১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

যে মামলায় মেটা হারলে আমূল বদলে যেতে পারে ফেইসবুক-ইনস্টাগ্রাম

শিশুদের প্ল্যাটফর্মে আটকে রাখতে মেটা ‘নিপীড়নের পথ বেছে নিয়েছে’, যাতে ব্যবহারকারীর সংখ্যা বাড়ানো এবং ব্যবসা সম্প্রসারণ করা যায়।

যে মামলায় মেটা হারলে আমূল বদলে যেতে পারে ফেইসবুক-ইনস্টাগ্রাম
যুক্তরাষ্ট্রের ৩০টি অঙ্গরাজ্যের করা এই মামলাটি কোম্পানিটির কার্যক্রমে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে। ছবি: রয়টার্স

প্রযুক্তি ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 17 Aug 2026, 01:56 PM

Updated : 16 Sep 2026, 05:10 PM

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মঙ্গলবার শুরু হতে যাওয়া  মামলায় মেটা হারলে শিশু ও কিশোরদের জন্য ইনস্টাগ্রাম ও ফেইসবুক ব্যবহারের ধরন আমূল বদলে যেতে পারে।

শিশুদের ক্ষতি ও প্রাইভেসি আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে মেটার বিরুদ্ধে করা মামলার বিচার মঙ্গলবার শুরু হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে বিবিসি। যুক্তরাষ্ট্রের ৩০টি অঙ্গরাজ্যের করা এই মামলাটি কোম্পানিটির কার্যক্রমে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে।

২০২৩ সালে ক্যালিফোর্নিয়া ও নিউ ইয়র্কসহ অঙ্গরাজ্যগুলো মামলাটি করে। তাদের অভিযোগ, শিশুদের সুরক্ষায় থাকা কেন্দ্রীয় ও অঙ্গরাজ্যভিত্তিক প্রাইভেসি আইন বহুবার লঙ্ঘন করেছে মেটা।

অঙ্গরাজ্যগুলো শুধু এক লাখ কোটি ডলারের বেশি ক্ষতিপূরণই চাইছে না, ইনস্টাগ্রাম ও ফেইসবুকজুড়ে বড় ধরনের পরিবর্তন আনার দাবিও জানিয়েছে।

এসব দাবির মধ্যে রয়েছে-

●    কিশোর ব্যবহারকারীদের অ্যাকাউন্টে অভিভাবকদের জন্য যাচাইয়ের ব্যবস্থা চালু করা।

●    ‘ডোপামিনে প্রভাব ফেলা সুপারিশ অ্যালগরিদম’ পরিবর্তন।

●    ছবিতে চেহারার পরিবর্তন আনে—এমন অনেক ফিল্টার সরিয়ে দেওয়া। 

●    স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভিডিও চালু হওয়ার রেওয়াজ বন্ধ করা।

●    একাধিক অ্যাকাউন্ট খোলার সুযোগ বন্ধ করা এবং 

●    ইনস্টাগ্রাম স্টোরিজের মতো অদৃশ্য হয়ে যাওয়া পোস্ট বন্ধ করার দাবি।

অঙ্গরাজ্যগুলোর ভাষ্য, এসব সুবিধা শিশু ও কিশোরসহ ব্যবহারকারীদের প্ল্যাটফর্মে ‘যত বেশি সময় সম্ভব ধরে রাখার জন্য’ তৈরি করা হয়েছে। ঘন ঘন নোটিফিকেশন পাঠানোর মতো ব্যবস্থার মাধ্যমে তরুণদের প্ল্যাটফর্ম থেকে সরে থাকাও কঠিন করে তোলা হয়েছে বলে অভিযোগ তাদের।

তাদের অভিযোগ, শিশুদের লক্ষ্য করে মেটা তরুণদের প্ল্যাটফর্মে আটকে রাখতে ‘নিপীড়নের পথ বেছে নিয়েছে’, যাতে ব্যবহারকারীর সংখ্যা বাড়ানো এবং ব্যবসা সম্প্রসারণ করা যায়। বর্তমানে শেয়ারবাজারে মেটার মূল্য প্রায় দেড় লাখ কোটি ডলার।

তবে মেটা এসব অভিযোগ ধারাবাহিকভাবে অস্বীকার করে এসেছে।

কোম্পানিটির এক মুখপাত্র বিবৃতিতে বলেন, “আমরা এসব অভিযোগের সঙ্গে দৃঢ়ভাবে দ্বিমত পোষণ করি এবং আমরা আত্মবিশ্বাসী যে, প্রমাণগুলো তরুণদের সহায়তায় আমাদের দীর্ঘদিনের অঙ্গীকার তুলে ধরবে।”

মেটার বিরুদ্ধে প্রথম অভিযোগ তুলেছিলেন ‘হুইসেলব্লোয়ার’ ফ্রান্সিস হাউগেন। যুক্তরাষ্ট্রের সেনেটে তিনি স্বাক্ষ্য দেন, শিশুদের ক্ষতি হচ্ছে জেনেও মেটা ক্ষতিকর অ্যালগরিদম চালু রেখেছে। ছবি: রয়টার্স

মেটার বিরুদ্ধে প্রথম অভিযোগ তুলেছিলেন ‘হুইসেলব্লোয়ার’ ফ্রান্সিস হাউগেন। যুক্তরাষ্ট্রের সেনেটে তিনি স্বাক্ষ্য দেন, শিশুদের ক্ষতি হচ্ছে জেনেও মেটা ক্ষতিকর অ্যালগরিদম চালু রেখেছে

ক্যালিফোর্নিয়ার প্রধান কেন্দ্রীয় বিচারক ইয়োভন গনজালেস রজার্সের আদালতে মামলাটির শুনানী হবে। ইলন মাস্ক ও স্যাম অল্টম্যানের আলোচিত মামলার বিচারকও ছিলেন তিনি। প্রায় ২০ বছর ধরে বিচারকের দায়িত্ব পালন করে সরাসরি ও তীক্ষ্ণ অবস্থানের জন্য পরিচিতি পেয়েছেন তিনি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মামলায় কোনো না কোনো পক্ষ ছিল প্রযুক্তি কোম্পানি বা এসব কোম্পানির গুরুত্বপূর্ণ লোকজন।

এর আগে মেটার বিরুদ্ধে নিউ মেক্সিকোতে করা আরেকটি মামলায় কোম্পানিটিকে মোট ৯৪ কোটি ২০ লাখ ডলার জরিমানা করা হয়েছে। একইসঙ্গে ইনস্টাগ্রাম ও ফেইসবুকে কিশোরদের সুরক্ষায় বেশ কিছু পরিবর্তনের নির্দেশ এসেছে রায়ে।

বিচারক ব্রায়ান বিডশাইডের নির্দেশের মধ্যে ছিল ১৮ বছরের কম বয়সীদের জন্য ইনস্টাগ্রাম ও ফেইসবুকে ‘লাইক’ সংখ্যা দেখানো বন্ধ করা, কিশোর বয়সীদের সঙ্গে নগ্ন ছবি লেনদেন নিষিদ্ধ করা এবং দিনের নির্দিষ্ট সময়ে অ্যাপগুলোর পুশ বিজ্ঞপ্তি সীমিত করা।

বিচারক মেটার প্ল্যাটফর্মগুলোকে ‘জনসাধারণের জন্য ক্ষতিকর উপদ্রব’ বলেও ঘোষণা করেন। তিনি বিষয়টিকে এমন একটি কারখানার সঙ্গে তুলনা করেন, যা মানুষের শ্বাস নেওয়া বাতাস দূষিত করে এবং পুরো জনগোষ্ঠীর ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। 

মেটা ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার কথা বলেছে।

নিউ মেক্সিকোর ওই নির্দেশ শুধু অঙ্গরাজ্যটির জন্য প্রযোজ্য। কিন্তু ৩০টি অঙ্গরাজ্যের মামলায় মেটা হেরে গেলে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে প্ল্যাটফর্মে পরিবর্তন আনার প্রয়োজন হতে পারে। মামলায় থাকা অঙ্গরাজ্যগুলো যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ জনসংখ্যার প্রতিনিধিত্ব করে।

এমন পরিবর্তন হলে মেটার প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের অভিজ্ঞতাই বদলে যেতে পারে। এর একটি বড় উদাহরণ হতে পারে ‘লাইক’ সংখ্যা বন্ধ করা।

মেটার শুরুর সময় থেকেই ‘লাইক’ সুবিধাটি রয়েছে। তখন কোম্পানিটির নাম ছিল ফেইসবুক এবং সেটিই ছিল তাদের একমাত্র প্ল্যাটফর্ম। এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লেখা, ছবি ও ভিডিওতে মানুষের অংশগ্রহণের অন্যতম প্রধান মাধ্যম এই ‘লাইক’।

ক্যালিফোর্নিয়ার প্রধান বিচারক ইয়োভন গনজালেস রজার্স। প্রযুক্তিকেন্দ্রীক বিভিন্ন মামলার রায় তার আদালত থেকে এসেছে। ছবি: অফিশিয়াল পোর্ট্রেইট

ক্যালিফোর্নিয়ার প্রধান বিচারক ইয়োভন গনজালেস রজার্স। প্রযুক্তিকেন্দ্রীক বিভিন্ন মামলার রায় তার আদালত থেকে এসেছে

তবে বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে ‘লাইক’ নেতিবাচক অনুভূতি তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে বলে ধারণা জোরালো হচ্ছে।

চলতি বছরের শুরুতে মেটার বিরুদ্ধে মামলায় জয় পাওয়া ক্যালি নামের এক তরুণী আদালতে বলেন, তিনি ইউটিউব ও ইনস্টাগ্রামে ডজনখানেক অ্যাকাউন্ট খুলেছিলেন। নিজের পোস্টে নিজেই ‘লাইক’ দেওয়ার জন্য এসব অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করতেন। অন্য ব্যবহারকারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং নিজের স্বীকৃতি ও আত্মতৃপ্তি বাড়ানোই ছিল তার উদ্দেশ্য।

তখন ক্যালির বয়স ছিল মাত্র নয় বছর। তিনি বলেন, সে সময় তার নিজেকে বিষণ্ন মনে হতো। পরে ১০ বছর বয়সে তার বিষণ্নতা শনাক্ত হয়।

গত কয়েক বছরের গবেষণায় দেখা গেছে, ‘লাইক’ সংখ্যার মতো অংশগ্রহণের মাপকাঠি কিশোরদের মধ্যে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার অনুভূতি ও বিষণ্নতা বাড়াতে পারে।

মেটার বিরুদ্ধে ৩০ অঙ্গরাজ্যের মামলায় কোম্পানিটি জানিয়েছে, তারা দুই লাখের বেশি নথি হস্তান্তর করেছে। মামলার আইনজীবীরা মেটার নিজেদের গবেষণার কথাও তুলে ধরেছেন। সেই গবেষণায় দেখা যায়, ‘লাইক’ সংখ্যা ‘সামাজিক তুলনা’ বাড়ায়। অর্থাৎ অন্য কারও ছবির সঙ্গে নিজের মূল্য বা অবস্থান তুলনা করার মানসিক প্রবণতা তৈরি হয়।

মেটার অভ্যন্তরীণ গবেষণা অনুযায়ী, ইনস্টাগ্রাম থেকে তৈরি এই সামাজিক তুলনার সঙ্গে “একাকিত্ব বেড়ে যাওয়া, নিজের শরীর নিয়ে খারাপ ধারণা এবং নেতিবাচক মেজাজ বা অনুভূতি” যুক্ত ছিল।

বিচারক বিডশাইড তার আদেশে বলেন, এক দশকের বেশি সময় ধরে মেটার প্ল্যাটফর্মগুলো যেভাবে পরিচালিত হয়েছে, তা নিউ মেক্সিকোসহ অন্যান্য জায়গায় বেড়ে চলা ‘তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য সংকটের’ অংশ হয়ে উঠেছে।

এবার আরও ৩০টি অঙ্গরাজ্যের আইনজীবীরা বিচারক গনজালেস রজার্সকে একই সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্য যুক্তি তুলে ধরবেন। মামলায় মেটার বিরুদ্ধে রায় হলে তরুণদের জন্য সামাজিকমাধ্যম ব্যবহারের ধরন বড়ভাবে বদলে যেতে পারে।