Published : 26 Aug 2026, 09:01 PM
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে টিনএজারদের সুরক্ষা ও আসক্তিকর ডিজাইনসংক্রান্ত ঐতিহাসিক এক মামলায় আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন ইনস্টাগ্রামের সিইও অ্যাডাম মোসেরি।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান লিখেছে, মেটার শীর্ষ এই নির্বাহী মার্কিন কৌঁসুলিদের উত্থাপিত সব অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছেন, তার কোম্পানি জনগণের কাছ থেকে কোনো ক্ষতিকর তথ্য বা টিন সুরক্ষার পরিসংখ্যান গোপন করেনি।
মঙ্গলবার ক্যালিফোর্নিয়ার এক আদালতে ইনস্টাগ্রাম প্রধান বলেছেন, “আমি আমার দলের কর্মীদের কোনো তথ্য লুকানোর জন্য উৎসাহিত করছি না।”
যুক্তরাষ্ট্রের ২৯টি অঙ্গরাজ্যের দায়ের করা এ ঐতিহাসিক মামলায় নিজেদের শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে প্রথম মোসেরিকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করাল ইনস্টাগ্রাম ও ফেইসবুকের মূল কোম্পানি মেটা।
মঙ্গলবার আদালতের কর্মদিবসের শেষদিকে তার সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয় এবং বুধবারও তা চলার কথা রয়েছে।
টিনএজারদের সুরক্ষার উদ্দেশ্যে তৈরি করা ইনস্টাগ্রামের নানা ফিচারে ব্যবহারকারীদের অংশগ্রহণের হার কেন হতাশাজনকভাবে কম ও সেই তথ্য কেন গোপন রাখা হল কৌঁসুলিদের এমন একাধিক প্রশ্নের মুখে বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন মোসেরি।
তিনি বলেছেন, “আমরা তো আর সব ধরনের তথ্য বা পরিসংখ্যান প্রকাশ করি না।”
কলোরাডো অঙ্গরাজ্যের কৌঁসুলি জেসন স্লোথোবার ‘টেইক এ ব্রেক’ নামের ফিচারটি নিয়ে মোসেরিকে প্রশ্নের বাণে বিদ্ধ করেন। টানা অনেকক্ষণ স্ক্রল করার পর টিনএজাররা যাতে অ্যাপ ব্যবহার থেকে বিরতি নেয়, সেই উদ্দেশ্যে ফিচারটি চালু হয়েছিল।
স্লোথোবার আদালতে বলেছেন, কেবল এক দশমিক আট শতাংশ টিনএজার এ ফিচারটি চালু করেছিল। মোসেরি প্রকাশ্যে এ ফিচারের সুবিধা নিয়ে প্রচার চালালেও এর ব্যবহারের হার যে এত কম তা কখনও প্রকাশ করেননি।
এর জবাবে মোসেরি বলেছেন, “আমি প্রকাশ্যে নিশ্চিতভাবেই বলেছি, এ ফিচার ব্যবহারের হার কম। তবে আমি নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যা উল্লেখ করেছি কি না তা আমার মনে নেই।”
গেল সপ্তাহে ক্যালিফোর্নিয়ার ওকল্যান্ডের এক ফেডারেল আদালতে জুরিদের সামনে এই বহুল আলোচিত মামলার বিচার কাজ শুরু হয়। মার্কিন অঙ্গরাজ্যগুলোর মূল অভিযোগ, মেটা জেনেশুনে এমন কিছু আসক্তিকর ফিচার ডিজাইন করেছে, যা অপ্রাপ্তবয়স্কদের সামাজিক মাধ্যমে বন্দি করে ফেলে। এর পরিণতিতে তাদের মধ্যে মানসিক বিষণ্নতা, উদ্বেগ ও নিজের জীবনাবসানের মতো প্রবণতা বাড়ছে।
পাশাপাশি অঙ্গরাজ্যগুলো দাবি করেছে, ফেডারেল ও অঙ্গরাজ্য আইন লঙ্ঘন করে মা-বাবার সম্মতি ছাড়াই নিয়মিত ১৩ বছরের কম বয়সি শিশুদের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করে গেছে এ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম জায়ান্টটি।
অভিযোগ প্রমাণিত হলে মেটাকে প্রায় ২০ হাজার কোটি ডলার পর্যন্ত জরিমানা গুনতে হতে পারে। পাশাপাশি শিশুদের জন্য নিরাপদ করতে নিজেদের প্ল্যাটফর্মগুলোর নকশাতেও বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে বাধ্য হবে।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ মামলার রায়ের ওপর ভিত্তি করে তরুণদের জন্য সামাজিক মাধ্যম অ্যাপের সার্বিক পরিচালনা ও কার্যপদ্ধতিতে ঘটতে পারে যুগান্তকারী পরিবর্তন।
এদিকে, মেটা তাদের বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, অঙ্গরাজ্যগুলো কেবল ‘অবাস্তব ও চড়া অংকের ক্ষতিপূরণ আদায় করতেই’ এ মামলা চালাচ্ছে।
মঙ্গলবার মেটার একজন মুখপাত্র বলেছেন, তাদের নিরাপত্তা দল সবসময় সেরা মান ধরে রাখতে সচেষ্ট। মোসেরির সাক্ষ্যেই স্পষ্ট হয়েছে, ব্যবহারকারীদের অভিজ্ঞতা উন্নত করতে কোম্পানিটি প্রতিনিয়ত নানা গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে।
২০১৮ সালে ইনস্টাগ্রামের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেন অ্যাডাম মোসেরি। অ্যাপের আসক্তিকর নকশা ও অপ্রাপ্তবয়স্কদের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে ভেতরের বিভিন্ন সতর্কতা তিনি বারবার উপেক্ষা করেছেন—এমন অভিযোগের মুখে তাকে আগেও পড়তে হয়েছে।
এর আগে, ২০২১ সালের ডিসেম্বরে মার্কিন সেনেট কমিটির সামনে ও সামাজিক মাধ্যমের ক্ষতিকর প্রভাব সংক্রান্ত অন্যান্য মামলাতেও তাকে সাক্ষী হিসেবে হাজিরা দিতে হয়েছিল।
মঙ্গলবার আদালতে কলোরাডোর কৌঁসুলি স্লোথোবার সেনেটে সাক্ষ্য দেওয়ার ঠিক আগের দিন প্রকাশিত মোসেরির এক ব্লগের প্রসঙ্গ টেনে আনেন।
‘অনলাইনে টিনএজারদের সুরক্ষা ও অভিভাবকদের সহায়তার মান বাড়ানো’ শিরোনামে সেই ব্লগে ‘টেইক এ ব্রেক’ ফিচার চালুর ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। স্লোথোবার ওই সময়টিতে ব্লগটি প্রকাশের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
জবাবে মোসেরি বলেছেন, “আমরা কিছু ক্ষেত্রে অগ্রগতি পেয়েছিলাম এবং সেই অগ্রগতির বিষয়টি সবার সামনে তুলে ধরতে চেয়েছিলাম, যাতে ফিচারটি নিয়ে কথা বলা যায়।”
এরপর স্লোথোবার ইনস্টাগ্রাম প্রধানের কাছে জানতে চান তিনি ‘ড্রামবিট মেসেজিং’ বা কোনো বার্তা মানুষের মাথায় গেঁথে দেওয়ার জন্য বারবার তা প্রচার করা ধারণাটির সঙ্গে পরিচিত কি না।
মোসেরি ইতিবাচক সাড়া দিয়ে বলেছেন, অভিভাবক ও নিরাপত্তা বিষয়ক বিভিন্ন ফিচার নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্রে এমনটা প্রয়োজন হয়।
“ওসব ফিচার সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে আমাদের বারবার একই কথা বলতে হয়।”
এ সপ্তাহে বিচারকরা মেটার সাবেক নিরাপত্তা প্রকৌশলী ও হুইসেলব্লোয়ার বা তথ্যফাঁসকারী আরতুরো বেজারের বক্তব্যও শোনেন। আদালতে বেজার বলেছেন, প্ল্যাটফর্মে শিশুদের সুরক্ষার বিষয়ে মেটা ‘প্রশ্নও করো না, জানতেও চেয়ো না’ নীতি মেনে চলে।
এ ছাড়া, বিচারকরা একজন মনোবিজ্ঞানীসহ মেটার সাবেক ও বর্তমান একাধিক কর্মীর জবানবন্দি নিয়েছেন।
আগামী সেপ্টেম্বর মাসজুড়ে এ মামলার বিচারপ্রক্রিয়া চলার কথা রয়েছে। বিচার চলাকালে মেটার সিইও মার্ক জাকারবার্গসহ আরও বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি সাক্ষ্য দেবেন।