Published : 22 Aug 2026, 05:10 PM
দক্ষিণ আমেরিকার দেশ উরুগুয়েতে ১২ কোটি ডলারের বিটকয়েন মাইনিং প্রকল্প শুরু করলেও শেষ পর্যন্ত সেখান থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে ক্রিপ্টোকারেন্সি জায়ান্ট টিথার।
রয়টার্স লিখেছে, পর্যপ্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়ে স্থানীয় রাষ্ট্রীয় বিদ্যুৎ সংস্থার সঙ্গে টানাপোড়েন এবং বিশ্বজুড়ে বিটকয়েন মাইনিংয়ের আয়ে মন্দা দেখা দেওয়ায় শেষ পর্যন্ত পুরো কার্যক্রম গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে এই বৈশ্বিক কোম্পানিটি।
বিশ্বে প্রচলিত মোট স্টেবলকয়েনের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশের নিয়ন্ত্রক টিথার ২০২৩ সালে উরুগুয়েতে দুটি বড় মাইনিং সাইট তৈরির ঘোষণা দিয়েছিল। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও কর ছাড়ের সুবিধার কারণে উরুগুয়ে সাম্প্রতিক সময়ে গ্লোবাল ফিনটেক হাব হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছিল।
টিথার দাবি করেছিল, তাদের এ উদ্যোগ স্থানীয় অর্থনীতি, বিদ্যুৎ অবকাঠামো ও কর্মসংস্থানে বড় অবদান রাখবে। তবে রয়টার্সের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়ে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ার পর উরুগুয়ের কার্যক্রম পুরোপুরি গুটিয়ে নিয়েছে টিথার।
প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রের বরাতে জানা গেছে, ছেড়ে দেওয়া এ প্রকল্পে টিথারের খরচ হয়েছিল প্রায় ১২ কোটি ডলার। প্রকল্পটি বাতিলের বিষয়ে রয়টার্সের মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি কোম্পানিটি।
মস্তিষ্কে ইমপ্ল্যান্ট প্রযুক্তি থেকে শুরু করে ফুটবল ক্লাবে বিনিয়োগের মাধ্যমে ব্যবসা সম্প্রসারণ করা টিথারের অস্পষ্ট ও অপ্রকাশিত ব্যবসার কার্যপদ্ধতেই উঠে এসেছে এ ঘটনায়।
বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দামবৃদ্ধি ও ক্রিপ্টো বাজার ওঠানামার কারণে সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ দিয়ে ক্রিপ্টো তৈরির লাভজনক মডেলটি যে হুমকির মুখে পড়ছে এমন ঘনঘটা তারই ইঙ্গিত।
যুক্তরাজ্যের ‘নর্থামব্রিয়া ইউনিভার্সিটি’র সহকারী অধ্যাপক পিট হাউসন বলেছেন, “বিট কয়েন মাইনিংয়ের এ ব্যবসা আসলে অতিমাত্রায় স্থানান্তরযোগ্য। সাধারণ প্লাগ-অ্যান্ড-প্লে অবকাঠামো হওয়ায় তা যে কোনো সময় গুটিয়ে নেওয়া সহজ। ফলে স্থানীয়দের জন্য দীর্ঘমেয়াদে তেমন কোনো স্থায়ী কর্মসংস্থান বা অর্থনৈতিক সুফল নিশ্চিত হয় না।”
‘নিখুঁত প্ল্যাটফর্ম’
২০২৩ সালের মে মাসে দক্ষিণ আমেরিকার উরুগুয়েতে প্রথম বিটকয়েন মাইনিং কার্যক্রম শুরুর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছিল বহুল আলোচিত ক্রিপ্টোকারেন্সি প্রতিষ্ঠান টিথার। দেশটিতে পরিবেশবান্ধব শক্তি ও উন্নত বিদ্যুৎ গ্রিড থাকায় উরুগুয়েকে ‘নিখুঁত প্ল্যাটফর্ম’ হিসেবে বর্ণনা করেছিল তারা।
ওই ঘোষণায় বিস্তারিত কিছু না জানালেও কোম্পানির প্রধান নির্বাহী পাওলো আরদোইনো বলেছিলেন, মাইনিংয়ের পাশাপাশি সেখানে সরাসরি জ্বালানি উৎপাদনে বিনিয়োগ করবে টিথার।
বিটকয়েন মাইনিং নিবিড় বিদ্যুৎসরবরাহনির্ভর জটিল এক প্রক্রিয়া, যেখানে বিশ্বজুড়ে শক্তিশালী কম্পিউটার ব্যবহার করে জটিল গাণিতিক হিসাব সমাধানের মাধ্যমে নতুন ক্রিপ্টোকারেন্সি তৈরি করা হয়। আন্তর্জাতিক সম্মেলনে আরদোইনো বলেছেন, জ্বালানি উৎপাদন ও মাইনিং খাতে এরইমধ্যে তারা ২০০ কোটি ডলারের বেশি বিনিয়োগ করেছেন।
প্রকল্পটির সঙ্গে জড়িত একজন সাবেক ঠিকাদার রয়টার্সকে বলেছেন, উরুগুয়ের ফ্লোরিডা বিভাগে দুটি মাইনিং সাইটের প্রতিটিতে প্রায় ৬ কোটি ডলার করে মোট ১২ কোটি ডলার খরচ করেছিল টিথার, যা ছিল বার্ষিক মোট ২ কোটি ডলারের প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ পাওয়া উরুগুয়ের জন্য বড় উদ্যোগ।
পরিকল্পনাটি ছিল ব্রাজিল, প্যারাগুয়ে ও আর্জেন্টিনার মতো বড় বাজারে নামার আগে উরুগুয়েকে পরীক্ষামূলক ক্ষেত্র বা ‘টেস্টিং গ্রাউন্ড’ হিসেবে ব্যবহার করা।
মধ্য আমেরিকার দেশ এল সালভাদর থেকে কেবল কয়েকশ কর্মী দিয়ে পরিচালিত টিথার বর্তমানে প্রায় ১৮ হাজার ৩০০ কোটি ডলার দামের স্টেবলকয়েন নিয়ন্ত্রণ করছে।
মার্কিন ডলারের মতো মূলধারার মুদ্রার মানের সঙ্গে সমন্বয় করে চলা এ ক্রিপ্টো মুদ্রা বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে অতিরিক্ত ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে বলে উদ্বেগ রয়েছে নীতি নির্ধারকদের।
তবে, টিথারের দাবি, তাদের প্রতিটি স্টেবলকয়েনের পেছনে সমান পরিমাণ বাস্তব সম্পদ জমা রয়েছে। মার্কিন সরকারের বন্ড বা ট্রেজারি বিলের শীর্ষ ২০ ধারকের একটি এখন তারা।
এ ব্যবসা থেকে পাওয়া বিপুল লভ্যাংশ দিয়েই পরবর্তীতে প্রায় ২ হাজার কোটি ডলারের বিনিয়োগ পোর্টফোলিও তৈরি করেছে কোম্পানিটি।
গোপন এ বড় সাম্রাজ্যের অধীনে তারা ডেটা সেন্টার, ব্রেইন-চিপ ইমপ্ল্যান্ট প্রযুক্তি, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের ‘ট্রুথ সোশাল’ প্ল্যাটফর্ম পরিচালনাকারী ভিডিও শেয়ারিং সাইট ‘রাম্বল’ ও ইতালির ফুটবল ক্লাব ‘ইউভেন্তুস’-এ মোটা অংকের শেয়ার কিনেছে।
‘সরবরাহে মতবিরোধ’
২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ উরুগুয়েতে নিজেদের নতুন প্রকল্পের এক প্রমোশনাল ভিডিও প্রকাশ করে টিথার।
ভিডিওতে দেখা যায়, গ্রামীণ এলাকা ফ্লোরিডার দিগন্তজোড়া কৃষিভূমির মধ্যে সারিবদ্ধ ছোট ছোট ভবন, আশপাশে বায়ুকল বা উইন্ড টারবাইন ও ভেতরে বসানো রয়েছে ক্রিপ্টো মাইনিংয়ের শক্তিশালী কম্পিউটার ও ফ্যান।
প্রযুক্তি অঙ্গনের পরিচিত শব্দ দিয়ে ওই এলাকার রাস্তার নাম রাখা হয়েছিল। যেমন, ‘মিমপুল অ্যাভিনিউ’ ও ‘হাভিং স্ট্রিপ’।
সংশ্লিষ্ট ঠিকাদাররা বলছেন, প্রাথমিক অবস্থায় চমৎকারভাবে পরিচালিত প্রকল্প থেকে ভালোই আয় আসছিল। তবে উরুগুয়ের রাষ্ট্রীয় বিদ্যুৎ সরবরাহকারী সংস্থা ‘ইউটিই’র সঙ্গে বিদ্যুৎ সরবরাহ চুক্তি নিয়ে বিরোধ তৈরি হতেই ভেস্তে যেতে শুরু করে সবকিছু।
টিথার ও ইউটিই’র দ্বন্দ্বের মূল জায়গাটি ছিল বরাদ্দকৃত বিদ্যুতের পরিমাণ। সাবেক এক ঠিকাদার রয়টার্সকে বলেছেন, টিথার ধরে নিয়েছিল চুক্তিতে উল্লিখিত বিদ্যুতের পরিমাণ প্রাথমিক বা সর্বনিম্ন মাত্রা, যা চাহিদামতো পরবর্তীতে বাড়ানো যাবে। তবে ইউটিই বিষয়টিকে সর্বোচ্চ সীমা হিসেবে মনে করে, যা বাড়ানোর কোনো সুযোগ ছিল না।
ফলে মাইনিং প্ল্যান্টগুলোতে বিট কয়েন তৈরির চাহিদা বাড়লেও পর্যাপ্ত বিদ্যুতের চরম সংকট দেখা দেয়। ইউটিই’র অভ্যন্তরীণ নথি অনুসারে, ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকেই এ জটিলতা শুরু এবং টিথারের মাইনিং সাইটগুলোতে টানা কয়েকদিন বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার মতো পরিস্থিতিও তৈরি হয়।
পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে ২০২৫ সালের মার্চে উরুগুয়েতে ক্ষমতার পরিবর্তনের পর। নতুন বামপন্থী সরকার দায়িত্বে এসে ইউটিই’তে নতুন পরিচালক নিয়োগ দিলে বিদ্যুৎ সরবরাহ পুনর্বিবেচনার বিষয়ে রাষ্ট্রীয় সংস্থাটি আরও কঠোর অবস্থান নেয়।
বকেয়া জমে থাকা ও নতুন সরকারের কঠোর অবস্থানের কারণে ২০২৫ সালের জুনে চুক্তি বাতিলের সিদ্ধান্তের কথা জানায় টিথারের স্থানীয় সহযোগী কোম্পানি ‘মাইক্রোফিন’।
পরবর্তীতে উভয় পক্ষ সমঝোতায় পৌঁছানোর উদ্দেশ্যে নতুন এক সংশোধিত চুক্তির খসড়া অনুমোদন করলেও টিথারের প্রতিনিধিরা চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে উপস্থিত হননি।
অবশেষে বকেয়া বিল পরিশোধ না করায় ২০২৫ সালের ২৫ জুলাই টিথারের মাইনিং সাইটগুলোর বিদ্যুৎ সংযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে দেয় ইউটিই।
পরবর্তীতে স্থানীয় পত্রিকা ‘এল অবসারভেদর’-এর প্রতিবেদন অনুসারে, ২৫ নভেম্বর কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ ও কর্মীদের ছাঁটাইয়ের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে জানায় টিথার।
রয়টার্সকে ইউটিই নিশ্চিত করেছে, শেষ পর্যন্ত ডিসেম্বরে নিজেদের সব বকেয়া পাওনা মিটিয়ে দিয়েছে টিথার।
এআই’তে ঝোঁকার প্রবৃত্তি
উরুগুয়েতে টিথারের বড় উদ্যোগ ব্যর্থ হওয়ার পেছনের অন্যতম কারণ ক্রিপ্টো খাতের হঠাৎ মন্দা। সাম্প্রতিক সময়ে বৈশ্বিক ক্রিপ্টো বাজারে বিটকয়েন মাইনিং আগের মতো লাভজনক ব্যবসা হিসেবে টিকে থাকতে পারছে না বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
২০২৪ সালের এপ্রিলে বিটকয়েন সিস্টেমে নির্ধারিত স্বয়ংক্রিয় পুরষ্কার কমানোর প্রক্রিয়া ‘হাভিং’ বাস্তবায়ন ও ২০২৫ সালে বিটকয়েনের সর্বোচ্চ দরপতনের পর থেকে এ খাতে আয় আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে।
ডিজিটাল অ্যাসেট প্ল্যাটফর্ম ‘তালোস’-এর জ্যেষ্ঠ গবেষণা বিশ্লেষক তানায় বেদ বলেছেন, বিটকয়েন মাইনাররা এ পরিস্থিতিতে টিকে থাকতে আরও আধুনিক যন্ত্রপাতি কেনা, সাশ্রয়ী বিদ্যুতের অনুসন্ধান বা মাইনিংয়ের শক্তিশালী কম্পিউটিং সক্ষমতাকে ডিজিটাল মুদ্রা খাত থেকে সরিয়ে এআই ও উচ্চসক্ষমতাওয়ালা কম্পিউটিং খাতে ব্যবহারের পথ বেছে নিচ্ছে।
অন্যদিকে, শিল্পটিকে ‘পরিবর্তনশীল’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন ক্রিপ্টো মাইনিং বিশেষজ্ঞ নিকোলাস রিবেরো। তার ভাষ্য, ব্যবসায়িক সুবিধার ওপর নির্ভর করে বিটকয়েন মাইনাররা প্রতিনিয়ত নতুন কেন্দ্র খোলা, বন্ধ করা বা স্থান পরিবর্তনের মধ্যে থাকে।
রিবেরোর বিশ্লেষণ অনুসারে, উরুগুয়ের শক্তিশালী পাওয়ার গ্রিড ও দ্রুতগতির ইন্টারনেট সংযোগ এআই ডেটা সেন্টার গড়ে তোলার জন্য উপযোগী। কারণ বিটকয়েন মাইনিং পুরোপুরি নির্ভর করে ‘সাশ্রয়ী বিদ্যুতের সহজলভ্যতার ওপর’।
পরিবেশবান্ধব জ্বালানিতে উরুগুয়ে এগিয়ে থাকলেও সেখানে বিদ্যুতের উৎপাদন ও সরবরাহ খরচ তুলনামূলক বেশি। তিনি বলেছেন, “উরুগুয়ে বিটকয়েন মাইনিংয়ের মতো ব্যবসার জন্য মোটেও সুবিধাজনক বা লাভজনক কোনো জায়গা নয়।”