১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

এআই বনাম মানুষের শ্রম: কোন পথে চীন?

বিশ্লেষকরা বলছেন, ব্যক্তি খাতের ওপর যেখানে সরকারের জোরালো নিয়ন্ত্রণ রয়েছে, সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে ভালো এআই কর্মসংস্থান সংকট সামাল দিতে পারবে চীন।

এআই বনাম মানুষের শ্রম: কোন পথে চীন?
বেইজিং চাইলেই বিভিন্ন কোম্পানিকে নির্দিষ্ট সংখ্যক কর্মী নিয়োগের কোটা বাস্তবায়নে বাধ্য করতে পারে। ছবি: এআই

প্রযুক্তি ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 02 Aug 2026, 10:08 AM

Updated : 11 Sep 2026, 03:46 PM

চালকবিহীন রোবোট্যাক্সি থেকে শুরু করে বিনোদন জগৎ– চীনে দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এখন লাখ লাখ মানুষের জীবিকার ওপর সরাসরি আঘাত হানছে।

এতে কাজের সুযোগ হারানোর চরম উৎকণ্ঠা তৈরি হওয়ায় প্রযুক্তির এ দ্রুত বিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া বনাম টিকে থাকার লড়াইয়ে নেমেছেন দেশটির বিপুলসংখ্যক কর্মী।

ব্রিটিশ সংবাদম্যধম গার্ডিয়ান লিখেছে, চীনের উহান শহরের ব্যস্ত সড়কে নতুন প্রযুক্তির গাড়ির কারিগরি ত্রুটি সম্প্রতি যানজট ও বিশৃঙ্খলা তৈরি করেছে। মার্চে এআইচালিত ‘অ্যাপোলো গো’ রোবোট্যাক্সি বহরের বেশ কয়েকটি গাড়ি হঠাৎ মাঝরাস্তায় বন্ধ হয়ে যায়।

সিস্টেমে গোলযোগের কারণে এতে অনেক যাত্রী দীর্ঘ সময় আটকে থাকেন এবং তদন্তের জন্য এসব গাড়ি বেশ কয়েক মাস সড়ক থেকে সরিয়ে রাখা হয়েছে।

সাময়িক এ বিপর্যয় স্বস্তি নিয়ে এসেছে ৪৫ বছর বয়সি ট্যাক্সিচালক ইয়াও সিননের জীবনে। ২০২২ সালে টেক জায়ান্ট বাইডুর পরিচালিত চালকবিহীন ‘অ্যাপোলো গো’ সেবা চালুর পর তার আয় প্রায় ৪০ শতাংশ কমেছিল।

রোবোট্যাক্সি সাময়িক বন্ধ থাকায় গ্রাহকরা আবারও তার ট্যাক্সিতে ফিরতে শুরু করেছেন। এআইচালিত সেবা সম্পর্কে অসন্তোষ প্রকাশ করে ইয়াও বলেছেন, “আমি সত্যি এগুলোকে পছন্দ করি না, আমাদের আয়ে এগুলোর বড় আঘাত এনেছে।”

চীন বর্তমানে পশ্চিমা বিশ্বের তুলনায় অনেক বড় পরিসরে এআই প্রযুক্তির প্রসার ঘটাচ্ছে। তবে ভঙ্গুর শ্রমবাজারে দ্রুতগতিতে এ প্রযুক্তির প্রয়োগ সামাজিক উৎকণ্ঠা বাড়িয়ে দিচ্ছে।

ইয়াওর মতো কর্মীরা তাদের জীবিকা হারানোর শঙ্কায় আছেন। ‘হোয়াইট কলার’ বা দাপ্তরিক চাকরিজীবীদেরও এআই দিয়ে প্রতিস্থাপনের ঘটনা ঘটতে থাকায় শ্রমিকদের এ প্রযুক্তিকে আপন করে নেওয়া উচিত নাকি এর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা উচিত তা নিয়ে জোর বিতর্ক শুরু হয়েছে।

জুলাইয়ে সাংহাইয়ে বিশ্ব এআই সম্মেলনে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বলেছেন, এআইকে ‘যৌথ সমৃদ্ধি ও সার্বজনীন নিরাপত্তার প্রধান চালিকাশক্তি’ হিসেবে ব্যবহার করা উচিত। এমন সময়ে এই লক্ষ্য নির্ধারিত হচ্ছে যখন দেশটির শ্রমবাজার বেশ ভঙ্গুর।

উচ্চ বেকারত্বের পাশাপাশি চীনে কয়েক কোটি মানুষ নিয়মিত চাকরি হারিয়ে অস্থায়ী কাজের দিকে ঝুঁকছেন। এক গবেষণা কোম্পানির তথ্য মতে, ২০১৯ সালে চীনে অস্থায়ী কর্মসংস্থানে থাকা মানুষের সংখ্যা ছিল ১৬ কোটি, সেখানে এ বছরে তা বেড়ে ৩২ কোটিতে পৌঁছাবে, যা চীনের মোট জনশক্তির প্রায় ৪৪ শতাংশ।

উহানের বড় শ্রমশক্তির অন্যতম বড় অংশ ট্যাক্সিচালকরা। রিয়াল এস্টেট ও শিক্ষা খাতের মতো বড় বিভিন্ন ক্ষেত্রে ধস নামলে দেশজুড়ে বহু কর্মী জীবিকা নির্বাহের উপায় হিসেবে রাইড-শেয়ারিং প্ল্যাটফর্মগুলোতে ঝুঁকতে শুরু করেছেন।

তবে চীনে এআই প্রযুক্তির বহুল ব্যবহৃত ‘রোবোট্যাক্সি’ চালুর পর এবার তাদের শেষ সম্বলটুকুর ওপরও আঘাত এসেছে।

উহানের একজন নারী ট্যাক্সিচালক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, “রাষ্ট্র যদি সত্যিই সাধারণ মানুষের কথা ভাবত তবে অ্যাপোলো গো কখনোই বাজারে আসতে পারত না। এভাবে চলতে থাকলে বিজ্ঞানের দ্রুত অগ্রগতি নিশ্চিতভাবেই ভালো তবে আমাদের মতো সাধারণ মানুষের তো আর বেঁচে থাকার জায়গা থাকবে না।”

২০২৪ সালে উহান শহরের রাস্তায় ‘অ্যাপোলো গো’ চালুর বিরুদ্ধে ট্যাক্সিচালকরা আন্দোলনে নামেন। সরকারের দ্রুততম সেন্সরশিপের কারণে ঠিক কতজন এতে অংশ নিয়েছিলেন তা স্পষ্ট নয়।

উহানের একাধিক চালক বলেছেন, তারা আন্দোলনের কথা শুনলেও নিজে সরাসরি জড়িত ছিলেন না। একই বছর সরকারের এ স্বয়ংক্রিয় গাড়ি চলাচলের নীতি নিয়ে প্রকাশ্যে বিরল সমালোচনা করেছে উহানের এক ট্যাক্সি কোম্পানি।

চিঠিতে কোম্পানিটি বলেছে, “স্বয়ংক্রিয় গাড়ির এ নাটকীয় উত্থানের মাধ্যমে প্রযুক্তি সম্পদ নিজের দখলে নিয়ে সমাজের সর্বনিম্ন স্তরের মানুষের জীবিকা কেড়ে নিচ্ছে।”

তবে চীনে প্রকাশ্য সমালোচনা সরকার সহজভাবে দেখে না। জুলাইয়ে গার্ডিয়ানের প্রতিনিধি ওই ট্যাক্সি কোম্পানিটির কার্যালয়ে গিয়ে সাক্ষাৎকার চাইলে কথা বলতে রাজি হননি একজন কর্মী। পুলিশের সঙ্গে করা সমঝোতা চুক্তি ও চুক্তি ভাঙলে গ্রেপ্তারের ঝুঁকির কথা উল্লেখ করেছেন তিনি।

তবে দুই বছর পর উহানের সেই ট্যাক্সিচালকদের তোলা উদ্বেগের সুরই এখন শোনা যাচ্ছে সরকারের নীতি-নির্ধারকদের মুখেও।

চীন সরকারের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ‘ওয়ার্কার্স ডেইলি’র এক সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে, এআইয়ের এই যুগে কর্মসংস্থানের অধিকার ‘নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে’। এতে প্রচলিতকর্মসংস্থান সংক্রান্ত নিয়মাবলীর সঙ্গে এআই প্রযুক্তির দ্রুত বিবর্তনের সংঘাতের বিষয়েও সতর্ক করা হয়েছে।

সম্প্রতি চীন সরকারও ‘বহিঃস্থ পরিবেশের পরিবর্তন ও এআইয়ের মতো নতুন প্রযুক্তির বিবর্তনের কারণে কর্মসংস্থানে তৈরি বিভিন্ন প্রভাব গুরুত্বের সঙ্গে ঠেকানোর’ অঙ্গীকার করেছে।

চীনভিত্তিক প্রযুক্তি বিশ্লেষক সেলিনা সু বলেছেন, বেইজিংয়ের নীতিগত অবস্থানে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। গেল বছর স্থানীয় এআই মডেল ডিপসিকের সাফল্যের পর চীন ছিল পুরোপুরি এআই বিকাশের পক্ষে।

তবে এ বছরে প্রকাশিত নতুন বিভিন্ন নির্দেশনাতে কর্মসংস্থান বাড়ানো এবং ‘মানুষকে অগ্রাধিকার দেওয়ার’ মনোভাবের ওপর বেশি জোর দিচ্ছে চীন।

বেইজিংয়ের হাই-টেক জোন ঝংগুয়ানচুনের স্থানীয় সরকার কর্মকর্তা চেং ওয়ানহুই বলেছেন, কর্তৃপক্ষ এআইয়ের ফলে তৈরি সামাজিক সমস্যা ও সম্ভাব্য নৈতিক উদ্বেগের বিষয়গুলোতে গভীর নজর রাখছে।

তার ভাষ্য, মূল বিষয় সবাইকে নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে এআইকে একটি সহযোগী হাতিয়ার হিসেবে দেখতে হবে ও ভবিষ্যতে কাজের ক্ষেত্রে এটাকে কীভাবে প্রয়োগ করা যায় তা শিখতে হবে।

সম্প্রতি চীনের কিছু আদালতের রায়েও দেখা গেছে, যেসব দাপ্তরিক বা ‘হোয়াইট কলার’ কর্মীদের চাকরিচ্যুত করে এআই দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হয়েছিল, সেসব কোম্পানিকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে আদালত।

তবে সাধারণ কর্মীদের বড় ভয় চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে শুরুতেই এআই বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বেইজিংয়ের চলচ্চিত্র গ্রাহক ও চিত্রগ্রাহক তিয়ান জেমিন প্রায় দুই দশক ধরে চলচ্চিত্র শিল্পে কাজ করছেন। তবে তিনি এখন বেকার।

সামাজিক মাধ্যমে তিনি লিখেছেন, “একটি সফটওয়্যার দেবে, সেটি দেখার জন্য ছয়টি বছর হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে চিত্রগ্রাহক হয়েছিলাম আমি।”

গার্ডিয়ানকে তিনি বলেছেন, “ভেবেছিলাম পুরো জীবনটা এ ইন্ডাস্ট্রিতেই কাটিয়ে দেব। তবে এআইয়ের আবির্ভাব আমাকে জীবনের প্রথম বড় ধাক্কাটা দিয়েছে।” 

চলচ্চিত্র শিল্পে এআইয়ের প্রসার বাড়ায় তিয়ানের অনেক সহকর্মীই আজ কাজ হারাচ্ছেন। ফ্রিল্যান্সার হিসেবে তার নিজের আয়ও ২০১৯ সালের তুলনায় প্রায় ৬০ শতাংশ কমেছে।

এআইয়ের বিস্ময়কর গতিতে তিনি স্তম্ভিত হলে বলেছেন, “গেল বছরও এআই অদ্ভুত চেহারার অ্যাভাটার তৈরি করত। আর এখন একদম নিখুঁত ডিজিটাল ক্লোন তৈরি করতে পারে, যা দিয়ে পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র বানিয়ে ফেলা সম্ভব। আমাদের প্রতিক্রিয়া জানানোর সুযোগটুকুও মেলেনি।”

অনেক বিশ্লেষকের মতে, যেখানে ব্যক্তি খাতের ওপর সরকারের জোরালো নিয়ন্ত্রণ রয়েছে, সেখানে চীন যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে ভালোভাবে এআইজনিত কর্মসংস্থান সংকট সামাল দিতে পারবে। যেমন, বেইজিং চাইলেই বিভিন্ন কোম্পানিকে নির্দিষ্ট সংখ্যক কর্মী নিয়োগের কোটা বাস্তবায়নে বাধ্য করতে পারে।

তবে তিয়ান জেমিনের মতো কর্মীদের জন্য সরকারের এই সুরক্ষা হয়ত খুব একটা সময়োপযোগী হবে না। আক্ষেপের সুরে তিনি বলেছেন, “আমরা যে কোনো মুহূর্তে প্রতিস্থাপিত হতে পারি। হয়ত আমাদের একমাত্র করণীয় যত দ্রুত সম্ভব খাপ খাইয়ে নেওয়া এবং এআই এখনও যে কোণটিতে পৌঁছাতে পারেনি তা খুঁজে বের করা। তবে সেই জায়গা দিন দিন আরও ছোট হয়ে আসছে।”