Published : 07 Aug 2026, 02:18 PM
চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পাথুরে পাহাড়ে সন্ধান মিলেছে এক বিরল পতঙ্গভুক বুনো ফুলের, যা মিষ্টি গন্ধে পোকা আকৃষ্ট করে আঠালো রোমে আটকে ফেলে এবং তাদের হজম করে পুষ্টি নেয়।
এ আবিষ্কারের মাধ্যমে চার্লস ডারউইনের ১৫০ বছর আগের এক বৈজ্ঞানিক অনুমান অবশেষে সত্য প্রমাণিত হল বলে প্রতিবেদনে লিখেছে রয়টার্স।
সাধারণ পতঙ্গদের জন্য আল্পাইন পর্বতমালার মনোরম কোনো ফুলকে শিকারি ভাবা কঠিন। তবে সম্প্রতি গবেষকরা চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পাথুরে পার্বত্য গুহায় এই বুনো ফুলের সন্ধান পেয়েছেন। উদ্ভিদবিদ্যার নির্দিষ্ট এই শ্রেণীতে নিশ্চিত হওয়া প্রথম মাংসাশী বা পতঙ্গভুক উদ্ভিদ এটাই।
উদ্ভিদটির বৈজ্ঞানিক নাম ‘স্যাক্সিফ্রাগা ক্যান্ডেলাব্রাম’, যা ‘সাক্সিফ্রাগেলস’ নামের ২ হাজারেরও বেশি প্রজাতির বৈচিত্র্যময় এক বোটানিক্যাল বর্গের অন্তর্গত।
চীনের কিংহাই-তিব্বত মালভূমি ও হেংদুয়ান পর্বতমালার আড়াই হাজার থেকে ৩ হাজার ৩০০ মিটার উচ্চতায় পুষ্টিহীন পাথুরে উপত্যকায় এ গাছ জন্মায়। লালচে রঙের আঠালো গ্রন্থিওয়ালা রোমে ঢাকা এ উদ্ভিদটি সহজেই ছোট ছোট পতঙ্গকে নিজের ফাঁদে আটকে ফেলে।
জলাভূমি বা ভেজা জমিতে ভেনাস ফ্লাইট্র্যাপ, পিচার প্ল্যান্ট বা সানডিউয়ের মতো পতঙ্গভুক উদ্ভিদের দেখা মেলে, যা মাটির পুষ্টির ঘাটতি মেটাতে পোকা শিকার করে। তবে কোনো উদ্ভিদকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘পতঙ্গভুক’ হিসেবে স্বীকৃতি পেতে হলে কেবল দুর্ঘটনাবশত পোকা আটকানোই যথেষ্ট নয়, শিকারকে আকর্ষণ করা, ফাঁদে ফেলা, হজম করা ও সেখান থেকে পুষ্টি উপাদান গ্রহণ করার মতো বিশেষ শারীরিক অভিযোজন থাকতে হয়।
১৮৭৫ সালে প্রকৃতিবিদ চার্লস ডারউইন ইউরোপের দুটি ‘সাক্সিফ্রাগা’ প্রজাতির আঠালো রোম ও তাতে আটকে থাকা পোকা দেখে ধারণা করেছিলেন, এরা হয়ত পতঙ্গভুক। তবে পরীক্ষার মাধ্যমে তিনি তা প্রমাণ করে যেতে পারেননি।
সম্প্রতি আবিষ্কৃত এ প্রজাতিটি ডারউইনের পর্যবেক্ষণ করা প্রজাতি দুটির থেকে আলাদা হলেও জিনগতভাবে বেশ কাছাকাছি এবং একই ধরনের পোকা ধরার বৈশিষ্ট্যের অধিকারী।
গবেষণাটি প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘নেচার কমিউনিকেশনস’-এ।
এ গবেষণার অন্যতম প্রধান গবেষক ও ‘চাইনিজ একাডেমি অফ সায়েন্সেস’-এর ‘কুনমিং ইনস্টিটিউট অফ বোটানি’র গবেষণা অধ্যাপক হ্যাং সান বলেছেন, “আমরা উদ্ভিদটির ওপর একাধিক পরীক্ষা চালিয়ে চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত হয়েছি, এটা খাঁটি পতঙ্গভুক উদ্ভিদ। এর থেকে প্রমাণ মেলে, ডারউইনের ধারণাই সঠিক ছিল ও তার বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণও সূক্ষ্ম ছিল।”
গাছটি সত্যিই পোকা থেকে পুষ্টি নিচ্ছে কি না তা পরীক্ষা করতে গবেষকরা বিশেষ এক পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন। তারা ল্যাবরেটরিতে নাইট্রোজেনের স্থিতিশীল আইসোটোপওয়ালা খাবারে বেড়ে ওঠা ফ্রুট ফ্লাই বা ফল মাছি ব্যবহার করেছেন।
হ্যাং সান বলেছেন, “উদ্ভিদের বেড়ে ওঠার জন্য নাইট্রোজেন অপরিহার্য। বেশিরভাগ মাংসাশী উদ্ভিদ নাইট্রোজেনের অভাব রয়েছে এমন স্থানে জন্মায় ও পতঙ্গ শিকার করে সেই ঘাটতি পূরণ করে।”
পরীক্ষাগারে এসব মাছিকে আঠালো রোমের ওপর ছেড়ে দেওয়ার পর নাইট্রোজেনের গতিবিধি ট্র্যাক করেন বিজ্ঞানীরা।
গবেষণার সহ-লেখক ও ‘ইউনিভার্সিটি অফ ফ্লোরিডা’র বোটানিস্ট ডগলাস সোলটিস বলেছেন, “চিহ্নিত করা নাইট্রোজেনটি শেষ পর্যন্ত গাছের ভেতরে প্রবেশ করে ও এর বিভিন্ন টিস্যুতে ছড়িয়ে পড়ে। উদ্ভিদটি সরাসরি পুষ্টি গ্রহণ না করলে এমনটা কোনোভাবেই সম্ভব হত না।”
বংশ বিস্তারই বাঁচার চাবিকাঠি
স্বাভাবিকভাবে সংগৃহীত পুষ্টি উপাদানগুলো গাছের সব অংশে সমানভাবে ছড়িয়ে পড়ে না। গবেষকরা বলছেন, শিকার করা পোকা থেকে পাওয়া নাইট্রোজেনের সবচেয়ে বড় অংশ জমা হয় ‘স্যাক্সিফ্রাগা ক্যান্ডেলাব্রাম’-এর ফুলে। এ প্রজাতির উদ্ভিদটি তার পুরো জীবদ্দশায় কেবল একবারই ফুল ফোটায় ও ফল দেয়।
বোটানিস্ট ডগলাস সোলটিস বলেছেন, “প্রজনন সক্ষমতার বিকাশের জন্যই সম্ভবত এ পুষ্টির প্রয়োজন। ফুল ও বীজের বিকাশ এবং বংশবিস্তারই এর টিকে থাকার মূল চাবিকাঠি।”
গবেষকরা বলছেন, গাছটি নিষ্ক্রিয়ভাবে বসে না থেকে সক্রিয়ভাবে শিকারকে আকর্ষণ করে। ফিল্ড টেস্টে দেখা গেছে, সুগন্ধ ছড়ানোর মাধ্যমে তা পোকাকে কাছে টানে। এর আঠালো রোমে পরিপাক এনজাইমের উপস্থিতি পাওয়া গেছে, যা শিকার করা পোকা হজমের সক্ষমতার চূড়ান্ত প্রমাণ।
পোকা শিকারের ঝুঁকিপূর্ণ দিকও রয়েছে। বেশিরভাগ মাংসাশী উদ্ভিদ প্রজননের জন্য পরাগায়নকারী পতঙ্গের ওপর নির্ভর করে। ফলে শিকার ধরতে গিয়ে নিজেদের পরাগায়নকারী বন্ধু পোকাকেই আটকে ফেলার ঝুঁকি থেকে যায়।
অধ্যাপক হ্যাং সান বলেছেন, “ফুলটির পরাগায়ন ঘটে অপেক্ষাকৃত বড় আকৃতির মাছি বা পতঙ্গের মাধ্যমে। আঠালো বিভিন্ন রোম বড় পোকাকে শক্তভাবে আটকে রাখতে পারে না। ফলে এরা সহজেই ডালপালা থেকে উড়ে পালিয়ে যেতে পারে। কেবল ছোট ছোট পোকাই এ ফাঁদে আটকে যায়। আসল পরাগায়নকারীদের কোনো ক্ষতি না করেই ক্ষুদ্র পোকাগুলো খেয়ে গাছটি এর প্রয়োজনীয় বাড়তি পুষ্টি যোগাড় করে।”
‘সাক্সিফ্রাগেলস’ বর্গের মধ্যে এখন পর্যন্ত এই একটি মাত্র প্রজাতিকেই পতঙ্গভুক হিসেবে নিশ্চিত করা গেছে। তবে বিজ্ঞানীদের ধারণা, পাহাড়ের গভীরে আরও এমন প্রজাতি আবিষ্কৃত হতে পারে।
কিংহাই-তিব্বত মালভূমিতে এ মাংসাশী ফুলের জন্ম, সেখানে হাজার হাজার প্রজাতির সপুষ্পক উদ্ভিদ রয়েছে, যার অনেকগুলোর মধ্যেই হয়ত পোকা শিকারের অজানা সক্ষমতা লুকিয়ে আছে।
চলচ্চিত্র ‘জুরাসিক পার্ক’-এর বিখ্যাত একটি লাইন উল্লেখ করে সোলটিস বলেছেন, “প্রকৃতি ঠিকই নিজের পথ খুঁজে নেয়। প্রকৃতির এ উদ্ভাবনী সক্ষমতার বহু কিছুই এখনও আমাদের অজানা, যার অনেক কিছুই মানবকল্যাণে আসতে পারে। জ্ঞানের এই বড় ভাণ্ডার উন্মোচিত হলে মানবজাতি অনেক সুবিধা পেতে পারে।”