Published : 14 Aug 2026, 11:31 AM
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজের দেওয়া বার্তা সবার আগে পড়ার সুযোগ করে দিয়ে প্রতি মাসে সর্বোচ্চ ১ লাখ ডলার পর্যন্ত ফি নেওয়ার একটি পরিকল্পনা ভেস্তে দিতে ডনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে মামলা করেছে মার্কিন এক সংবাদমাধ্যম ও সংগঠন।
নিজের মালিকানাধীন প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশাল’-এর বিশেষ এক সেবাকে কাজে লাগিয়ে ট্রাম্প যাতে মুনাফা করতে না পারেন সেই উদ্দেশ্যেই এ আইনি লড়াই শুরু হয়েছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে ব্রিটিশ সংবাদমধ্যম ইন্ডিপেনডেন্ট।
বিতর্কিত এই সেবার আওতায় অর্থ দেওয়া সাবস্ক্রাইবাররা ট্রাম্পের দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণী নানা পোস্ট সবার আগে দেখতে পান।
মামলায় অভিযোগ, শুল্ক, সামরিক পদক্ষেপ বা সরকারের বিভিন্ন নীতিগত সিদ্ধান্তের মতো তথ্য নিজের ব্যক্তিমালিকানাধীন প্ল্যাটফর্মে আগেভাগে প্রকাশ করার এই পদক্ষেপ মার্কিন সংবিধানের স্পষ্ট লঙ্ঘন।
মার্কিন সংবিধান অনুসারে, যে কোনো সরকারি তথ্য বা গণবিজ্ঞপ্তি সমাজের সবস্তরের মানুষের কাছে একই সময়ে ও সমানভাবে পৌঁছানো বাধ্যতামূলক।
এ মাসের শুরুতে ট্রাম্পের কোম্পানি ‘ট্রাম্প মিডিয়া অ্যান্ড টেকনোলজি’ বিশেষ এ সাবস্ক্রিপশন প্রোডাক্টটি বাজারে আনে। তথ্যের ওপর ভিত্তি করে পুঁজিবাজারে অন্যদের চেয়ে দ্রুত লেনদেনের সুযোগ করে দিতেই ওয়াল স্ট্রিটের বড় বড় ফাইন্যান্সিয়াল ফার্ম ও বিনিয়োগকারী কোম্পানির কাছ থেকে মাসে ১ লাখ ডলার পর্যন্ত ফি দাবি করা হচ্ছে।
সংবাদমাধ্যম ‘ইন্টারসেপ্ট’-এর সঙ্গে যৌথভাবে মামলা ‘ফ্রিডম অফ দ্য প্রেস ফাউন্ডেশন’।
সংগঠনটির অ্যাডভোকেসি প্রধান সেথ স্টার্ন বলেছেন, “একজন প্রেসিডেন্ট নিজে যে খবরের জন্ম দিচ্ছেন, নিজের নিয়ন্ত্রাধীন এক কোম্পানির লাভের জন্য সেই খবরের অগ্রাধিকারমূলক প্রবেশাধিকার বিক্রি করা এতটাই নগ্ন দুর্নীতি ও অসাংবিধানিক যে, কেবল কয়েক বছর আগেও এমনটা মাথায় আনা কঠিন ছিল।”
তবে সব অভিযোগ এক বাক্যে উড়িয়ে দিয়ে ট্রাম্প মিডিয়া বলেছে, ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের কাছে দ্রুত তথ্য ও খবর বিক্রির এই চর্চা পুরো শিল্পেই বেশ সাধারণ ও প্রচলিত একটি বিষয়। আইনি লড়াইয়ের নামে মামলাকারীরা প্রেসিডেন্টের মুখ বন্ধের চক্রান্ত করছে।
“প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দেওয়া তথ্য অগণিত প্ল্যাটফর্ম ও সংবাদমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, যার মধ্যে অনেক কোম্পানিই দ্রুত তথ্য পাওয়ার সাবস্ক্রিপশন এপিআই সেবা দেয়। তবে এখন বামপন্থী কর্মীরা আদালতকে বেআইনিভাবে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে আবারও তাকে সেন্সর করা এবং আমাদের বিনিয়োগকারীদের ক্ষতি করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে।”
তথ্য আদান-প্রদানের ডিজিটাল প্রযুক্তি ‘এপিআই’ভিত্তিক এই সেবার মাধ্যমে পুঁজিবাজারে নিবন্ধিত কোম্পানি ‘ট্রাম্প মিডিয়া’ অতিরিক্ত আয়ের পথ খুঁজছে।
দুই বছর আগে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার পরপরই কোম্পানিটির প্রতিটি শেয়ারের দাম যেখানে ৬২ ডলারে উঠেছিল, সেখান থেকে তা নেমে এখন ১০ ডলারের নিচে ঠেকেছে। বর্তমানে প্রতি প্রান্তিকেই শত শত কোটি ডলার লোকসান গুণছে ট্রাম্পের এই কোম্পানি।
মামলার বাদীদের যুক্তি, অন্যান্য জায়গায় প্রকাশের অন্তত ছয় ঘণ্টা আগে নিজের সব সোশাল পোস্ট কেবল ‘ট্রুথ সোশাল’-এ আগে দেখার যে চুক্তি ট্রাম্প করেছেন, তা মার্কিন সংবিধানের দুটি ধারাকে লঙ্ঘন করেছে।
প্রথমত, সংবিধানের প্রথম সংশোধনী অনুসারে, প্রেস ও সাধারণ মানুষের সমান শর্তে প্রেসিডেন্টের মন্তব্য বা বক্তব্য জানার যে অধিকার রয়েছে তা ক্ষুণ্ন হচ্ছে।
দ্বিতীয়ত, পঞ্চম সংশোধনী অনুসারে সরকারি কোনো সুবিধার বিনিময়ে অযৌক্তিক শর্ত বা অর্থ আরোপের যে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে তারও পরিপন্থী।
মামলায় ‘ট্রুথ এপিআই’ নামের নতুন এ পেইড পরিষেবা বন্ধের পাশাপাশি ট্রাম্প মিডিয়ার সঙ্গে ট্রাম্পের ছয় ঘণ্টার এক্সক্লুসিভ কনটেন্ট চুক্তিটি সম্পূর্ণরূপে বাতিল করার আর্জি জানানো হয়েছে।
এ মাসের শুরুতে নতুন এপিআই সার্ভিস চালুর আগেই নৈতিকতা বিষয়ক মার্কিন বিভিন্ন পর্যবেক্ষক দল ট্রাম্পের এ পদক্ষেপের কড়া সমালোচনা করেছিল।
তাদের মতে, নিজের প্রেসিডেন্ট পদকে কাজে লাগিয়ে অনৈতিকভাবে মুনাফা তোলার যে বেপরোয়া চেষ্টা ট্রাম্প চালিয়ে যাচ্ছেন, বিশেষ করে ক্রিপ্টোকারেন্সি সংক্রান্ত ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে এমনটা তারই অংশ, যা মার্কিন প্রেসিডেন্টের পদের মর্যাদাকে ক্ষুণ্ন করছে।
এ বছরের শুরুতে জমা দেওয়া বার্ষিক আর্থিক বিবরণীতে দেখা যায়, ট্রাম্প গত এক বছরে নিজের নতুন ক্রিপ্টো ব্যবসা থেকেই ১০০ কোটি ডলারের বেশি আয় করেছেন, যার নিয়ন্ত্রক সংস্থা খোদ তারই প্রশাসন।
পুনরায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর ট্রাম্পের নেওয়া নানামুখী আর্থিক পদক্ষেপের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে তার ডিজিটাল ফাইন্যান্স কোম্পানি ‘ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফাইন্যান্স’-এ সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকারের ঘনিষ্ঠ এক কোম্পানি থেকে ৫০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ লাভ।
এ ছাড়া তিনি ভক্ত ও সরকারি অনুগ্রহপ্রার্থীদের কাছে কোটি কোটি ডলারের বিশেষ স্মারক ‘ট্রাম্প মিম কয়েন’ বিক্রি করেছেন। সরকারের দায়ের করা আইনি লড়াইয়ের মুখে থাকা এক বিলিয়নেয়ারও এই কয়েন কিনেছেন, যার বিরুদ্ধে চলমান মামলাটি পরবর্তীতে প্রথমে স্থগিত ও পরে নিষ্পত্তি করা হয়।
নিউ ইয়র্কের সাউদার্ন ডিস্ট্রিক্ট আদালতে দায়ের করা এই মামলায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের পাশাপাশি তার ডেপুটি চিফ অফ স্টাফ ড্যানিয়েল স্ক্যাভিনো ও নির্বাহী সহকারী নাটালি জে. হার্পকেও বিবাদী করা হয়েছে।