বাথরুমে স্মার্টফোন ব্যবহারের ক্ষতি কী কী, জেনে নিন
বর্তমান বাজারে স্মার্টফোনের দাম যেভাবে বাড়ছে তাতে ঝরনার নিচে গান শোনার অভ্যাস বাদ দিয়ে বাথরুমে ভালো মানের স্পিকার ব্যবহার করাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
বর্তমানে অধিকাংশ স্মার্টফোনেই আইপি৬৭ বা আইপি৬৮ রেটিং থাকে, যার দ্বিতীয় ডিজিট পানিরোধী বা ওয়াটার-রেজিস্ট্যান্সের মাত্রা নির্দেশ করে।
এ আইপি নম্বরের কোনোটিকেই কখনও ‘ওয়াটারপ্রুফ’ বা সম্পূর্ণ পানিনিরোধী হিসেবে ভুল করা উচিত নয়, আর গরম বাষ্প তো সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি বিষয়।
স্মার্টফোনকে ‘ওয়াটার-রেজিস্ট্যান্ট’ বা পানিরোধী হিসেবে বর্ণনা করা হলেও ‘ওয়াটারপ্রুফ’ শব্দটি প্রায়শই ভুলভাবে ব্যবহৃত হয়। অনেকে ধরেই নেন, তাদের ফোন যে কোনো পরিস্থিতিতেই পানি সহ্য করতে পারবে।
গরম বা দীর্ঘ গোসলের সময় সেই বাষ্প ঘনীভূত হয়ে ফোনের গায়ে ও আশপাশে আবার তরল পানিতে পরিণত হতে পারে। ফোনটির আইপি৬৮ রেটিং থাকলে বিষয়টি সম্পূর্ণ নিরাপদ বলে মনে হতে পারে।
তবে পানি প্রকৃতির এক অপ্রতিরোধ্য শক্তি, যা ঠিকই ভেতরে প্রবেশের পথ খুঁজে নেবে, আর সেইসব পথ হচ্ছে চার্জিং পোর্ট, স্পিকার, বোতাম ও সিল করা অংশ। তাপের সঙ্গে যোগ হয়ে এ পানি ধীরে ধীরে ফোনের ভেতরের সুরক্ষা ব্যবস্থাকে নষ্ট করে দেয়।
স্মার্টফোন নির্মাতা বিভিন্ন কোম্পানি এ বিষয়ে আশ্চর্যজনকভাবে যথেষ্ট স্পষ্ট বার্তা দেয়। অ্যাপলের সাপোর্ট পেইজে বলা হয়েছে, আইফোন ব্যবহারকারীদের ‘সউনা’ ও ‘স্টিম রুম’ বা বাষ্পওয়ালা ঘর এড়িয়ে চলা উচিত।
পাশাপাশি, তরল পদার্থের কারণে কোনো ক্ষতি হলে তা ওয়ারেন্টির আওতাভুক্ত হবে না। একই কথা বলেছে গুগলও এবং এর পরিবর্তে ব্লুটুথ স্পিকার ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছে মার্কিন সার্চ জায়ান্টটি।
বাষ্প, তাপ ও আর্দ্রতা ডেকে আনে ভিন্ন ধরনের ঝুঁকি
পানিতে ফোন পড়ে যাওয়া বা পুলে সাময়িক ডোবার মতো ঘটনা যদি কোনো ফোন সহ্য করতে পারে তবে গোসলের ঘরের বাষ্প কেন এত বড় উদ্বেগের বিষয়?
মাঝেমধ্যে স্বল্প সময়ের জন্য এমন পরিস্থিতির মুখে পড়তে হলেও খুব একটা ক্ষতি হয় না। তবে পানিতে সম্পূর্ণ নিমজ্জিত হওয়া ও বাষ্পের সংস্পর্শে আসা এক বিষয় নয়।
ওয়াটার-রেজিস্ট্যান্স বা পানিরোধী রেটিংগুলো কেবল নির্দিষ্ট কিছু শর্তের অধীন তরল পানির ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য, গোসলের ঘরের তাপ ও আর্দ্র বাতাসের জন্য নয়। আর্দ্র পরিবেশে দ্রুত ঠাণ্ডা হওয়ার ফলে ডিভাইসের ভেতরে ও বাইরে উভয় স্থানেই ঘনীভূত হয়ে পানি জমতে পারে।
এটা আলাদা একটি ঝুঁকি। তবে অতিরিক্ত গরম বাথরুম, সউনা ও স্টিম রুমে তাপমাত্রা অনেক সময় স্মার্টফোনের নিজস্ব কার্যসক্ষমতার সীমাকে ছাড়িয়ে যায়।
বেশিরভাগ ফোনেরই সর্বোচ্চ ব্যবহারের তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি হয় ও অব্যবহৃত অবস্থায় এর চেয়ে খুব বেশি হয় না।
অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে ফোন স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যেতে পারে, যা নিশ্চিতভাবেই ব্যাটারির দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
এ ছাড়া, বাথরুমের তাকে বা সাবানদানিতে ফোন রাখা, বিশেষ করে তা যদি সরাসরি পানির ঝরনার কাছাকাছি হয় তবে তা ঝুঁকি ডেকে আনারই নামান্তর। ভেজা হাতে ফোন চালানোর চেষ্টা করা মানেই তা হাত থেকে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
সম্ভব হলে ফোনটি বাথরুমের বাইরে রাখুন ও এর পরিবর্তে একটি পোর্টেবল ব্লুটুথ স্পিকার ব্যবহার করুন। অনেক স্পিকারেই একই ধরনের আইপি রেটিং থাকে এবং এগুলো নষ্ট হলেও ফোন বা ট্যাবলেটের তুলনায় ক্ষতির ঝুঁকি অনেক কম।
এ ছাড়া, বর্তমানে ব্লুটুথ প্রযুক্তি বেশি নির্ভরযোগ্য ও ঘরের দরজা বা দেওয়াল ভেদ করেও এটা নির্বিঘ্নে কাজ করতে পারে।
তাপ ফোনকে চিরতরে নষ্ট করে দিতে পারে?
অবশ্যই পারে। বারবার বা অতিরিক্ত মাত্রার তাপের সংস্পর্শে আসা স্মার্টফোনের ওপর স্থায়ীভাবে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। কেনার সময় ব্যাটারির কার্যসক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হলেও অতিরিক্ত তাপের কারণে ব্যাটারির বয়স দ্রুত ফুরিয়ে যায়।
চোখে দেখা যায় না এমন ছোট ছোট আঠা বা সিল করা অংশগুলোও তাপ ও আর্দ্রতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারে না। ফলে হওয়া ক্ষতিগুলো খুব দ্রুত চোখে পড়ে না।
মাঝেমধ্যে ফোনে লিকুইড ড্যামেজ বা তরলজনিত ক্ষতির সতর্কতা আসতে পারে বা পোর্ট শুকাতে না পারায় ম্যাগনেটিক চার্জার ব্যবহার করতে হতে পারে, অথচ ভেতরে থাকা সূক্ষ্ম বিভিন্ন যন্ত্রাংশ ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, সে বিষয়ে ব্যবহারকারীর কোনো ধারণাই থাকে না।
যে কোনো কারণেই হোক না কেন ফোন ভিজে গেলে সঙ্গে সঙ্গে সেটা মুছে ফেলুন। চার্জিং পোর্টে কোনো কেবল বা প্লাগ লাগাবেন না ও সবসময় পোর্টগুলো নিচের দিকে মুখ করে রাখুন।
হেয়ার ড্রায়ার বা ফোন গরম করতে পারে এমন যে কোনো পদ্ধতি ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকুন। ফোন ভিজলে চালের বাটিতে রাখার একটি প্রচলিত ঘরোয়া উপায় অনেকেরই জানা থাকলেও অ্যাপল তা করতে নিষেধ করেছে।
ভেজা স্মার্টফোন ঠিক করার সবচেয়ে ভালো উপায় ফোনটিকে প্রথম থেকেই ভিজতে না দেওয়া। এর মানে ফোনকে গরম ও আর্দ্র পরিবেশ থেকে দূরে রাখা।
কেবল কয়েকটি অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করে একটি পোর্টেবল ব্লুটুথ স্পিকারের সঙ্গে কানেক্ট করে গান বা অডিওবুক শুনতে পারেন। এতে দামি ফোনটি তখন পাশের ঘরে সম্পূর্ণ নিরাপদ থাকবে।
বর্তমান বাজারে স্মার্টফোনের দাম যেভাবে বাড়ছে তাতে ঝরনার নিচে গান শোনার অভ্যাস বাদ দিয়ে বাথরুমে একটি ভালো মানের স্পিকার ব্যবহার করাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
