Published : 11 Dec 2025, 05:03 PM
কখনও যদি নিউ ইয়র্ক থেকে লন্ডনে নির্ধারিত সময়ের আগেই পৌঁছে থাকেন তাহলে কি ভেবেছেন এমনটি কেন হয়?
উত্তর আমেরিকা থেকে ইউরোপমুখী বিভিন্ন ফ্লাইট সত্যিই কম সময়ে যায়। এর প্রধান কারণ আবহাওয়াবিষয়ক একটি বিশেষ ঘটনা, যাকে বলে ‘জেট স্ট্রিম’। এটি খুব দ্রুতগতির বাতাসের সরু প্রবাহ, যা ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩০ হাজার থেকে ৪০ হাজার ফুটের মধ্যে ঘটে। আর এ উচ্চতাতেই বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্লেন ওড়ে।
জেট স্ট্রিম তৈরি হয় পৃথিবীর ঘূর্ণন আর বিষুবরেখা ও মেরুর তাপমাত্রার বড় পার্থক্যের কারণে। বিষুবরেখার কাছে গরম বাতাস ওপরে উঠে মেরুর অঞ্চলের দিকে যায়। আর মেরু অঞ্চলের ঠান্ডা বাতাস নিচে নেমে আবার বিষুবরেখার দিকে ফিরে আসে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে প্রযুক্তি বিষয়ক সাইট স্ল্যাশগিয়ার।
এ গরম-ঠান্ডা বাতাসের সামনে-পেছনের চলাচল বায়ুমণ্ডলে ভারসাম্যহীনতা তৈরি করে, যার ফলে বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে বড় ধরনের চাপের পার্থক্য তৈরি হয়। এর ওপর পৃথিবীর ঘূর্ণনজনিত ‘কোরিওলিস’ প্রভাব যোগ হলে ভূপুষ্ঠ থেকে নির্দিষ্ট উচ্চতায় তৈরি হয় শক্তিশালী বায়ুপ্রবাহ ‘জেট স্ট্রিম’।
এ বাতাস পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে বয়ে যায় এবং অনেক সময় ঘণ্টায় তিনশো ২০ কিলোমিটার বেশি গতিতে ছোটে, বিশেষ করে আটলান্টিকের ওপর দিয়ে, যেখানে এ বাতাস পূর্বমুখী বা আমেরিকা থেকে ইউরোপে বিভিন্ন ফ্লাইটকে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক দ্রুত এগিয়ে দেয়।
বিভিন্ন প্লেন যখন ইউরোপের দিকে যায় তখন এরা টেইলউইন্ড বা ‘পেছনদিকের বাতাসের পুরো সুবিধা নেয়। সবকিছু ঠিকভাবে মিললে প্লেন যাত্রার ফলাফল রোমাঞ্চকর হতে পারে।
যেমন– ২০২৫ সালের শুরুর দিকে নিউ ইয়র্ক থেকে দোহা যাওয়ার একটি ফ্লাইট অত্যন্ত শক্তিশালী এক জেট স্ট্রিমের কারণে এক হাজার দুইশো ৮৮ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টার বেশি গতিতে চলেছে। প্লেনটি ‘এসআর-৭১ ব্ল্যাকবার্ড’-এর মতো রেকর্ড গতি না ছুঁলেও সাধারণ ক্রুজিং স্পিডের তুলনায় এর গতি অনেক বেশি ছিল।
বিভিন্ন প্লেন কোম্পানি জ্বালানি খরচ ও কার্যকারিতা সম্পর্কে অনেক কৌশলী। ফলে আটলান্টিকের ওপর টেইলউইন্ড ব্যবহার করে তারা কেবল প্রতি ফ্লাইটে সময় ও হাজার হাজার লিটার জ্বালানি বাঁচাতে পারে।
কেবল বাতাসকে কাজে লাগিয়ে প্রায়ই পূর্বাভাসিত ফ্লাইট সময় থেকে এক ঘণ্টার বেশি কমিয়ে দিতে পারে পূর্বমুখী ফ্লাইটে পাইলটরা। এক্ষেত্রে প্লেনের নিজের গতিবেগ পরিবর্তন না করলেও এমনটি ঘটে।
এদিকে, পশ্চিম দিকে বা ইউরোপ থেকে উত্তর আমেরিকা যাওয়ার বেলায় পরিস্থিতি পুরোপুরি ভিন্ন। ফিরতি বিভিন্ন ফ্লাইটে প্লেনগুলো প্রায়ই জেট স্ট্রিম এড়িয়ে চলে বা সেই একই শক্তিশালী বাতাসের মুখোমুখি হয়, যা পূর্বমুখী ফ্লাইটে সাহায্য করেছিল।
এ বিপরীত বাতাস আরও খারাপ আবহাওয়ার কারণে তীব্র হতে পারে, এমনকি প্লেনের ডানাও হেলাতে পারে। বিষয়টি যেন উল্টো পথে চলা এক এস্কেলেটরে দৌড়ানো, যেখানে বেশি সময় লাগে, বেশি শক্তি খরচ হয় ও অনেক বেশি ঝাঁকুনি বা টার্বিউলেন্স থাকে।
সময় বাঁচানো ও যাত্রীদের আরাম উভয় বিবেচনায় ফ্লাইটের পথ সবসময় পরিবর্তন হয়। পাইলটরা বিভিন্ন উচ্চতায় উড়তে বা প্লেনের পথ উত্তর বা দক্ষিণ দিকে সরিয়ে সবচেয়ে খারাপ বিপরীত বাতাসও এড়িয়ে চলেন।
সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে হাজার হাজার ফুট ওপরে থাকা এ অদৃশ্য বাতাসের প্রবাহই প্রেন কোম্পানি ও যাত্রীদের বাস্তব ফ্লাইট সময়সূচী তৈরি করে।