১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

আক্রমণ ভোলে না কাক: ক্ষোভ পুষে রাখে ১৭ বছর, শেখায় ছানাদেরও

কেউ এদের কোনো একটির ক্ষতি করলে বছরের পর বছর এরা ওই ব্যক্তির মুখ মনে রাখে ও দলের অন্যান্য সদস্যদের কাছেও সেই খবর পৌঁছে দেয়।

আক্রমণ ভোলে না কাক: ক্ষোভ পুষে রাখে ১৭ বছর, শেখায় ছানাদেরও
কালো ও উজ্জ্বল পালকের এসব বড় আকারের পাখি মানুষের শহরের সঙ্গে দারুণভাবে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিয়েছে। ছবি: ম্যাগনিফিক

প্রযুক্তি ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 29 Aug 2026, 06:07 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:55 PM

একবার আক্রমণ করলে মানুষের মুখ কখনও ভোলে না কাক। ১৭ বছর ধরে মনের মধ্যে সেই ক্ষোভ জমিয়ে রাখতে পারে এরা। এ তিক্ত অভিজ্ঞতা কাক নিজের ছানা ও দলের অন্যান্য সদস্যদের মধ্যেও ছড়িয়ে দেয়।

ফলে মূল ঘটনার সময়ে সেখানে উপস্থিত ছিল না বা অপরাধীকে চাক্ষুষ দেখেনি এমন কাকও পরবর্তীতে অপরাধীকে দেখামাত্রই তাড়া করতে শুরু করে বলে উঠে এসেছে সাম্প্রতিক এক গবেষণায়।

উত্তর আমেরিকার প্রায় প্রতিটি এলাকাতেই কাকের দেখা মেলে। কালো ও উজ্জ্বল পালকের এসব বড় আকারের পাখি মানুষের শহরের সঙ্গে দারুণভাবে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিয়েছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সাইট সায়েন্স ব্লগ।

গাছপালা, টেলিফোনের তার বা পার্কের মধ্যে অলস ভঙ্গিতে বসে এরা মানুষকে খেয়াল করে। আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ তাকানো মনে হলেও কাক কিন্তু সত্যি সত্যিই খুব সূক্ষ্মভাবে নিজেদের আশপাশের পরিবেশ ও মানুষকে পর্যবেক্ষণ করে চলেছে, যা অনেকেই উপলব্ধি করতে পারেন না।

কেউ এদের কোনো একটির ক্ষতি করলে বছরের পর বছর এরা ওই ব্যক্তির মুখ মনে রাখে ও দলের অন্যান্য সদস্যদের কাছেও সেই খবর পৌঁছে দেয়। ঘটনার খবর অন্যদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার এ বৈশিষ্ট্যটির বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা আবিষ্কার করতে বিজ্ঞানীদের বেশ কিছুটা সময় লেগেছে।

একটি কাক তার ক্ষতি করা মানুষকে মনে রাখবে এমনটা মেনে নেওয়া সহজ। তবে সেই কাক যে তার ছানাদেরও ওই নির্দিষ্ট চেহারা চিনে রাখার তালিম দেয় আর ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী না হয়েও দলের অন্য কাকেরা সংকেত বুঝে সেই চেহারা মুখস্থ করে নেয় তা বিশ্বাস করা কঠিন।

এ কারণেই, কোনো এক সময় অপকর্ম করার পর দশক পেরিয়ে গেলেও পার্ক দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় এমন সব তরুণ কাকের আক্রমণের মুখে পড়তে হয় যাদের ওই সময়ে জন্মই হয়নি।

যুক্তরাষ্ট্রের ‘ইউনিভার্সিটি অফ ওয়াশিংটন’ ক্যাম্পাসে বিগত দুই দশক ধরে চালানো মাঠপর্যায়ের গবেষণার তথ্যে ঠিক এমন চিত্রই উঠে এসেছে।

যেভাবে ধরা পড়ল কাকের স্মৃতিশক্তি

‘ইউনিভার্সিটি অফ ওয়াশিংটন’-এর ‘স্কুল অফ এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড ফরেস্ট সায়েন্সেস’-এর গবেষক ড. জন মারজলুফ, জেফ ওয়ালস, হিদার কর্নেল, জন উইথি ও ডেভিড ক্রেইগের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত ২০১০ সালের এক গবেষণা ‘অ্যানিম্যাল বিহেইভিয়ার’ সাময়িকীতে প্রকাশ পায়।

‘লাস্টিং রিকগনিশন অফ থ্রেটেনিং পিপল বাই ওয়াইল্ড আমেরিকান ক্রোস’ শিরোনামে এ গবেষণায় বিশেষ এক প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হয়েছিল। বুনো কাক কি মাত্র একবারের বাজে অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে কোনো নির্দিষ্ট মানুষের চেহারা চিনে রাখতে পারে ও সেই স্মৃতি কি দীর্ঘস্থায়ী হয়?

এ গবেষণার ধরন নিখুঁত ও বুদ্ধিদীপ্ত ছিল। চেহারা ছাড়া অন্য কোনো সূত্র যেন কাকের ওপর প্রভাব ফেলতে না পারে সেজন্য গবেষকেরা কয়েকটি লেটেক্স মাস্ক বা মুখোস বেছে নিয়েছেন।

‘ট্র্যাপিং’ বা ফাঁদে ফেলার জন্য ভীতিজনক ও কিম্ভুতকিমাকার গুহামানবের মাস্ক নির্ধারণ করেছিলেন গবেষকরা। অন্যদিকে সাধারণ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য কিছু স্বাভাবিক মাস্ক নির্বাচন করা হয়।

সিয়াটলের পাঁচটি ভিন্ন স্থানে গবেষণাদলের সদস্য গুহামানবের মাস্ক পরে ৭ থেকে ১৫টি কাককে ধরেন, সেগুলোর পায়ে শনাক্তকরণ ব্যান্ড পরিয়ে পরে এদের ছেড়ে দিয়েছেন। কোনো কাককে বিরক্ত না করে স্বাভাবিকভাবে চলাফেরার সময় সাধারণ বিভিন্ন মাস্ক ব্যবহার করা হত।

এরপর গবেষকেরা ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন।

ফলাফল ছিল স্পষ্ট ও নির্ভুল। গুহামানবের মাস্ক পরা অবস্থায় যাদের ধরা হয়েছিল এরা পরবর্তীতে সেই একই মাস্ক পরা যে কোনো মানুষকে দেখামাত্রই চিৎকার করে ভয়ংকর ডাঁক দেওয়া (যাকে অ্যাগ্রেসিভ অ্যালার্ম কল বলা হয়) এবং তেড়ে যাওয়া শুরু করে। অথচ সাধারণ মাস্ক পরা ব্যক্তিদের দেখে এদের কোনো প্রতিক্রিয়া মেলেনি।

এসব কাক কেবল নির্দিষ্ট ওই চেহারার ওপর নজর রাখছিল। ব্যক্তি পরিবর্তন হলেও প্রতিক্রিয়া একটুও কমেনি, যেখানে ভিন্ন বয়স, লিঙ্গ বা বর্ণের মানুষ সেই একই গুহামানবের মাস্ক পরলেও কাকদের আক্রমণাত্মক আচরণ ছিল একই রকম।

মাস্কটি উল্টো করে বা মাথায় টুপি পরে ঘুরলেও কাকদের সংকেতে কোনো ভুল হয়নি, অর্থাৎ, গুহামানবের মাস্কটির বৈশিষ্ট্যের বিন্যাস কাকদের মস্তিষ্কে গেঁথে গিয়েছিল। ফলে এটা যার মুখেই থাকুক না কেন কাকেরা তাকে এক বিপজ্জনক অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করছিল।

২০১০ সালের সেই গবেষণাপত্রে অন্তত ২ বছর ৭ মাস পর্যন্ত কাকেদের এ চিনে রাখার সক্ষমতার প্রমাণ মিলেছিল। তবে গবেষক দলটি সেখানেই থেমে থাকেনি। তাদের পরীক্ষাটি বছরের পর বছর চালিয়ে যাওয়া হয়।

প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে কাকের স্মৃতির আদান-প্রদান

পরবর্তী বিভিন্ন গবেষণায় যে তথ্যটি উঠে আসে তা এই পুরো বিষয়টিকে আরও বিস্ময়কর ও আকর্ষণীয় করে তুলেছে। কাকের এ চেহারা চিনে রাখার সক্ষমতা কেবল ফাঁদে পড়া নির্দিষ্ট পাখিগুলোর মধ্যেই আটকে ছিল না।

২০১১ সালে গবেষক হেদার কর্নেল, জন মারজলুফ ও শ্যানন পেকারোর এক ফলো-আপ গবেষণা ‘প্রসিডিংস অব দ্য রয়াল সোসাইটি বি’তে ‘সোশ্যাল লার্নিং স্প্রেডস নলেজ অ্যাবাউট ডেঞ্জারাস হিউম্যানস এমং আমেরিকান ক্রোস’ শিরোনামে প্রকাশ পায়।

এ গবেষণায় উঠে এসেছে, গবেষক দলটি পরবর্তী পাঁচ বছর ধরে একই এলাকায় ফিরে গিয়ে স্থানীয় কাকদের মধ্যে এ ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ার মানচিত্র তৈরি করেছেন।

গবেষণায় তথ্য ছড়িয়ে পড়ার তিনটি ভিন্ন মাধ্যমের কথা উঠে আসে। প্রথমত, যেসব কাক সরাসরি ধরা পড়েছিল এরা সেই চেহারা সরাসরি মনে রেখেছিল। দ্বিতীয়ত, যেসব কাক নিজে ধরা না পড়লেও গবেষকদের হাতে প্রতিবেশীদের বন্দি হতে দেখে ওপর থেকে চিৎকার করেছিল, তারাও সেই চেহারা চিনে নিয়েছে।

তৃতীয়ত, যেসব কনিষ্ঠ কাক কোনোদিন ট্র্যাপিংয়ের শিকার হয়নি এরাও মাস্ক পরা গবেষকের উপস্থিতিতে বাবা-মাকে চিৎকার করতে দেখে কেবল অনুকরণের মাধ্যমেই সেই চেহারা চিনে ফেলে।

পাঁচ বছরের মধ্যে কাকদের এ তেড়ে আসার প্রবণতা দ্বিগুণ হয়ে যায় ও মূল ট্র্যাপিং স্থান থেকে অন্তত ১ দশমিক ২ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।

ওই সময়ের এক পর্যবেক্ষণ যাত্রায় গবেষক মারজলুফ দেখেছেন, বিপজ্জনক মাস্কটি পরা অবস্থায় তার মুখোমুখি হওয়া ৫৩টি কাকের মধ্যে ৪৭টিই তার ওপর চড়াও হয়ে চিৎকার করছিল, অথচ তিনি শুরুতে কেবল ৭টি কাক ধরেছিলেন!

২০১১ সালের প্রতিবেদনের পরও এই পরীক্ষা থামেনি। ‘ইউনিভার্সিটি অফ ওয়াশিংটন’-এর ‘Urban@UW’ গবেষণা সংবাদ মাধ্যমের তথ্য অনুসারে, ২০০৬ সালের মূল ট্র্যাপিংয়ের প্রায় সাত বছর পর অর্থাৎ ২০১৩ সালে ক্যাম্পাসে এ বিপজ্জনক মাস্কের প্রতি কাকদের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ সবচেয়ে তীব্র হয়ে ওঠে।

এর পর থেকে ধীরে ধীরে প্রতিক্রিয়া কমতে থাকে। কারণ ফাঁদে পড়া মূল কাক ও তাদের কাছ থেকে শিক্ষা নেওয়া প্রথম প্রজন্মের কাকগুলো বয়সজনিত কারণে মারা যেতে শুরু করে।

অবশেষে পরীক্ষা শুরুর ১৭ বছর পর, ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে মারজলুফ সেই গুহামানবের মাস্ক পরে ক্যাম্পাসজুড়ে হেঁটে গেলেও এবার আর একটি কাকও তাঁকে দেখে চিৎকার করেনি বা তেড়ে আসেনি। বুনো পরিবেশে ১৫ থেকে ২০ বছর আয়ু পাওয়া ককেদের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ অবশেষে শেষ হয়েছিল।

এখান থেকেই এসেছে সেই ‘১৭ বছর’ ধরে ক্ষোভ পুষে রাখার হিসাবটি। তবে এর মানে এই নয় যে, কোনো একটি নির্দিষ্ট কাক টানা ১৭ বছর ধরে প্রচণ্ড রেগে ছিল। বরং ২০০৬ সালে সিয়াটলের একদল কাকের অভিজ্ঞতায় যে বিপজ্জনক মানুষের মুখের ছবি গেঁথে গিয়েছিল, সামাজিকভাবে আদান-প্রদানের মাধ্যমে কাকদের সমাজে ২০২৩ সাল পর্যন্ত সেই স্মৃতি বংশানুক্রমে প্রবাহিত হয়েছে।

এর মাঝের বছরগুলোতে ‘ইউনিভার্সিটি অফ ওয়াশিংটন’ ক্যাম্পাসের ওই অংশের প্রতিটি কাক এমন এক চেহারা চিনে নিয়েছিল, যা এদের সরাসরি কখনও দেখানোই হয়নি।

এরা বিষয়টি শিখেছিল এদের বাবা-মা ও দলের অন্যান্য সদস্যদের থেকে, যাদের শিক্ষার সূত্রপাত ঘটেছিল রাবারের মাস্ক পরা গবেষকদের হাতে ধরা পড়া সেই মূল সাতটি কাকের মাধ্যমে।

কারো বাড়ির আশপাশে যদি কাকের আনাগোনা থাকে তবে এই গবেষণা তার জন্য খানিকটা অস্বস্তিকর বাস্তবতার জন্ম দিতে পারে। মাঠপর্যায়ের সব ধরনের প্রমাণ বলছে, এরা আপনাকে সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। আপনি যদি কোনো কাকের প্রতি ক্ষতিকর আচরণ করেন, তবে সেই কাক আপনাকে মনে রাখবে।

আপনার প্রতি তার প্রতিক্রিয়া দেখে আশপাশের অন্যান্য কাকও আপনাকে চিনে নেবে। পরবর্তীতে তাদের ছানারাও এই শত্রু চেনার শিক্ষা নিয়ে বেড়ে উঠবে। আপনি হয়ত মূল ঘটনাটি ভুলেই যাবেন তবে কাকেরা ঠিকই মনে রাখবে এবং বন্য পরিবেশে ১৫ থেকে ২০ বছর আয়ুর এ পাখিরা আপনার ধারণার চেয়েও বেশি সময় ধরে এ শত্রুতা ধরে রাখতে পারবে।