বলেছেন, পেশাদার আচরণে ঘাটতি রয়েছে। আবার ২১ শতাংশের মতে, সদ্য বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করা অনেক কর্মী কাজের চাপ সামলাতে পারেন না। প্রায় ২০ শতাংশের অভিযোগ, তারা নিয়মিত দেরিতে কাজে আসেন।

এখানেই শেষ নয়।

বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালেই বৈশ্বিক কর্মশক্তির এক-চতুর্থাংশেরও বেশি হয়ে গেছে জেন জি। ছবি: ম্যাগনিফিক, এআই ব্যবহার করে তৈরি

বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালেই বৈশ্বিক কর্মশক্তির এক-চতুর্থাংশেরও বেশি হয়ে গেছে জেন জি

৩৯ শতাংশ নিয়োগদাতা যোগাযোগ দক্ষতার দুর্বলতার কথা বলেছেন। ৩৮ শতাংশের মতে, অনেক তরুণ কর্মী গঠনমূলক মতামত গ্রহণ করতে পারেন না। ৩৪ শতাংশ বলেছেন, সমস্যা সমাধানের সক্ষমতাও প্রত্যাশার তুলনায় কম।

এর পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রের উপযোগী পোশাক না পরা কিংবা খুব দ্রুত পদোন্নতি পাওয়ার আশার মতো বিষয়ও উঠে এসেছে।

পরিস্থিতি সামাল দিতে ৭৯ শতাংশ নিয়োগদাতা দুর্বল পারফরম্যান্স করা জেন জি কর্মীদের কর্মদক্ষতা উন্নয়নের উদ্যোগ নেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাদের বড় একটি অংশই চাকরি হারান।

অবশ্য এই আলোচনা নতুন নয়।

এপ্রিল মাসে রিজিউমবিল্ডার ডটকমের আরেক জরিপে দেখা যায়, ৭৪ শতাংশ ব্যবস্থাপক ও ব্যবসাপ্রধান মনে করেন, অন্যান্য প্রজন্মের তুলনায় জেন জির সঙ্গে কাজ করা বেশি কঠিন।

অভিযোগের তালিকাও প্রায় একই। অতিরিক্ত প্রত্যাশা, কম পরিশ্রম এবং কম উৎপাদনশীলতা।

একজন নিয়োগ ব্যবস্থাপক বলেন, “আমরা এমন একটি প্রবণতা দেখছি, যেখানে জেন জি কর্মীরা অনেক উচ্চ প্রত্যাশা নিয়ে কর্মক্ষেত্রে আসছেন, তবে কর্মক্ষেত্রের বাস্তবতা সম্পর্কে প্রকৃত ধারণা না নিয়েই।”

এমন পরিস্থিতিতে কিছু প্রতিষ্ঠান নতুন স্নাতকদের নিয়োগ দেওয়া আদৌ লাভজনক হবে কি না, সেটিও নতুন করে ভাবতে শুরু করেছে।

কেউ কেউ আগামী নিয়োগ পর্বে নতুন স্নাতকদের পুরোপুরি এড়িয়ে যাওয়ার পরিকল্পনাও করছে।

তবে গল্পের আরেকটি দিকও আছে।

গ্লাসডোরের এক বিশ্লেষণ বলছে, চলতি বছর পূর্ণকালীন কর্মশক্তিতে জেন জি প্রজন্মের সংখ্যা বেবি বুমারদের ছাড়িয়ে যাওয়ার কথা ছিল।

অন্যদিকে, বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালেই বৈশ্বিক কর্মশক্তির এক-চতুর্থাংশেরও বেশি হয়ে গেছে জেন জি।

তাহলে প্রশ্ন হলো, এই প্রজন্ম এত আলাদা হল কী করে?

উত্তরটা অনেকটাই প্রযুক্তির মধ্যে লুকিয়ে আছে।

চাকরি হারানো জেন জি কর্মীরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজেদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করছেন। কেউ কেউ দায়ী করছেন অফিসের কর্মপরিবেশকে। ছবি: ম্যাগনিফিক, এআই ব্যবহার করে তৈরি

চাকরি হারানো জেন জি কর্মীরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজেদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করছেন। কেউ কেউ দায়ী করছেন অফিসের কর্মপরিবেশকে

এরা এমন একটি প্রজন্ম, যারা স্মার্টফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে বড় হয়েছে। ফলে প্রযুক্তি ব্যবহারে তারা অনেক বেশি স্বচ্ছন্দ।

শুনতে খুব পজিটিভ মনে হয়। কিন্তু এর একটি উল্টো দিকও রয়েছে।

দ্রুত ফল পাওয়ার অভ্যাস তৈরি হয়েছে তাদের মধ্যে। একই সঙ্গে সামনাসামনি কথোপকথনের বদলে ডিজিটাল যোগাযোগে স্বস্তি বেশি অনুভব করেন অনেকে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অনেকেই এখনও আর্থিকভাবে পরিবারের ওপর নির্ভরশীল।

ব্যাংকরেটের এক জরিপ বলছে, প্রায় ৭০ শতাংশ অভিভাবক প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পরও জেন জি সন্তানদের আর্থিক সহায়তা দিচ্ছেন। সেটা করতে গিয়ে তারা অনেকেই নিজেদের সঞ্চয় ভাঙছেন, এমনকি অবসরও নিচ্ছেন দেরিতে।

এই সহায়তা তরুণদের জন্য স্বস্তি তৈরি করলেও এর একটি নেতিবাচক দিক আছে। অনেকের মধ্যে নিজের পায়ে দাঁড়ানো বা দায়িত্ব নেওয়ার মানসিকতা গড়ে উঠতে দেরি হচ্ছে।

গঠনমূলক সমালোচনা গ্রহণ করতে না পারাও একটি বড় সমস্যা হিসেবে উঠে এসেছে।

অনেক ব্যবস্থাপক বলেছেন, তরুণ কর্মীরা মতামতকে উন্নতির সুযোগ হিসেবে না দেখে ব্যক্তিগত আক্রমণ হিসেবে বিবেচনা করেন।

ফলে দায়িত্বশীলতার সংস্কৃতি দুর্বল হয়ে পড়ে।

এই বাস্তবতা এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও দেখা যাচ্ছে।

বিশেষ করে চাকরি হারানো জেন জি কর্মীরা টিকটকে নিজেদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করছেন। কেউ অফিসের কর্মপরিবেশকে দায়ী করছেন, আবার কেউ স্বীকার করছেন যে চাকরির বাস্তবতার জন্য তারা প্রস্তুত ছিলেন না।

আসলে এখানে দুই ধরনের প্রত্যাশার সংঘাত দেখা যাচ্ছে।

একদিকে জেন জি আরও সহানুভূতিশীল, নমনীয় ও মানবিক কর্মপরিবেশ চান। অন্যদিকে অনেক প্রতিষ্ঠান এখনও প্রচলিত কর্মসংস্কৃতির মানদণ্ড ধরে রাখতে চায়।

জেন জি কর্মীদের প্রভাব এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ আর নেই। তাদের মূল্যবোধ, কাজের ধরন ও নতুন দৃষ্টিভঙ্গি কর্মক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। ছবি: ম্যাগনিফিক, এআই ব্যবহার করে তৈরি

জেন জি কর্মীদের প্রভাব এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ আর নেই। তাদের মূল্যবোধ, কাজের ধরন ও নতুন দৃষ্টিভঙ্গি কর্মক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন আনতে পারে

তবে জেন জিদের সব দাবি উড়িয়ে দেওয়ারও সুযোগ নেই।

মানসিক স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে তারা বড় পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। ক্লান্তি, মানসিক চাপ ও অতিরিক্ত কাজের সংস্কৃতি নিয়ে তারা খোলামেলা কথা বলছে।

নিজেদের যত্ন নেওয়াকে দুর্বলতা নয়, বরং সুস্থ কর্মজীবনের অংশ হিসেবে দেখতে শিখিয়েছে এই প্রজন্ম।

একই সঙ্গে তাদের নিজেদেরও কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে বড় হওয়ায় অনেকেই নিজেকে অন্যদের সঙ্গে তুলনা করেন। অনেকের মধ্যে আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি ও নিজের যোগ্যতা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়।

অফিস শেষে কাজ থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হওয়াও তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। অনেকেই আশঙ্কা করেন, এমনটি করলে চাকরির ক্ষতি হতে পারে।

সব মিলিয়ে উদ্বেগ, মানসিক চাপ ও দ্রুত এগিয়ে যাওয়ার চাপ একসঙ্গে কাজ করে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমাধান জেন জিকে বাদ দেওয়ার মধ্যে নয়, বরং নতুন কৌশল তৈরির মধ্যে রয়েছে।

যোগাযোগ দক্ষতা, সময় ব্যবস্থাপনা ও পেশাদার আচরণ নিয়ে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম কিছু দূরত্ব কমাতে পারে। স্পষ্ট প্রত্যাশা নির্ধারণ এবং নিয়মিত আলোচনা তরুণ কর্মীদের মানিয়ে নিতে সাহায্য করতে পারে।

ইন্টেলিজেন্টের প্রধান শিক্ষা ও ক্যারিয়ার উন্নয়ন উপদেষ্টা হুই নগুয়েনের পরামর্শ হচ্ছে, নতুন কোনো প্রতিষ্ঠানে যোগ দিলে জেন জি স্নাতকদের আগে খেয়াল করা উচিত সহকর্মীরা কীভাবে একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ ও কাজ করেন। এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের কর্মসংস্কৃতি বোঝা সহজ হয় এবং অন্যদের সঙ্গে কীভাবে যোগাযোগ করা উপযুক্ত, সেটিও দ্রুত বুঝে নেওয়া যায়।

পাশাপাশি, জ্যেষ্ঠদের প্রতি তার পরামর্শ হল, “গুরুত্বপূর্ণ ও চিন্তাশীল প্রশ্ন করার উদ্যোগ নিন, নিয়মিত মতামত বা প্রতিক্রিয়া চান এবং সেগুলো কাজে লাগিয়ে ব্যক্তিগত উন্নয়নের প্রতি আপনার আগ্রহ দেখান। 

“ইতিবাচক মনোভাব বজায় রাখা, সময়মতো কাজ শেষ করা এবং নিজের নির্ধারিত দায়িত্বের বাইরের প্রকল্পেও স্বেচ্ছায় যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে নির্ভরযোগ্য একজন কর্মী হিসেবে সুনাম গড়ে তুলুন।”

অবশ্য এর জন্য সময়, অর্থ ও ধৈর্য প্রয়োজন, যা সব প্রতিষ্ঠান দিতে প্রস্তুত নয়।

তবে একটি বিষয় স্পষ্ট।

জেন জি কর্মীদের প্রভাব এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ আর নেই। তাদের মূল্যবোধ, কাজের ধরন ও নতুন দৃষ্টিভঙ্গি কর্মক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।

শর্ত একটাই, দুই পক্ষকেই মাঝামাঝি কোনো জায়গায় পৌঁছাতে হবে।

প্রযুক্তিতে দক্ষতা ও নতুন চিন্তাভাবনা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি জবাবদিহিতা, দায়িত্ববোধ ও কর্মনিষ্ঠাও সমান জরুরি।

আর সম্ভবত ভবিষ্যতের কর্মক্ষেত্রও এই দুইয়ের ভারসাম্যের ওপরই দাঁড়িয়ে থাকবে।