Published : 18 May 2025, 08:25 PM
যুক্তরাষ্ট্রে স্বাস্থ্যসেবা খাতে ডেটা চুরি বা তথ্য ফাঁসের প্রধান কারণ এখন র্যানসমওয়্যার আক্রমণ বলে উঠে এসেছে সাম্প্রতিক এক গবেষণায়।
গবেষণাটি করেছে ‘মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটি’, ‘ইয়েল ইউনিভার্সিটি’ ও ‘জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটি’র গবেষকদের নেতৃত্বে পরিচালিত একটি দল।
গত ১৫ বছরে এ ধরনের সাইবার হামলার ফলে ২৮ কোটি ৫০ লাখ রোগীর ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস হয়েছে বলে উঠে এসেছে এ গবেষণায়। গবেষণাটি প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘জামা নেটওয়ার্ক ওপেন’‑এ।
র্যানসমওয়্যার হচ্ছে এক ধরনের সাইবার হামলা, যেখানে ভুক্তভোগীর ডিজিটাল ফাইল এনক্রিপ্ট করে বন্ধ করে দেয় এবং ওইসব ফাইলে ফের ব্যবহারযোগ্য করতে মুক্তিপণ দাবি করে হ্যাকাররা।
র্যানসমওয়্যার হামলার কারণে স্বাস্থ্যসেবা খাতে রোগীদের সংবেদনশীল তথ্য জিম্মি হয়ে পড়ে। ফলে বিভিন্ন হাসপাতালকে চিকিৎসা বিলম্বিত করতে, সিস্টেম বন্ধ করে দিতে ও অনেক সময় রোগীদের অন্য প্রতিষ্ঠানে পাঠিয়ে দিতে হয় বলে প্রতিবেদনে লিখেছে বিজ্ঞানভিত্তিক সাইট নোরিজ।
র্যানসমওয়্যারকে স্বাস্থ্যসেবা সাইবার নিরাপত্তার “সবচেয়ে ব্যাঘাত সৃষ্টিকারী শক্তি” হিসেবে বর্ণনা করেছেন ‘মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটি’র অধ্যাপক ও এ গবেষণার প্রধান লেখক জন জিয়াং।
২০১০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত হাসপাতাল, চিকিৎসকদের চেম্বার, স্বাস্থ্য বীমা প্রতিষ্ঠান ও ডেটা ক্লিয়ারিংহাউস’সহ স্বাস্থ্যসেবার বিভিন্ন ক্ষেত্রে র্যানসমওয়্যারের প্রভাব নিয়ে করা এ গবেষণাটিই প্রথম বিস্তৃত বিশ্লেষণ।
গবেষণার ফলাফলে উঠে এসেছে, ২০২৪ সালে স্বাস্থ্যসেবায় ঘটে যাওয়া সব ডেটা লঙ্ঘনের মধ্যে র্যানসমওয়্যারের ঘটনা ছিল ১১ শতাংশ। তবে সেইসব হামলার মাধ্যমে পুরো বছরে যে রোগীর তথ্য ফাঁস হয়েছে তার ৬৯ শতাংশের জন্য দায়ী র্যানসমওয়্যারই।
গবেষকরা বলছেন, একই ব্যক্তি একাধিকবার এ ধরনের হামলার শিকার হতে পারেন।
গবেষণায় আরও উঠে এসেছে, স্বাস্থ্যসেবায় র্যানসমওয়্যার হামলার ঘটনা ব্যাপকভাবে বেড়েছে। অথচ ২০১০ সালে কোনো র্যানসমওয়্যার হামলার রেকর্ডই ছিল না।
২০২১ সালের মধ্যে র্যানসমওয়্যারের ঘটনা বেড়ে দাঁড়ায় দুইশো ২২টিতে, যা সেই বছরের সব বড় ধরনের স্বাস্থ্যসেবা তথ্য ফাঁসের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ।
র্যানসমওয়্যার’সহ হ্যাকিংয়ের কারণে যেসব তথ্য ফাঁস হয়েছে সেই ধরনের ঘটনা ২০১০ সালে ছিল চার শতাংশ। তবে ২০২৪ সালে তা বেড়ে হয়েছে ৮১ শতাংশ। ২০১০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে মোট ৭৩ কোটি ২০ লাখ রোগীর তথ্য ফাঁস হয়েছে, যার ৮৮ শতাংশই ঘটেছে হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে।
এ গবেষণার ‘ইয়েল স্কুল অফ মেডিসিন’-এর অধ্যাপক জোসেফ রস ও ‘জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটি’র অধ্যাপক জিও বাই বলেছেন, প্রকৃত র্যানসমওয়্যার হামলার সংখ্যা সম্ভবত আরও বেশি।
তারা বলেছেন, অনেক স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান সাইবার হামলার ঘটনা প্রকাশ করতে দ্বিধা বোধ করে, বিশেষ করে যখন মুক্তিপণ দেওয়ার প্রশ্ন আসে। আর যেসব ছোটখাটো সাইবার হামলার শিকার পাঁচশ জনের কম মানুষ হয় সেগুলো সাধারণত প্রকাশ্যে আসেই না।
রস বলেছেন, ডিজিটাল স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। র্যানসমওয়্যার হামলা কেবল রোগীর প্রাইভেসিই লঙ্ঘন করে না, বরং চিকিৎসা সেবা ব্যাহত করে, মানুষের আস্থা নষ্ট করে ও এসব সমস্যা সামলাতে রোগী দেখার বদলে সময় ও সম্পদ ব্যয় করতে হয় চিকিৎসাকর্মীদের।
গবেষণাটি করা হয়েছে আগের এক গবেষণার ভিত্তিতে, যেখানে উঠে এসেছিল, আগে স্বাস্থ্যসেবায় ডেটা ফাঁসের প্রধান কারণ ছিল কোনো প্রতিষ্ঠানের ভেতরের ভুল। যেমন ভুল ঠিকানায় ইমেইল পাঠানো বা ডিভাইস হারিয়ে যাওয়ার মতো বিষয়।
২০১৯ সালে গবেষণায় উঠে এসেছিল, ৭০ শতাংশের বেশি তথ্য ফাঁসের ঘটনা সংবেদনশীল ডেমোগ্রাফিক বা আর্থিক তথ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। যেমন ‘সোশাল সিকিউরিটি’ নম্বর ও ব্যাংক অ্যাকাউন্টের তথ্য, যা পরিচয় চুরি বা প্রতারণার কারণ হতে পারে। তবে বিস্ময়কর বিষয় হচ্ছে, ওই সময় মানসিক স্বাস্থ্য বা ক্যান্সার ডায়াগনোসিসের মতো মেডিক্যাল তথ্য ফাঁসের ঘটনা কম ছিল।
ভবিষ্যতে সাইবার আক্রমণের ঝুঁকি কমাতে সরকারের কঠোর নিয়ম-কানুনের সুপারিশ করেছেন গবেষকরা। তারা বলেছেন, হাসপাতাল ও বিভিন্ন বীমা প্রতিষ্ঠানকে র্যানসমওয়্যার হামলা হলে তা জানানো বাধ্য করতে হবে।
এ ছাড়াও, ডেটা ফাঁসের বিষয়টি মূল্যায়নের সময় কেবল চুরি হওয়া রেকর্ডের সংখ্যাই নয়, বরং এতে রোগীর সেবায় কী প্রভাব পড়েছে তা-ও বিবেচনায় নেওয়া উচিত। একইসঙ্গে ক্রিপ্টোমুদ্রার ওপরও নজরদারি করা উচিত, যাতে হ্যাকারদের জন্য মুক্তিপণ সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়ে।