Published : 10 Dec 2025, 03:48 PM
অস্ট্রেলিয়ায় ভোরে ঘুম থেকে উঠে অনেক কিশোর দেখেছে তাদের অ্যাকাউন্ট অচল। কারণ, দেশটিতে কার্যকর হয়েছে বিশ্বের প্রথম সোশাল মিডিয়া নিষেধাজ্ঞা।
কেউ কেউ আবার বিবিসিকে বলেছে তারা আগেই নানা ফাঁকফোকর পেরিয়ে গেছে, আর ধরা না পড়া পর্যন্ত তাদের স্ক্রল আর পোস্টিং চলবে।
নতুন আইন অনুযায়ী মেটা, টিকটক, ইউটিউবসহ বড় প্ল্যাটফর্মগুলোকে এখন বাধ্যতামূলকভাবে ‘যুক্তিসঙ্গত পদক্ষেপ’ নিতে হবে, যাতে অস্ট্রেলিয়ায় ১৬ বছরের নিচে কেউ তাদের প্ল্যাটফর্মে অ্যাকাউন্ট রাখতে না পারে।
শিশুদের ক্ষতিকর কনটেন্ট আর অ্যালগরিদম থেকে বাঁচানো দরকার এমন যুক্তিতেই এসেছে এই কঠোর সিদ্ধান্ত। তবে সমালোচকরা মনে করছেন অন্ধ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা কঠিন, আর এটি মোটেও বুদ্ধিদীপ্ত কোনো সমাধান নয়।
এই নীতিকে প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ তার অন্যতম অগ্রাধিকার বলে আসছেন। বুধবার গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, “অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী হিসাবে এতোটা গর্ব আমি কখনো বোধ করিনি। এটা আমাদের বার্তা যে, যথেষ্ট হয়েছে।”
তিনি মনে করেন এই সিদ্ধান্ত “বিশ্বকে বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে”।
অনেক দেশই শিশুদের সোশাল মিডিয়া ব্যবহারে সীমা বসানোর চেষ্টা করছে। তবে ১৬ বছরের সীমা আর তাতে অভিভাবক অনুমতির সুযোগ না রাখায় অস্ট্রেলিয়ার আইন এখন বিশ্বের সবচেয়ে কঠোর। ডেনমার্ক, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, গ্রিস, ব্রাজিলসহ অনেক দেশ অস্ট্রেলিয়ার পরীক্ষামূলক উদ্যোগটি পর্যবেক্ষণ করছে।
শুরুতে ১০টি বড় সোশাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অনলাইন সেইফটি রেগুলেটর জুলি ইনম্যান গ্রান্ট বলেছেন তার দপ্তর বৃহস্পতিবার থেকেই নজরদারি শুরু করবে। শিশু বা অভিভাবকদের ওপর কোনো দায় আসবে না, দায় থাকবে শুধু কোম্পানির ওপর।
আর, বড় লঙ্ঘনে জরিমানা হতে পারে সর্বোচ্চ ৪ কোটি ৯৫ লাখ অস্ট্রেলিয়ান ডলার।
তিনি বলেন, “আগামীকাল ১০টি বড় প্ল্যাটফর্মকে নোটিশ পাঠাবো আর বড়দিনের আগেই জানিয়ে দেব বয়স যাচাই কীভাবে হচ্ছে আর শুরুটা কতটা কার্যকর বলে মনে হচ্ছে।”
দেশটিতে ব্যাপকভাবে স্বীকৃত যে সোশাল মিডিয়া কোম্পানিগুলো ব্যবহারকারীদের, বিশেষ করে শিশুদেরকে যথেষ্ট নিরাপত্তা দিতে পারছে না। তাসমানিয়ার বারো বছরের শিক্ষার্থী ফ্লোরেন্স ব্রডরিব বলেছে, এই নিষেধাজ্ঞা তার মতো শিশুদের “আরও স্বাস্থ্যকর, নিরাপদ, উদার আর সংযুক্ত” হয়ে বড় হতে সাহায্য করবে। তার কথায়, “আমাদের মস্তিষ্ক এখন বড় রকমের রিওয়্যারিংয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, আর সোশাল মিডিয়া সেটার সুযোগ নেয়।”
তবে শিশুরা যে এতে খুশি নয় তা স্পষ্ট। অনেকেই বলছে এটি তাদের যোগাযোগের সুযোগ কমিয়ে দেবে, বিশেষ করে যারা এলজিবিটিকিউ+, নিউরোডাইভার্জেন্ট বা দূরবর্তী এলাকায় থাকে। ১৫ বছরের ব্রিয়ানা বিবিসিকে বলেছে, “আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু থাকে ৩০ কিলোমিটার দূরে। স্ন্যাপচ্যাট বন্ধ হলে আমাদের যোগাযোগও বন্ধ হবে।”
বিশেষজ্ঞদের শঙ্কা, কিশোররা সহজেই বয়স যাচাই ফাঁকি দেবে অথবা আরও অনিরাপদ প্ল্যাটফর্মে চলে যাবে। সমালোচকেরা বলছে নিষেধাজ্ঞার বদলে আরও ভালো শিক্ষাদান আর মডারেশন জরুরি। সিডনির দুই সন্তানের বাবা ইয়ান বলেন, “ভাবনাটা ভালো, কিন্তু এভাবে করা ঠিক কিনা আমি নিশ্চিত নই।”
টেক কোম্পানিগুলোও মনে করছে সরকার সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। তারা বলছে সম্প্রতি আনা প্যারেন্টাল কন্ট্রোলই যথেষ্ট সমাধান।
সরকার অবশ্য স্বীকার করেছে সবকিছু নিখুঁত হবে না। আলবানিজ বলেন, “সাফল্য মানে এই আলোচনা শুরু হওয়া। আমরা জানি এটা নিখুঁত হবে না, তবু এগোবো।”
ইনম্যান গ্রান্ট মনে করেন অস্ট্রেলিয়া দীর্ঘমেয়াদি পথে হাঁটছে। তার ভাষায়, “শিশুরা ফাঁক গলে বেরিয়ে যাচ্ছে এমন খবর আসবে, কিন্তু এতে আমরা থামবো না। যেমন এক সময় দেশগুলো আমাদের তামাক প্যাকেটিং, অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ, পানি আর সূর্য সুরক্ষায় পথ অনুসরণ করেছিল, এখানেও সেটাই হবে।”