১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

অনীহা কাটিয়ে মডার্নার ফ্লু টিকার অনুমোদন দিল এফডিএ

এক সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে নিজেদের অবস্থান থেকে ১৮০ ডিগ্রি সরে এসে মডার্নার আবেদনটি পর্যালোচনায় রাজি হয়েছে এফডিএ।

অনীহা কাটিয়ে মডার্নার ফ্লু টিকার অনুমোদন দিল এফডিএ
২০২১ সাল থেকেই বিশ্বজুড়ে মানবদেহে এ টিকার বিভিন্ন ধাপের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চালানো হচ্ছিল। ছবি: মডার্না

প্রযুক্তি ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 06 Aug 2026, 08:57 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:48 PM

প্রাথমিকভাবে এমনকি আবেদন পর্যালোচনায় অস্বীকৃতি জানালেও শেষ পর্যন্ত সব বিতর্ক ও নাটকীয়তা কাটিয়ে মডার্নার তৈরি নতুন এমআরএনএ ফ্লু টিকার অনুমোদন দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফডিএ)।

সব আইনি ও বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া পেরিয়ে অবশেষে এ  অনুমোদন মিলল বলে প্রতিবেদনে লিখেছে প্রযুক্তি সংবাদের সাইট এনগ্যাজেট।

‘এমআরএনএ-১০১০’ কোড নামের এই টিকা ইনফ্লুয়েঞ্জার সবচেয়ে মারাত্মক ও বহুল প্রচলিত চারটি স্ট্রেইনের বিরুদ্ধে উচ্চ প্রতিরোধ গড়ে তুলবে।

২০২১ সাল থেকেই বিশ্বজুড়ে মানবদেহে টিকাটির বিভিন্ন ধাপের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চলছিল।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০১৭ সালের হিসেব অনুসারে, এ চারটি ভ্যারিয়েন্টের কারণেই প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে প্রায় ৫০ লাখ মানুষ তীব্র ফ্লু সংক্রান্ত শারীরিক জটিলতায় ভোগেন এবং এর পরিণতিতে ৬ লাখ ৫০ হাজার মানুষের শ্বাসতন্ত্রের ব্যাধিতে মৃত্যু হয়।

এফডিএ-এর সিদ্ধান্ত অনুসারে, টিকাটি ৫০ বছর বা তার বেশি বয়সীদের দেহে ব্যবহারের জন্য অনুমোদিত হয়েছে।

মডার্না বলেছে, বিশ্বের ১১টি দেশে ৪০ হাজার ৮০৫ জন মানুষের ওপর পরিচালিত বিস্তৃত পরিসরে তৃতীয় ধাপের ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের তথ্য জমা দেওয়ার পর ৫০ থেকে ৬৪ বছর বয়সীদের ব্যবহারের অনুমোদন মিলল।

পাশাপাশি ৬৫ বছর ও তার বেশি বয়সী প্রবীণদের জন্য বিশেষ প্রক্রিয়ায় এ প্রতিষেধকের ট্রায়াল সুবিধা দেওয়া হয়, যেখানে বর্তমানে প্রচলিত ও অনুমোদিত ‘নন-এমআরএনএ’ ফ্লু টিকার তুলনায় ‘এমফ্লুসিভা’র সার্বিক নিরাপত্তা ও আপেক্ষিক কার্যকারিতা যাচাই করাই ছিল এ বড় পরীক্ষার মূল লক্ষ্য।

গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণ করে মডার্নার গবেষক দলটি চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বলেছে, “৫০ বছর বা তার বেশি বয়সীদের ক্ষেত্রে এই টিকা বেশি কার্যকারিতা দেখিয়েছে।”

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমান ফ্লু নানা টিকার তুলনায় এমআরএনএ-১০১০ নেওয়ার পর ইনজেকশন দেওয়ার স্থানে ব্যথা, শারীরিক ক্লান্তি, মাথাব্যথা ও মায়ালজিয়া বা মাংসপেশির ব্যথার মতো ‘অনাকাঙ্ক্ষিত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া’ তুলনামূলক বেশি দেখা গেছে।

“এসব পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার অধিকাংশই ছিল মৃদু থেকে মাঝারি ধরনের এবং তা খুবই সাময়িক।”

প্রাথমিকভাবে আবেদনটি পর্যালোচনা করতেও সরাসরি অস্বীকৃতি জানিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের এফডিএ। এতে মডার্নার নতুন ফ্লু টিকার অনুমোদন প্রক্রিয়া শুরুতেই বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছিল।

এফডিএ শুরুতে দাবি করেছিল, গবেষণায় মডার্না যে ‘কম্পারেটর’ বা তুলনাযোগ্য টিকা ব্যবহার করেছে তা যুক্তরাষ্ট্রে প্রচলিত ‘সেরা চিকিৎসাসেবার মানদণ্ড’কে প্রতিফলিত করে না। প্রবীণদের জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির পছন্দ ছিল আরও বেশি মাত্রার কোনো প্রতিষেধক।

তবে এফডিএর ড্রাগ অ্যাপ্রুভাল বিভাগের পরিচালক ও বিজ্ঞানীদের সিদ্ধান্তকে বাতিল করে আবেদনটি নাকচ করায় শুরু হয় বিতর্ক। সমালোচকরা এই পদক্ষেপকে পুরোপুরি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলেও বর্ণনা করেছেন।

ওই সময় আইনের অধ্যাপক রিচার্ড হিউজ ব্রিটিশ পত্রিকা গার্ডিয়ানকে বলেছিলেন, “প্রচলিত বিজ্ঞানকে বাতিল করা ও পূর্বনির্ধারিত টিকা-বিরোধী রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নই যখন আসল উদ্দেশ্য, তখন এসব অজুহাত কেবলই সত্য গোপনের চেষ্টা।”

এক সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে নিজেদের অবস্থান থেকে ১৮০ ডিগ্রি সরে এসে মডার্নার আবেদনটি পর্যালোচনায় রাজি হয়েছে এফডিএ।

ধারণা করা হচ্ছে, নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি আগে মডার্নাকে যে আশ্বাস দিয়েছিল, কোম্পানিটির নির্বাচিত ‘কম্পারেটর’ বা তুলনাযোগ্য টিকাটি ট্রায়ালের জন্য উপযোগী, সেই আগের কথার কারণেই তারা সিদ্ধান্ত বদলাতে বাধ্য হয়েছে।

আবেদনটি বাতিলের আগে এফডিএ মডার্নাকে দেওয়া এক চিঠিতে বলেছিল, “আপনার ৩য় ধাপের গবেষণায় তুলনামূলক প্রতিষেধক হিসেবে অনুমোদিত মানসম্মত মাত্রার ইনফ্লুয়েঞ্জা টিকা ব্যবহার করা সম্পূর্ণ গ্রহণযোগ্য হবে বলে আমরা একমত।”

মডার্নাসহ অন্যান্য কোম্পানির ‘এমআরএনএ’ টিকাগুলো সাধারণত খুব দ্রুত ও সফলভাবে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল পেরিয়ে এসেছে। প্রচলিত টিকার তুলনায় এদের সহজাত কিছু বৈপ্লবিক বৈশিষ্ট্যই এদেরকে বেশি নিরাপদ ও কার্যকর করে তোলে।

এসব সুবিধার মধ্যে রয়েছে গুরুতর অসুস্থতা প্রতিরোধে উচ্চ কার্যকারিতা, দ্রুত প্রস্তুতের সক্ষমতা, ভাইরাসের নতুন ধরনের স্ট্রেইনের সঙ্গে দ্রুত খাপ খাইয়ে নেওয়া, জ্যান্ত ভাইরাস ছাড়াই উৎপাদন ব্যবস্থা, রোগ প্রতিরোধ সক্ষমতা কম থাকা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কম হওয়া এবং মানুষের ডিএনএ পরিবর্তনের কোনো ঝুঁকি ছাড়াই শক্তিশালী প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তোলার সক্ষমতা।

এমআরএনএ টিকার স্থায়িত্ব ও নিরাপত্তা নিয়ে ‘ন্যাশনাল কাউন্সিল অন এজিং’ বলেছে, “অতিরিক্ত সুবিধা হচ্ছে, এমআরএনএ প্রযুক্তি মানবদেহে দীর্ঘস্থায়ী হয়ে কোনো ধরনের ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে না। বাস্তবে, এমআরএনএ একবার কোষকে প্রোটিন তৈরির নির্দেশ পৌঁছে দেওয়ার পর খুব দ্রুতই তা ভেঙে দেহ থেকে বেরিয়ে যায়।