Published : 15 Apr 2026, 02:36 PM
ভবিষ্যতের সুপার-ফাস্ট প্রযুক্তির লড়াইয়ে এখন বেশ এগিয়ে ফ্রান্সসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশ। প্যারিসের আধুনিক ল্যাব থেকে শুরু করে নতুন সব স্টার্টআপ সবাই মিলে চেষ্টা করছে এমন শক্তিশালী কম্পিউটার তৈরির, যা পরিচিত বিজ্ঞান ও চিকিৎসা জগতকে আমূল বদলে দেবে।
বিবিসি লিখেছে, দীর্ঘ সময় পিছিয়ে থাকার পর কোয়ান্টাম বিপ্লবের মাধ্যমে প্রযুক্তি বিশ্বে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের এক বড় সুযোগ এখন ইউরোপের সামনে।
প্যারিসের পশ্চিম প্রান্তের এক গবেষণাগার রেমী নামে একজন টেকনিশিয়ান একটি মেশিন নিয়ে কাজ করছেন। মেশিনটি দেখতে অনেকটা সোনালি ও রূপালি রঙের সিলিন্ডারের ঝরণার মতো, যার আশপাশ দিয়ে তারের জাল ছড়িয়ে আছে।
মেশিনটি ‘ক্রায়োস্ট্যাট’ নামের এক যন্ত্র, যা কোনো কিছুকে এতটাই শীতল করতে পারে যে অণু-পরমাণুর নড়াচড়াও ধীর হয়ে যায়। এর নিচের দিকের সিলিন্ডারের তাপমাত্রা থাকে মাইনাস ২৭৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এ তাপমাত্রায় ক্ষুদ্রতম বিভিন্ন কণাও স্থির হয়ে যায়। বাইরের জগতের সঙ্গে এর যোগাযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন থাকে।
এ সিলিন্ডারের ভেতর সোনালী ও রূপালি রঙের ছোট এক কেইস রাখা আছে, যার মধ্যে ঢোকানো থাকে একটি চিপ, যেটি আরও ছোট আকারের একটি বাক্স, যার ভেতরে আলবার্ট আইনস্টাইন ও অন্যান্য পদার্থবিজ্ঞানীদের আবিষ্কৃত সেই অদ্ভুত ঘটনাটি ঘটে, যা আমাদের চেনা জগতের বিভিন্ন নিয়মকে প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে।
একে বলে ‘কোয়ান্টাম লিপ’, যেখানে বিভিন্ন কণা এমনভাবে শক্তির স্তর পরিবর্তন করে, যা আগে থেকে বোঝা ও বারবার ঘটানো যায়। অথচ সাধারণ বিচারে তা অসম্ভব বলে মনে হয়।
আশপাশে লম্বালম্বিভাবে বেশ কিছু সিলিন্ডার রয়েছে, যেগুলো দেখতে অনেকটা ভিন্ন ভিন্ন আকারের ওয়াটার হিটারের মতো। এগুলোর প্রত্যেকটির ভেতরেই একটি করে ক্রায়োস্ট্যাট রয়েছে। এসব মেশিনের আরেকটি নাম হচ্ছে, কোয়ান্টাম কম্পিউটার।
কারখানাটি ‘অ্যালিস অ্যান্ড বব’ নামে ফ্রান্সের এক কোম্পানির যারা কোয়ান্টাম কম্পিউটার তৈরি করে। আগামী কয়েক মাসের মধ্যে তারা প্যারিসের উত্তরে ৫ লাখ ডলার ব্যয়ে আরও বড় এক কারখানা চালু করতে যাচ্ছে। সেখানে বড় বড় মেশিন পরীক্ষার সুযোগ এবং একটি ‘ক্লিন রুম’ থাকবে, যেখানে তারা নিজস্ব চিপ তৈরি করবে।
‘অ্যালিস অ্যান্ড বব’ নামটা শুনে আইসক্রিম কোম্পানি মনে হলেও এ স্টার্টআপের প্রাণচঞ্চল পরিবেশে কাজ করা ২০০ জন তরুণের (যাদের বয়স ২০ থেকে ৩০-এর কোঠায়) দলটি গম্ভীর ও জটিল বিজ্ঞান নিয়ে কাজ করছে।
কোম্পানির সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও থিও পেরোনিন বলেছেন, খুব শিগগিরই তারা ব্যবসায়িক জগতেও বড় ভূমিকা রাখতে শুরু করবেন।
“একসময় পদার্থবিজ্ঞানীরা সন্দেহ করতেন, কোয়ান্টাম স্তরে বিভিন্ন কণার অদ্ভুত আচরণকে কাজে লাগানো সম্ভব কি না। এখন তারা আর এমনটা ভাবেন না।
“আমরা এখন জানি, এগুলো কাজ করে। আর আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই আমাদের কাছে নির্ভরযোগ্য কোয়ান্টাম কম্পিউটার থাকবে, যা ডেটা সেন্টারের হাই-পারফরম্যান্স কম্পিউটারের সঙ্গে যোগ করে তাদের কাজের গতি বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হবে।

“এ কেবল দ্রুততর হওয়ার বিষয় নয়, বরং বিস্ময়কর মাত্রায় দ্রুত হওয়া, যা যে কোনো কাজের সম্ভাব্যতাকেই বদলে দেবে। আমরা এমন সব সমস্যার সমাধান করতে পারব, যা সাধারণ কম্পিউটারের পক্ষে করা একেবারেই অসম্ভব।
“যেমন, কোয়ান্টাম কম্পিউটার চিকিৎসাবিজ্ঞানকে নিখুঁত এক বিজ্ঞানে পরিণত করবে।”
কোয়ান্টাম কম্পিউটারের মাধ্যমে বড় সব গাণিতিক হিসাব বা ‘কম্পিউট’ করা সম্ভব হবে। ফলে বিভিন্ন অণু একে অপরের সঙ্গে কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায় তা নিখুঁতভাবে দেখা যাবে, যার মাধ্যমে কোন ওষুধটি কাজ করবে ও এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আগেভাগেই জানা সম্ভব হবে।
এ কারণে যে কোম্পানি সবার আগে বড় আকারের এক নির্ভরযোগ্য কোয়ান্টাম কম্পিউটার তৈরি করতে পারবে, তাদের জন্য পুরস্কারটিও হবে বড়।
পেরোনিনের মতে, সাধারণ কম্পিউটারের ক্ষেত্রে আইবিএম যেমন একাই বাজার দখল করেছিল, এখানেও তেমনি ‘বিজয়ীই সব পাবে’। তার ধারণা, সেই বিজয়ী হওয়ার দৌড়ে তার কোম্পানি বা অন্য কোনো ফরাসি কোম্পানির বেশ ভালো সম্ভাবনা রয়েছে।
কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ের সবচেয়ে বড় বাধা এর ভঙ্গুরতা বা নাজুক অবস্থা, যার ফলে ভুল হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
প্রচলিত বিভিন্ন কম্পিউটার সিলিকন চিপের ভেতরে বিদ্যুৎ ব্যবহার করে হিসাব-নিকাশ করে। তবে কোয়ান্টাম কম্পিউটারে এ কাজটি করে কিউবিট দিয়ে, যেখানে প্রতিটি কিউবিটে একটি ইলেকট্রন বা ফোটনের কোয়ান্টাম বৈশিষ্ট্যগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়।
গবেষকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, বাইরের জগতের সামান্যতম ‘নয়েজ’ বা ডিস্টার্বেন্সের কারণে এসব কিউবিট এদের সূক্ষ্ম কোয়ান্টাম অবস্থা হারিয়ে ফেলে, যাকে বৈজ্ঞানিক ভাষায় বলে ‘ডিকোহিয়ারেন্স’।
পেরোনিন বলেছেন, বেশিরভাগ কোম্পানি এ সমস্যা সমাধানের জন্য অনেক পরিমাণে অতিরিক্ত কিউবিট ব্যবহার করে, অর্থাৎ ‘লজিক্যাল’ কিউবিটের জন্য হাজার হাজার ফিজিক্যাল কিউবিট ব্যবহৃত হয় এবং ‘ভোট’ নেওয়ার মতো পদ্ধতিতে ভুল সংশোধন হয়। ফলে কম্পিউটারের আকার ও খরচ দুটোই আকাশচুম্বী হয়ে যায়।
‘অ্যালিস অ্যান্ড বব’ এক্ষেত্রে ভিন্ন পথ বেছে নিয়েছে। তাদের উদ্ভাবিত শ্রেডিঙ্গারের বিড়ালের নামানুসারে ‘ক্যাট কিউবিটস’ এমনভাবে তৈরি হয়েছে, যা নিজে থেকেই কিছু ভুল সংশোধন করতে পারে।
পেরোনিন বলেছেন, “এমনটি এর গঠনের মধ্যেই বিল্ট-ইন থাকে। আমরা এমন এক উপায় বের করেছি, যাতে কণা বা শক্তির বিভিন্ন ক্ষতি অনবরত নিজে থেকেই পুষিয়ে যায়।”
তত্ত্বীয়ভাবে, এমনটা অন্যান্য প্রতিযোগী কোম্পানির তুলনায় প্রক্রিয়ার জটিলতা ও খরচ নাটকীয়ভাবে কমিয়ে আনবে।
পেরোনিন বলেছেন, বড় বিভিন্ন কোম্পানিও এখন একই ধরনের ভাবনার দিকে ঝুঁকছে। যেমন, গুগল ‘আটলান্টিক কোয়ান্টাম’ কিনেছে, আবার অন্যরা ক্যাট কিউবিটের কাছাকাছি প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে। অ্যালিস অ্যান্ড বব এখন তাদের মার্কিন প্রতিযোগী বিভিন্ন কোম্পানির সঙ্গে ‘কাঁধে কাঁধ’ মিলিয়ে লড়ছে।
তবে ফ্রান্সে কেবল ‘অ্যালিস অ্যান্ড বব’ই নয়, বরং আরও অনেক কিছু রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, দেশটির বিভিন্ন কোম্পানি কিউবিটের সবকটি ধরন নিয়েই কাজ করছে, যেসব পথ ধরে পদার্থবিজ্ঞানীরা প্রথম নির্ভরযোগ্য ও শক্তিশালী কোয়ান্টাম কম্পিউটার তৈরির আশা করছেন।
শিক্ষাবিদ ওলিভিয়ের এজরত্তির দেড় হাজার পৃষ্ঠার সংকলন ‘আন্ডারস্ট্যান্ডিং কোয়ান্টাম টেকনোলজিস’ ইন্টারনেটে বেশ জনপ্রিয়।
তিনি বলেছেন, “আপনি যদি ফ্রান্সের কোয়ান্টাম কম্পিউটিং জগতের দিকে তাকান, দেখবেন এই মুহূর্তে আমাদের ছয়টি কোম্পানি রয়েছে এবং আরও দুটি তৈরি হচ্ছে।”
তার মতে, ‘পাসকাল’, ‘কোয়ান্ডেলা’, ‘কোবলি’ ও ‘সি১২’ নামে ফ্রান্সে আরও চারটি ‘গুরুত্বপূর্ণ’ কোয়ান্টাম কম্পিউটিং কোম্পানি রয়েছে।
এজরত্তি বলেছেন, এসব কোম্পানির সাধারণ সুবিধা রয়েছে। ‘এদের বেশিরভাগই মেশিনের নির্মাণ খরচ ও বিদ্যুৎ খরচের দিক থেকে খুব সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে’।
ইউরোপের অন্যান্য অঞ্চলের মধ্যে ফিনল্যান্ডের ‘আইকিউএম’ সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী, যারা গত ফেব্রুয়ারিতে ঘোষণা করেছে, ইউরোপের শেয়ারবাজারে প্রথম তালিকাভুক্ত কোয়ান্টাম কোম্পানি হতে যাচ্ছে তারা।
যুক্তরাজ্যের দুটি উল্লেখযোগ্য কোম্পানি হচ্ছে ‘অক্সফোর্ড কোয়ান্টাম সার্কিটস’ বা ওকিউএম ও কোয়ান্টাম অপারেটিং সিস্টেম নির্মাতা ‘রিভারলেন’।
আইকিউএম ও পাসকাল-এর বিভিন্ন কোয়ান্টাম কম্পিউটার এরইমধ্যে ইউরোপজুড়ে হাই-পারফরম্যান্স কম্পিউটিং কেন্দ্রগুলোতে অবদান রাখছে।
কিছু ফরাসি কোম্পানির কোয়ান্টাম কম্পিউটার এরইমধ্যে ‘এয়ার লিকুইড’-এর মতো শিল্পপণ্য উৎপাদনকারী কোম্পানিতে যোগ হয়েছে। ‘অ্যালিস অ্যান্ড বব’-এর ক্ষেত্রেও শিগগিরই এমনটি ঘটতে যাচ্ছে।
তাদের এসব মেশিন কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ের সেই কাঙ্ক্ষিত পূর্ণ সক্ষমতা পাওয়ার জন্য এখনও পুরোপুরি প্রস্তুত নয়। তবে, এসব মেশিন বাইরের জগতের কাছে পৌঁছে দেওয়ার মানে বিশেষজ্ঞদের নতুন এক দল তৈরি করা, যারা ভবিষ্যতে আসল শক্তিশালী কম্পিউটারটি আসার সঙ্গে সঙ্গেই তা ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত থাকবেন।
পেরোনিন বলেছেন, “বর্তমানে আমাদের কাছে যে মেশিনটি আছে তা আপনার ফোনের চেয়ে বেশি শক্তিশালী নয়। আমরা এখন একদম শুরুর অংশে আছি।”
কোয়ান্টাম দৌড়ে ফ্রান্সের বেশ কিছু শক্তিশালী দিক রয়েছে। ‘ইকোল পলিটেকনিক’ ও ‘ইকোল নরমাল সুপারিওর’-এর মতো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও বিশ্বের অন্যতম সেরা পদার্থবিজ্ঞান শিক্ষা দেওয়া হয়।
পেরোনিন বলেছেন, “গত কয়েক বছরে কেবল ফরাসি পদার্থবিজ্ঞানীরাই তিনটি নোবেল পুরস্কার জিতেছেন!” বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এ প্রতিযোগিতার ময়দানটি সবার জন্য সমান।
“দিনশেষে কোয়ান্টাম কম্পিউটার তৈরি এক গাণিতিক চ্যালেঞ্জ। সাধারণ কম্পিউটিংয়ের মতো পুরানো প্রযুক্তির ক্ষেত্রে কোনো বিশেষ বাড়তি সুবিধা পাওয়ার সুযোগ এখানে নেই। ফলে পিছিয়ে থাকার বা সংকোচের কোনো কারণ নেই।”
পেরোনিনের মতে প্রধান চ্যালেঞ্জ হচ্ছে পুঁজি বা মূলধন জোগাড়।
তিনি বলেছেন, “তবে ইউরোপ নিশ্চিতভাবেই দরিদ্র নয়। ইউরোপের জন্য এ এক প্রযুক্তিগত সুযোগ, যার মাধ্যমে আমরা আমাদের স্বায়ত্তশাসিত কৌশল ও অর্থনৈতিকভাবে শীর্ষস্থানে থাকার সক্ষমতাকে নতুন করে সাজাতে পারি।”
একটি জোরালো ধারণা প্রচলিত রয়েছে যে, সাম্প্রতিক বছরগুলোর অনেক প্রযুক্তিগত বিপ্লবই ইউরোপের হাতছাড়া হয়েছে, বিশেষ করে গবেষণা থেকে শিল্প পর্যায়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে। তবে এবার পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে।
“জেতার জন্য যা যা প্রয়োজন, তার সবটুকুই আমাদের আছে। এখন কেবল নিজেদের ওপর বিশ্বাস রাখা প্রয়োজন। ফরাসি হিসেবে আমরা সবসময় আমেরিকানদের অতি-আত্মবিশ্বাস নিয়ে কিছুটা ঠাট্টা করি তবে এখানে আমাদের নিজেদেরও কিছুটা আশাবাদী ও সাহসী হতে হবে।
“তা না হলে কিছুই ঘটবে না। আর সেটা হবে বড়ই পরিতাপের বিষয়। কারণ এ মুহূর্তে যতটা ভাবা হয়েছিল আমরা তার চেয়ে বেশি সুবিধাজনক অবস্থানে আছি।”