Published : 25 Nov 2025, 10:34 AM
চার বছর আগে নিষিদ্ধ হলেও চীনে চুপিসারে আবার সক্রিয় হচ্ছে বিটকয়েন খনন বা মাইনিং। সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ ব্যবহার করে ও চীনের শক্তিসমৃদ্ধ কিছু প্রদেশে ডেটা সেন্টার বৃদ্ধির চাহিদাকে কাজে লাগাচ্ছে খনি পরিচালনায় থাকা বিভিন্ন ব্যক্তি ও কোম্পানি।
২০২১ সালের আগে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রিপ্টো খনির দেশ ছিল চীন। দেশটির আর্থিক স্থিতিশীলতা ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণের হুমকির কথা উল্লেখ করে ওই সময় বেইজিং সব ধরনের ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেন ও মাইনিং নিষিদ্ধ করেছিল।
বিটকয়েন মাইনিং কার্যক্রম ট্র্যাকিং সাইট ‘হ্যাশরেট ইনডেক্স’ অনুসারে, এ নিষেধাজ্ঞার ফলে বিশ্বজুড়ে চীনের বিটকয়েন মাইনিং বাজারের শেয়ার শূন্যে নেমে আসে। এরপর অক্টোবরের শেষ নাগাদ ১৪ শতাংশ নিয়ে ধীরে ধীরে তৃতীয় স্থানে পৌঁছেছে চীন।
চীনের বিটকয়েন খনির এই পুনরুত্থান কেবল খনি কার্যক্রমেই নয়, বরং রিগ বা মাইনিং যন্ত্র উৎপাদক কোম্পানি ‘ক্যানান ইনকর্পোরেটেড’-এর চীনে বিক্রির হার বাড়তেও দেখা গিয়েছে। আর দেশটিতে মাইনিং বাড়লে তা বিটকয়েনের চাহিদা ও দামও স্থিতিশীল রাখতে সহায়ক হবে।
দেশটির সিনজিয়াং প্রদেশের এক খনির মালিক ওয়াং বলেছেন, গত বছরের শেষ দিকে এ শক্তিসমৃদ্ধ প্রদেশে মাইনিং শুরু করেছিলেন তিনি।
“সিনজিয়াং থেকে অনেক বিদ্যুৎ বাইরে পাঠানো যায় না। ফলে আপনি তা ক্রিপ্টো মাইনিংয়ের মাধ্যমে ব্যবহার করতে পারেন। আমার নতুন খনির প্রকল্প নির্মাণাধীন। আমি আসলে বলতে চাইছি, মানুষ সেখানেই মাইনিং করে যেখানে সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ মেলে।”
২০২১ সালে বিটকয়েন খনির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত পরিকল্পনা সংস্থা ‘ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড রিফর্ম কমিশন’। নতুন করে মাইনিং উত্থানের বিষয়ে রয়টার্সের মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি উত্তর-পশ্চিম চীনের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল সিনজিয়াংয়ের সরকার।
বেইজিং ২০২১ সালে এই খাতে কড়া পদক্ষেপ নেওয়ায় স্থানীয় কার্যক্রম বন্ধ করে উত্তর আমেরিকা ও মধ্য এশিয়ার মতো বিদেশি বাজারে চলে যেতে বাধ্য হয়েছিল মাইনিং মালিকরা।
রয়টার্স লিখেছে, চীনে বিটকয়ের মাইনিং পুনরুদ্ধারের ওই সময়ে অক্টোবরে বিটকয়েনের দামও রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছিল। এমনটি ঘটেছে মূলত দুই কারণে। ওই সময় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ক্রিপ্টোকারেন্সির পক্ষে নীতি নিয়েছিলেন এবং ডলারের ওপর মানুষের আস্থা কমেছিল। ফলে এখন আগের চেয়ে বেশি লাভজনক হয়ে উঠেছে বিটকয়েন মাইনিং।
তবে বিশ্বজুড়ে ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা কমে যাওয়ার কারণে সেই ক্রিপ্টোকারেন্সির দাম অক্টোবরে চূড়ান্ত মূল্যের তুলনায় প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কমেছে।
ক্রিপ্টো বাজারের অবকাঠামো সরবরাহকারী ‘পারপেচ্যুয়ালস ডটকম’-এর সিইও প্যাট্রিক গ্রুহন বলেছেন, “নির্দিষ্ট অঞ্চলে অর্থনৈতিক প্রণোদনা শক্তিশালী হলে চীনের নীতিতে নমনীয়তা দেখা যায়। চীনে মাইনিং কার্যক্রমের পুনরুত্থান ক্রিপ্টো বাজারের জন্য গত কয়েক বছরে দেখা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংকেত।”
চীনে খনি কার্যক্রম পুনরায় শুরুর বিষয়টি এ শিল্প সংক্রান্ত তথ্যের দিকে ইঙ্গিত দিচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, চীন এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে বিটকয়েন মাইনিং সংক্রান্ত নিয়ন্ত্রণ শিথিল করেনি। তবে ‘চীনের নীতি শিথিলের ইঙ্গিতও বিটকয়েনকে এক বৈশ্বিক, রাষ্ট্র-সহনশীল সম্পদ হিসেবে আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে’।
খনি মালিক ও রিগ নির্মাতারা বলছেন, শক্তি বেশি খরচ করা এমন এক প্রক্রিয়া বিটকয়েন মাইনিং, যেখানে বিশেষ কম্পিউটার ব্যবহার করে জটিল ধাঁধা সমাধান করে বিটকয়েন জেতা হয়। মাইনিং সবচেয়ে বেশি হয়ে থাকে সেইসব অঞ্চলে যেখানে সাশ্রয়ী ও অনেক বিদ্যুৎ রয়েছে, যেমন– সিনজিয়াং।
বিটকয়েন মাইনিং আবার বেড়ে যাওয়ার কারণে কেবল এই ডিজিটাল মুদ্রাটির দামই বাড়েনি, বরং কিছু চীনা স্থানীয় সরকারও অতিরিক্তভাবে ডেটা সেন্টারে অর্থ ঢালছে। ফলে সেখানে অনেক অতিরিক্ত বিদ্যুৎ ও কম্পিউটিং সক্ষমতা তৈরি হয়েছে। আর এ অতিরিক্ত সম্পদও মাইনিংয়ের পুনরুত্থানকে বাড়িয়ে তুলছে।
মাইনিং রিগ নির্মাতাদের বিক্রির তথ্যেও এর সত্যতা মিলেছে। কোম্পানিটির নথি অনুসারে, বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিটকয়েন মাইনিং যন্ত্র নির্মাতা ক্যানান গত বছর কোম্পানিটির বৈশ্বিক আয়ের ৩০ দশমিক ৩ শতাংশ চীন থেকে এসেছে, যেখানে ২০২২ সালে দেশটির কড়া পদক্ষেপের পর ছিল কেবল ২ দশমিক ৮ শতাংশ।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সূত্রের মতে, এ বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে ক্যানানের বিক্রিতে চীনের অবদান আরও বেড়ে ৫০ শতাংশের বেশি হয়েছে।