উচ্চশক্তির নিউট্রিনো শনাক্তের পথ দেখিয়ে পদার্থবিদ্যার নোবেল
মহাবিশ্ব থেকে আসা উচ্চশক্তির নিউট্রিনো শনাক্তের পথ দেখানোর পাশাপাশি আইসকিউব নিউট্রিনো অবজারভেটরিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য তাকে এই পুরস্কার দেওয়া হচ্ছে।
দক্ষিণ মেরুর বরফ ব্যবহার করে মহাবিশ্ব থেকে আসা উচ্চশক্তির নিউট্রিনো শনাক্তের পথ দেখিয়েছেন যিনি, সেই ফ্রান্সিস হালসেন পাচ্ছেন চলতি বছরের পদার্থবিদ্যার নোবেল।
মঙ্গলবার সুইডেনের স্টকহোমে এক সংবাদ সম্মেলনে এ পুরস্কারের জন্য বেলজিয়ান এই কণা পদার্থবিজ্ঞানীর নাম ঘোষণা করে রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অফ সায়েন্সেস।
বেলজিয়ামে জন্ম নেওয়া হালসেন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অফ উইসকনসিন-ম্যাডিসনে অধ্যাপনা করেন। নোবেল পুরস্কারের অর্থমূল্য বাবদ এক কোটি বিশ লাখ সুইডিশ ক্রাউন (১২ লাখ মার্কিন ডলারের বেশি) পাবেন তিনি।
নোবেল কমিটি বলছে, মহাবিশ্ব থেকে আসা উচ্চশক্তির নিউট্রিনো শনাক্তের পথ দেখানোর পাশাপাশি আইসকিউব নিউট্রিনো অবজারভেটরিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য তাকে এই পুরস্কার দেওয়া হচ্ছে।
মহাবিশ্ব থেকে আসা নিউট্রিনো নামের রহস্যময় কণাগুলো শনাক্ত করতে দক্ষিণ মেরুর বরফ ব্যবহার করা সম্ভব–এই ধারণা প্রথম দেন হালসেন। তার দূরদৃষ্টি ও বৈজ্ঞানিক নেতৃত্বেই গড়ে ওঠে আইসকিউব নিউট্রিনো অবজারভেটরি। এক ঘনকিলোমিটার বরফের ওই বিশাল স্থাপনায় অসংখ্য আলোকসংবেদী সেন্সর বসানো হয়।
আইসকিউবের সাহায্যে গবেষকরা মহাবিশ্বের দূরবর্তী অঞ্চল থেকে আসা নিউট্রিনো শনাক্ত করতে পারেন।
নিউট্রিনো সর্বত্রই রয়েছে। কিন্তু তাদের উপস্থিতি সহজে বোঝা যায় না। পৃথিবী ও আমাদের শরীর ভেদ করে প্রতিনিয়ত এসব কণা চলে যায়, অথচ আমরা তা টের পাই না।
অত্যন্ত বিরল ক্ষেত্রে একটি নিউট্রিনো কোনো পরমাণুর নিউক্লিয়াসের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করে। উপযুক্ত যন্ত্রপাতি থাকলে সেই মিথস্ক্রিয়া শনাক্ত করা সম্ভব।
বিজ্ঞানীরা অনেক আগে থেকেই জানেন, মহাবিশ্বে কিছু উৎস থেকে নিউট্রিনোর মত কণা বিচ্ছুরিত হয়, যাদের শক্তি পৃথিবীর গবেষণাগারে যত শক্তি তৈরি করা সম্ভব, তারচেয়ে ১০ লাখ গুণ পর্যন্ত বেশি।
তবে এসব শক্তির উৎস সম্পর্কে অনেক কিছুই এখনও অজানা। এগুলো কোথায়? এগুলো আসলে কী? আর এসব উৎসের ভেতরে প্রধান কী ধরনের প্রক্রিয়া কাজ করে, তা জানার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন গবেষকরা।
অন্য ধরনের কণার মত একই পরিবেশে তৈরি হয় উচ্চশক্তির নিউট্রিনো। তবে অন্য কণার মত নিউট্রিনো দিক পরিবর্তন না করে এবং শক্তি না হারিয়ে পৃথিবীতে পৌঁছাতে পারে। ফলে এসব কণা থেকে এমন তথ্য পাওয়া সম্ভব, যা অন্য কোনো উপায়ে পাওয়া সম্ভব নয়।
হালসেন ১৯৮৮ সালে প্রথম দক্ষিণ মেরুতে নিউট্রিনো শনাক্তের পরিকল্পনা উপস্থাপন করেন।
তিনি বলেন, কোনো নিউট্রিনো যখন একটি পরমাণুর নিউক্লিয়াসের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায়, তখন একটি আলোকঝলক তৈরি হয়। স্বচ্ছ হিমবাহের বরফে বসানো সেন্সর দিয়ে সেই আলো শনাক্ত করা সম্ভব। আর এ কাজে দক্ষিণ মেরুর বরফ সবচেয়ে সুবিধাজনক।
হালসেনের পরিকল্পনা দ্রুত অন্য গবেষকদের সমর্থন পায়। কয়েক বছরের মধ্যে বরফের মধ্যে বসানো সেন্সর দিয়ে প্রাথমিক পরীক্ষা শুরু হয়।
মহাজাগতিক উৎস থেকে আসা অত্যন্ত উচ্চশক্তির নিউট্রিনো খুবই বিরল। তাই পর্যাপ্তসংখ্যক নিউট্রিনোর সঙ্গে সংঘর্ষ শনাক্ত করতে বিপুল পরিমাণ বরফ প্রয়োজন। সে কারণে এক ঘনকিলোমিটার আয়তনের আইসকিউব গড়ে তোলা হয়। সেই নির্মাণকাজ শেষ হয় ২০১১ সালে।
এরপর গবেষকরা দ্রুত প্রথম উচ্চশক্তির নিউট্রিনো শনাক্ত করেন। কয়েক বছর পর তারা এমন নিউট্রিনো শনাক্তের কথা প্রকাশ করেন, যেগুলো এসেছে সৌরজগতের অনেক দূরের কোনো অঞ্চল থেকে।
নোবেল কমিটির পদার্থবিজ্ঞান পুরস্কার কমিটির চেয়ারম্যান মার্ক পিয়ার্স বলেন, “ফ্রান্সিস হালসেন গবেষক ও প্রকৌশলীদের একটি আন্তর্জাতিক দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন, যারা আমাদের একটি অসাধারণ যন্ত্র দিয়েছেন। তার অধ্যবসায় ও বৈজ্ঞানিক দূরদৃষ্টি নতুন ধরনের জ্যোতির্বিজ্ঞানের পথ তৈরি করেছে।”
আইসকিউব দিয়ে ধারাবাহিকভাবে সংগ্রহ করা নিউট্রিনোর মিথস্ক্রিয়ার তথ্য গবেষকদের উচ্চশক্তির নিউট্রিনো তৈরি হতে পারে—এমন প্রচণ্ড শক্তিশালী মহাজাগতিক পরিবেশ সম্পর্কে নতুন ধারণা দেবে।
এমনকি এসব তথ্যের মাধ্যমে আগে অজানা মহাজাগতিক কোনো ঘটনারও সন্ধান মিলতে পারে।
গত বছর পদার্থবিদ্যার নোবেল পেয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিজ্ঞানী জন ক্লার্ক, মিশেল দেভোরে ও জন মার্টিনিস। কোয়ান্টাম পদার্থবিদ্যার নীতিগুলো বাস্তবে কীভাবে কাজ করে, তা পরীক্ষার মাধ্যমে দেখানো জন্য তাদের এই পুরস্কার দেওয়া হয়। সেই গবেষণা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কম্পিউটিং ও অন্যান্য ডিজিটাল প্রযুক্তির অগ্রগতিতে ভূমিকা রাখতে পারে।
এর আগে আলবার্ট আইনস্টাইন, মেরি কুরি, পিয়ের কুরি, ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ও নিলস বোরের মতো বিজ্ঞানীরা এই পুরস্কার পেয়েছেন। তাদের গবেষণা মহাবিশ্ব সম্পর্কে মানুষের ধারণার ভিত্তি বদলে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
বরাবরের মতই চিকিৎসা বিভাগের পুরস্কার ঘোষণার মধ্য দিয়ে সোমবার চলতি বছরের নোবেল মৌসুম শুরু হয়।
বুধবার ঘোষণা করা হবে রসায়নে নোবেল। বৃহস্পতিবার আসবে সাহিত্যের নোবেল ঘোষণা। এরপর শুক্রবার শান্তি ও আগামী ১৩ অক্টোবর অর্থনীতিতে এবারের নোবেল বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হবে।
আগামী ১০ ডিসেম্বর স্টকহোমে এক অনুষ্ঠানে বিজয়ীদের হাতে তুলে দেবেন সুইডেনের রাজা কার্ল ষোড়শ গুস্তাফ। দিনটি আলফ্রেড নোবেলের মৃত্যুবার্ষিকী। পুরস্কার বিতরণের পর স্টকহোম সিটি হলে আয়োজন করা হবে নৈশভোজের।
