১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

কর্মক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারে কেন পিছিয়ে আছে জাপান?

মার্কিন কর্তাদের মনোভাব প্রায়ই এমন, চেষ্টা করে দেখি, ভুল হলে না হয় ঠিক করে নেব। আর, জাপানি কোম্পানিগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ওপর ভরসা করার আগে আরও প্রমাণ চায়।

কর্মক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারে কেন পিছিয়ে আছে জাপান?
যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় জাপানের কোম্পানিগুলো ভুল, অনিশ্চয়তা ও সুনাম ক্ষতির ঝুঁকির বিষয়ে বেশি সংবেদনশীল। ছবি: রয়টার্স

প্রযুক্তি ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 13 Aug 2026, 05:21 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:50 PM

শ্রমিকের ঘাটতি, বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং দীর্ঘদিনের কম উৎপাদনশীলতার কারণে জাপানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার দ্রুত বাড়ার কথা। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের তুলনায় দেশটির অনেক কর্মক্ষেত্র এই প্রযুক্তির ব্যবহার এখনো ধীর ও সতর্ক।

জাপানের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের পরিস্থিতিকে দেশটির ধীরগতির ঐতিহ্যবাহী নোহ নাটকের সঙ্গে তুলনা করেছে বিবিসি। মঞ্চে থাকা মুখোশ পরা চরিত্রগুলো সবাই জানেন, দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। কিন্তু নাটকের চরিত্রগুলো যেমন স্থির হয়ে থাকেন, জাপানের কোম্পানিগুলোর অবস্থাও অনেকটা তেমন।

কর্মক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহারসংক্রান্ত তথ্যেও পিছিয়ে থাকার চিত্র উঠে এসেছে। গত বছরের শেষ দিকে অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, জাপানে মাত্র ৮ দশমিক ৪ শতাংশ কর্মী চাকরির কাজে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করেন।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে এই হার ৫০ শতাংশ এবং যুক্তরাজ্যে ৩২ শতাংশ। এশিয়ায় সবচেয়ে বেশি ব্যবহারের দেশগুলোর একটি সিঙ্গাপুরে ৫৬ শতাংশ কর্মী সপ্তাহে একাধিকবার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করেন বলে বিভিন্ন পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে।

ঝুঁকি নেওয়ায় অনীহা

জাপানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার ধীর হওয়ার কারণ হিসেবে দেশটির কোম্পানিগুলোর রক্ষণশীলতা ও ঝুঁকি এড়িয়ে চলার প্রবণতাকে দেখছেন মার্কিন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কোম্পানি কিউজ এআইয়ের সহপ্রতিষ্ঠাতা অস্টিন শু। কোম্পানিটি সম্প্রতি জাপানে কার্যালয় খুলে দেশটির বিভিন্ন কোম্পানির কাছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর সমাধান বিক্রি করতে শুরু করেছে।

অস্টিন শু বলেন, “এমন কোম্পানি আছে, যেখানে প্রক্রিয়া ও ঐকমত্যের সংস্কৃতি সত্যিই সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়া ধীর করে দেয়। বিশেষ করে গ্রাহকের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত কাজে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভুলের প্রতি সহনশীলতা প্রায় শূন্য। কেউ কেউ বরং একটি পদ খালি রাখতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবেন, তবু একটি যন্ত্রকে সেই কাজ দেবেন না।”

যুক্তরাষ্ট্রের পরিস্থিতি ভিন্ন বলেও মনে করেন তিনি। তার ভাষায়, “যুক্তরাষ্ট্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহকর্মীরা সহকারী হিসেবে কাজ শুরু করেন এবং ধীরে ধীরে কাজের প্রক্রিয়ার অংশ হয়ে ওঠেন। মার্কিন কর্তাদের মনোভাব প্রায়ই এমন, চেষ্টা করে দেখি, ভুল হলে না হয় ঠিক করে নেব।”

জাপানি কোম্পানিগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ওপর ভরসা করার আগে আরও প্রমাণ চায় বলেও জানান তিনি।

কিয়োটো ইউনিভার্সিটি অফ অ্যাডভান্সড সায়েন্সের আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধ্যাপক পারিসা হাঘিরিয়ানও মনে করেন, জাপানের অনেক কোম্পানি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে ঝুঁকি নিতে চায় না।

তিনি বলেন, “এটি গ্রহণের চ্যালেঞ্জগুলো জাপানি কোম্পানিগুলোতে যে কোনো পরিবর্তন গ্রহণের চ্যালেঞ্জের মতোই। এ কারণেই বিশেষ করে কর্মক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার এখনো বেশ সীমিত ও সতর্ক।”

যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় জাপানের কোম্পানিগুলো ভুল, অনিশ্চয়তা ও সুনাম ক্ষতির ঝুঁকির বিষয়ে বেশি সংবেদনশীল বলেও মনে করেন তিনি।

হাঘিরিয়ান বলেন, “উৎপাদনশীল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখনো পুরোপুরি নির্ভরযোগ্য নয়। তাই জাপানে এটি মূলত কম ঝুঁকির কাজ, যেমন লেখা, সারসংক্ষেপ তৈরি বা তথ্য সংগ্রহে ব্যবহৃত হচ্ছে। কিন্তু মূল কার্যক্রম, সিদ্ধান্ত গ্রহণ বা সামগ্রিক কাজের প্রক্রিয়া উন্নত করতে এর ব্যবহার অনেক কম।”

স্বাস্থ্য খাতেও ধীরগতি

জাপানের স্বাস্থ্যসেবা খাতেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারে ধীরগতি দেখা যাচ্ছে। দেশটির কিছু হাসপাতাল এখনো রোগীদের রেকর্ড পুরোপুরি ডিজিটাল করতে পারেনি।

জাপানের এক হাসপাতালের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মী বলেন, “কাগজের নথি অবিশ্বাস্য মাত্রায় জমা হচ্ছে। এটা যেন প্রস্তর যুগ।”

সমস্যাটি সম্পর্কে জাপান সরকারও অবগত। দেশটির কোম্পানিগুলোকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারে উৎসাহিত করতে গত বছর পার্লামেন্টে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা উন্নয়ন আইন পাস হয়েছে।

হালকা ধরনের নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার মাধ্যমে কোম্পানিগুলোকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় আরও বিনিয়োগে উৎসাহিত করাই এই উদ্যোগের লক্ষ্য। টোকিওর লক্ষ্য, জাপানকে “কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উন্নয়ন ও ব্যবহারবান্ধব দেশ” হিসেবে গড়ে তোলা।

দেশটির সরকার মনে করে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়লে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো সম্ভব হবে। উন্নত দেশগুলোর জি৭ জোটের মধ্যে জাপানের উৎপাদনশীলতার অবস্থান বর্তমানে সবচেয়ে খারাপ।

জাপানের অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির কোম্পানিগুলোতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার ইতোমধ্যে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। পাঁচ বছর আগে ১১ শতাংশ কোম্পানি এই প্রযুক্তি ব্যবহার করলেও এখন সেই হার ৭৫ শতাংশ।

তবে সমালোচকদের দাবি, এসব কোম্পানির প্রতিটিতে খুব অল্পসংখ্যক কর্মী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করেন। যারা ব্যবহার করেন, তারাও প্রযুক্তিটি খুব সীমিতভাবে কাজে লাগান।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে চাকরি হারানোর ঝুঁকি তৈরি হওয়ার চেয়ে বেকারত্ব কমানোর চাপ জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর বেশি। ছবি: রয়টার্স 

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে চাকরি হারানোর ঝুঁকি তৈরি হওয়ার চেয়ে বেকারত্ব কমানোর চাপ জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর বেশি

দক্ষ কর্মীর ঘাটতি

মেইজি ইউনিভার্সিটির জাপানের সামাজিক ব্যবস্থা ও প্রযুক্তিবিষয়ক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ইয়াসুশি ওগাসাওয়ারার মতে, দেশটির কর্মক্ষেত্রে প্রযুক্তি সম্পর্কে দক্ষ মানুষের ঘাটতি রয়েছে।

তিনি বলেন, “জাপানিরা স্মার্টফোনের মতো প্রযুক্তিপণ্য ব্যবহার করতে পছন্দ করে, কিন্তু এখানে ডিজিটাল দক্ষতা কম।”

চলতি বছরের শুরুর একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০৩০ সালের মধ্যে জাপানে প্রায় ৮ লাখ তথ্যপ্রযুক্তি পেশাজীবীর ঘাটতি তৈরি হতে পারে।

অনেক কোম্পানি পুরোনো কম্পিউটার ব্যবস্থার কারণেও সমস্যায় রয়েছে। প্রায় ৬০ শতাংশ কম্পিউটার ২০ বছরের বেশি পুরোনো বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ওগাসাওয়ারা আরও বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে চাকরি হারানোর ঝুঁকি তৈরি হওয়ার চেয়ে বেকারত্ব কমানোর চাপ জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর বেশি।

তিনি বলেন, “সরকার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, পুনরায় দক্ষতা অর্জন ও ডিজিটাল দক্ষতার কথা বলছে। কিন্তু বাস্তবে কর্মীদের ডিজিটাল দক্ষতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া কঠিন, কারণ পূর্ণ কর্মসংস্থান বজায় রাখাই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।”

তবে নতুন কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে কিছু পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। কিছু কোম্পানি এখন নতুন স্নাতকদের নিয়োগের সময় ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিষয়ে দক্ষতা’কে গুরুত্ব দিচ্ছে।

বেসরকারি খাতের বড় কোম্পানি কানেমাৎসুর মতো কোম্পানিগুলো প্রযুক্তিতে দক্ষ নতুন স্নাতকদের নিয়োগ দিচ্ছে। এপ্রিলে কোম্পানিটিতে যোগ দেওয়া উতা ইয়ামাগুচি বলেন, “আমি কর্মক্ষেত্রে প্রায়ই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করি। আমার অনেক সহকর্মীও এটি অনেক ব্যবহার করেন। আমার বসের জন্য ইমেইল লেখা, জটিল নথির সারসংক্ষেপ তৈরি, বৈঠকের রেকর্ড করা এবং সারসংক্ষেপ তৈরির কাজে এটি ব্যবহার করি।”

তবে, যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় জাপানে একাধিক ধাপের কাজ স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পন্ন করতে পারে এমন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবস্থা এখনো প্রায় অচেনা বলে জানান তিনি।

তবে ভবিষ্যৎমুখী হিসেবে পরিচিত তার কোম্পানি এরইমধ্যে এমন ব্যবস্থার ব্যবহার শুরু করেছে।

ওগাসাওয়ারার মতে, “জাপানে পরিবর্তন সীমিত।” তিনি বলেন, “জাপানি সমাজ ব্যথাহীন সংস্কার আশা করে। তাই অন্তত বলা যায়, বড় ধরনের সংস্কার কঠিন।”

জাপানে পরিবর্তন ও ডিসরাপশন শব্দটি হয়তো অস্বস্তিকর। কিন্তু এমন পরিবর্তন ছাড়া দেশটির প্রয়োজনীয় উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি অধরাই থেকে যেতে পারে।