এআই এজেন্ট ও আইনগত ধোঁয়াশা: ক্ষতির দায় কার ঘাড়ে?
এসব অটোনমাস প্রযুক্তির মাধ্যমে ঘটা অপরাধ বা ক্ষতির আইনগত ও নৈতিক দায় নির্ধারণের বিষয়টি এখনও বেশ জটিল ও ধোঁয়াশাচ্ছন্ন।
ব্যবহারকারীর নির্দেশে জিমে বুকিং দিতে গিয়ে অন্য গ্রাহককে ওয়েটিং লিস্ট থেকে বাদ দিয়ে দিল এক এআই এজেন্ট।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান লিখেছে, অস্ট্রেলিয়ায় অটোনমাস প্রযুক্তির এমন প্রথম দুর্ঘটনায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের ঘটানো ক্ষতির আইনগত ও নৈতিক দায় শেষ পর্যন্ত কার?
অধ্যাপক জিনি প্যাটারসন বলেছেন, “আইন খুব স্পষ্ট। আমি যদি একটি এআই এজেন্ট চালাই এবং সেটি অন্য কারো ক্ষতি করে তবে সেই ক্ষতির দায় আমারই।”
‘ইউনিভার্সিটি অফ মেলবোর্ন’-এর ‘সেন্টার ফর এআই অ্যান্ড ডিজিটাল এথিকস’-এর এ পরিচালক বলেছেন, “এমন ঘটনা ঘটানোর ইচ্ছা আমার না থাকলেও এমনটা হওয়ার আশঙ্কা কিন্তু থেকেই যায়। ফলে এর সব ধরনের দায় আমাকেই নিতে হবে।”
অস্ট্রেলিয়ায় অটোনমাস এআই বা ‘একা একা সিদ্ধান্ত নিয়ে কাজ করতে পারে এমন সফটওয়্যার’ দিয়ে প্রথম দুর্ঘটনাটি ঘটার পর প্যাটারসন বলেছেন, এসব অটোনমাস প্রযুক্তির মাধ্যমে ঘটা অপরাধ বা ক্ষতির আইনগত ও নৈতিক দায় নির্ধারণের বিষয়টি এখনো বেশ জটিল ও ধোঁয়াশাচ্ছন্ন।
‘এআই এজেন্ট’ এমন এক বিশেষ স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যার ব্যবস্থা, যেটিকে কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্যের দায়িত্ব দেওয়া হলে মানুষের সরাসরি তদারকি ছাড়াই প্রতিটি পদক্ষেপে নিজে থেকেই চূড়ান্ত কাজ সম্পন্ন করতে পারে এই এআই।
এ সপ্তাহে ‘অস্ট্রেলিয়ান ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশন’ বা এবিসি এক প্রতিবেদনে ‘অ্যান্ড্রু’ নামের এক এআই বিশেষজ্ঞের ঘটনা সামনে আনে, যেখানে নিজের পুরো নাম প্রকাশ না করে ওই বিশেষজ্ঞ বলেছেন, একটি এআই এজেন্টকে তিনি তার পক্ষে কয়েকটি জিম ক্লাসের বুকিং দেওয়ার দায়িত্ব দিয়েছিলেন।
একটি ক্লাসে অপেক্ষমাণ তালিকায় তিনি চার নম্বরে আছেন জানার পর অ্যান্ড্রু এজেন্টটিকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, তাকে তালিকার ওপরের দিকে তুলে আনা সম্ভব কি না।
এরপরই ঘটে এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা। অ্যান্ড্রুকে অবাক করে দিয়ে এআই এজেন্টটি সোজা ওই জিমের সফটওয়্যার সিস্টেম হ্যাকিং চালিয়ে তালিকার ওপরের দিকে থাকা অন্য এক সদস্যকে সরিয়ে সেখানে অ্যান্ড্রুর জায়গা করে দেয়।
গেল এপ্রিলে দেওয়া এক ব্লগ পোস্টে অ্যান্ড্রু লিখেছেন, “সফটওয়্যারে নির্ধারিত সময়ের বহু মাস আগেই তা অনায়াসে ক্লাস বুক করে নিতে পেরেছিল। সবচেয়ে শঙ্কাজনক বিষয়, এটি অন্য সদস্যদের বুকিং নিজে থেকেই বাতিল করে দিয়ে তাদের ওয়েটিং লিস্ট থেকে বের করে দিচ্ছিল।”
এআই এজেন্টটি নিজের মালিককে সাহায্য করতেই এ কাজ করেছিল বলে মন্তব্য করেছেন অ্যান্ড্রু। তার এ অভিজ্ঞতায় প্রমাণ মেলে, কেউ যদি কোনো এআইকে তার হয়ে কাজের অনুমতি দেন তবে বেশিরভাগ সময় এআই এমন সব অভিনব পথ খুঁজে বের করবে, যা করার নির্দেশ তিনি হয়ত তাকে কখনোই স্পষ্টভাবে দেননি।
এআই এজেন্টটিকে অন্য সদস্যের বাতিলকৃত বুকিং আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার নির্দেশ দিয়েছিলেন অ্যান্ড্রু। তবে এআই এজেন্টটি এমনটা করতে না পেরে বলেছিল, “দুঃখিত পরীক্ষাটি চালানোর সময় আমার আরও সতর্ক হওয়া উচিত ছিল।”
এরপর অ্যান্ড্রু এআই এজেন্টটিকে দিয়েই জিমের সফটওয়্যার প্রদানকারী কোম্পানির কাছে একটি ইমেইল লেখান, যেখানে এআই কীভাবে তাদের নিরাপত্তা ত্রুটি কাজে লাগিয়ে হ্যাক করেছিল তা বিশদে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
ভিক্টোরিয়া পুলিশের একজন মুখপাত্র বলেছেন, অ্যান্ড্রুর এ ঘটনায় ‘কোনো ধরনের অপরাধমূলক উপাদান জড়িয়ে আছে বলে মনে হচ্ছে না।”
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের ও বিপজ্জনক ঘটনা ঘটতে পারে, যা ক্ষতি করার পাশাপাশি সরাসরি আইন ভঙ্গ করবে।
আইনগত অস্পষ্টতা ও ধোঁয়াশা
অস্ট্রেলিয়ার আইন কেবল মানুষের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, কোনো ভার্চুয়াল বা কৃত্রিম সত্তার ক্ষেত্রে নয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যে ব্যক্তি বা কোম্পানি এ এআই এজেন্টটি পরিচালনা করবে তাদেরকেই আইনগতভাবে সব ধরনের দায় নিতে হবে।
পাশাপাশি তারা সতর্ক করে বলেছেন, যারা এসব প্রযুক্তি ব্যবহার করছেন, তাদের নিজেদের দায়বদ্ধতা সম্পর্কে প্রায় কোনো ধারণাই নেই।
‘ইউনিভার্সিটি অফ সিডনি’র এআই মূল্যায়ন ও শাসনবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ড. রেবেকা জনসন বলেছেন, “আমরা সামনে এই ধরনের আরও অনেক ঘটনা ঘটতে দেখব।”
অধ্যাপক প্যাটারসন বলেছেন, ঘটনাটি প্রকাশ্যে আনা ও সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করায় অ্যান্ড্রু দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েছেন। তবে সার্বিকভাবে প্রযুক্তি ব্যবহারে এক ধরনের ‘উন্মাদনা ও বেপরোয়া ভাব’ লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
“যে মুহূর্তে আপনি এআই এজেন্টকে মানুষের হয়ে কাজ করার সক্ষমতা দেবেন ঠিক তখনই এই ধরনের দুর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা তৈরি হয়।”
বিষয়টি বোঝাতে কাল্পনিক এক উদাহরণ দিয়েছেন অধ্যাপক প্যাটারসন। ধরা যাক, কোনো ভাড়া বাড়িতে থেকে কারো অভিজ্ঞতা খারাপ হল এবং তিনি তার এআই এজেন্টকে একটি নেতিবাচক রিভিউ বা রিভিউ লেখার নির্দেশ দিলেন।
“এআই এজেন্টটি কেবল একটি রিভিউ লিখেই ক্ষান্ত হল না, এটা ক্রমাগত ১০টি রিভিউ পোস্ট করতে শুরু করল। ফলে ওই বাড়ির রেটিং একধাক্কায় নিচে নেমে গেল। এভাবে আপনি একটি ব্যবসাকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দিতে পারেন।
“এমনটা হলে প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার দায় আপনার ওপর পড়তে পারে। আপনি বাড়ির মালিকের মানহানি করার জন্য অভিযুক্ত হতে পারেন।”
পরিস্থিতি এর চেয়েও ভয়াবহ হতে পারে। প্যাটারসন বলেছেন, আইন কিন্তু নীতিশাস্ত্রের চেয়ে আলাদা। এরপরও তা নীতিশাস্ত্রের ওপর ভিত্তি করেই গড়ে ওঠে।
“নীতিশাস্ত্র আমাদের দেখায় কী করা উচিত, আর আইন নিকৃষ্টতম অপরাধমূলক বিভিন্ন আচরণকে ঠেকায়।
অস্ট্রেলীয় কেন্দ্রীয় সরকারের নতুন ‘এআই অফিস’ বেশ কিছু প্রচলিত আইনের তালিকা উল্লেখ করেছে, যা এআইয়ের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে প্রাইভেসি লঙ্ঘন, ভোক্তা অধিকার, অনলাইন নিরাপত্তা, মানহানি ও ফৌজদারি আইন।
প্যাটারসন ও জনসন দুজনই এআইয়ের ক্ষেত্রে ‘নিয়ন্ত্রণহীন’ বা ‘স্বতন্ত্রভাবে অপরাধ করা’ শব্দটি ব্যবহারের বিরোধী। কারণ আগে থেকেই নির্দিষ্ট সীমা ও নিরাপত্তামূলক নির্দেশনা দিয়ে এআই পরিচালনা করা সম্ভব।
জনসন বলেছেন, “আমরা যখনই কোনো এআই এজেন্টকে আমাদের হয়ে কাজ করার অনুমতি দেই, তখন আমরা যে লক্ষ্য ঠিক করে দিই তা পূরণ করতেই এআই কাজ করে। আমরা যদি এআইকে পর্যাপ্ত নীতিমালা বা সীমার মধ্যে আটকে না রাখি, তবে এজেন্টটি যে কোনো উপায়ে কেবল সেই লক্ষ্য পেতে চেষ্টাই চালিয়ে যাবে।
“আমি অনেকের মুখেই শুনি “আমি একটি এআই এজেন্ট বানিয়েছি” এবং তারা নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাচ্ছে। এটা ঠিক আছে, তবে, কোনো স্পষ্ট দিকনির্দেশনা ছাড়াই তাদের হাতে নানা শক্তিশালী সরঞ্জাম তুলে দেওয়া হচ্ছে। আর বাজারে যেসব দিকনির্দেশনা রয়েছে সেগুলোর মানও বেশ অনির্দিষ্ট।”
প্যাটারসন বলেছেন, এসব ঘটনা আদালত পর্যন্ত গড়ালেই কেবল নতুন আইনসঙ্গত নজির তৈরি হবে। তখন ডেভেলপারদেরও বাধ্য থাকবে এসব ঘটনা পর্যবেক্ষণ করার এবং সেই অনুসারে তাদের কাজের নিয়মকানুন উন্নত করার।
