এক মাসের উত্থানে তৈরি ‘স্বপ্ন’ ফিকে চার দিনের পতনে
সবচেয়ে বেশি দর হারানো ১০টি কোম্পানির ৭টি জীবন বীমার, দুটি সাধারণ বীমার।
প্রায় দুই মাস ধরে পুঁজিবাজারে একটু একটু করে চাঙ্গাভাব ফেরার মধ্যে হঠাৎ টানা দরপতন বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
ফ্লোর প্রাইসের বেশি থাকা বেশিরভাগ কোম্পানির ব্যাপক দরপতনে লোকসানি কোম্পানির শেয়ারদরে লাফ দেখা গিয়েছে।
বুধবার সপ্তাহের চতুর্থ কর্মদিবসে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সাধারণ সূচক ডিএসইএক্স কমেছে ২৪ পয়েন্ট। এ নিয়ে চলতি সপ্তাহের চার দিনে কমল ৭৮ পয়েন্ট।
আগের দিন ১১ পয়েন্ট, সোমবার ৩১ পয়েন্ট এবং রোববারও সূচক পড়েছিল ১১ পয়েন্ট।
এই ক্রমাগত দরপতনে ফ্লোর প্রাইস ছাড়িয়ে যাওয়া অনেক কোম্পানি আবার বেঁধে দেওয়ার সর্বনিম্ন দরে ফিরছে। আর দাম বাড়ার পর বিনিয়োগকারীরা বেশি পরিমাণে শেয়ার কেনায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন আরও।
সূচক কমার সঙ্গে সঙ্গে আবার দেখা দিয়েছে লেনদেনের খরা। হাজার কোটি টাকার ঘর ছাড়িয়ে যাওয়ার পর কমতে কমতে এখন ছয়শ থেকে সাতশ কোটি টাকার ঘরে নেমেছে তা।
গত ১৫ মে সূচক ছিল ৬ হাজার ২৬০ পয়েন্ট। লেনদেন ছিল প্রায় ৬৫৪ কোটি। সেখান থেকে একটু একটু করে সূচকের উত্থানে ৪ জুন দাঁড়ায় ৬ হাজার ৩৬৬ পয়েন্ট। তার পরের দিনি লেনদেন দাঁড়ায় ১ হাজার ২৫৬ কোটি টাকারও বেশি।
পুঁজিবাজারের এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা যায় আসলে গত ঈদুল ফিতরের আগে থেকে। ঈদের পর প্রথমে খাদ্য ও আনুষঙ্গিক এবং পরে বীমা খাতের ওপর ভর করে আগাতে থাকে পুঁজিবাজার।
মাসের পর মাস ধরে চলে আসা মন্দা কাটিয়ে বাজার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরবে, এমন আশায় ছিলেন বিনিয়োগকারীরা। কিন্তু লেনদেন ও সূচক সাত মাসের সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছার পর গত সপ্তাহের ৬ জুন হঠাৎ ঘটে ছন্দপতন।
বেশিরভাগ কোম্পানিই ফ্লোর প্রাইসে আটকে থাকার পরও ৪০ পয়েন্ট সূচকের পতনে তৈরি হয় বিস্ময়।
পরে জানা যায়, মূলধনী আয়ে কর বসার গুজবে প্রভাবিত হয়েছিলেন বিনিয়োগকারীরা। বিষয়টি নিয়ে বিভ্রান্তি কাটায় পরের দুই দিন বাজারে উত্থান হয়। কিন্তু চলতি সপ্তাহের লেনদেন বিনিয়োগকারীদেরকে আবার হতাশার বৃত্তে ফেলে দিল।
বুধবার ৪৫টি কোম্পানির শেয়ারের দর বৃদ্ধির বিপরীতে দর হারিয়েছে ১১৭টি। ১৭৫টি কোম্পানি আগের দিনের দরে হাতবদল হয়েছে। লেনদেন হয়েছে মোট ৩৩৭টি কোম্পানির শেয়ার। ৫২টি কোম্পানির ক্রেতা ছিল না।
পতনের মূল ঝাপটা ফের বীমায়
সাধারণ বীমার বহু কোম্পানির শেয়ারদর ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ বেড়ে যাওয়ার পর দুই সপ্তাহ ধরে ছিল সংশোধনে। তবে জীবন বীমা এর মধ্যেও দেখাচ্ছিল দাপট। লেনদেনের কোনোদিন ৩০ শতাংশ, কোনোদিন ৩৪ শতাংশ হতো এই খাতের ১৫টি কোম্পানিতে।
চলতি সপ্তাহে এই জীবন বীমা খাতেই দর কমেছে সবচেয়ে বেশি। প্রতিদিনেই দরপতনের শীর্ষে থাকা বেশিরভাগ কোম্পানিই একটি খাতের দেখা গেছে।
একই চিত্র দেখা গেল আবার। সবচেয়ে বেশি দর হারানো ১০টি কোম্পানির মধ্যে নয়টিই বীমা খাতের। এর মধ্যে সাতটি জীবন বীমা কোম্পানি, দুটি সাধারণ বীমা।
এর মধ্যে ৯ শতাংশের বেশি দর হারিয়েছে সোনারী লাইফ, ইউনিয়ন ইন্স্যুরেন্স ও মেঘনা লাইফ ইন্স্যুরেন্স।
গ্লোবাল ইন্স্যুরেন্স, প্রাইম লাইফ ও প্রগ্রেসিভ লাইফের দর কমেছে ৮ শতাংশের বেশি।
চার্টার্ড লাইফ, ট্রাস্ট ইসলামী লাইফ ও ফারইস্ট লাইফের দর কমেছে ৭ শতাংশের বেশি।
দরপতনের শীর্ষ দশে থাকা অপর কোম্পানিটি হলো বস্ত্র খাতের তসরিফা ইন্ডাস্ট্রিজ।
জীবন বীমার আরও চারটি কোম্পানি ৬ শতাংশের বেশি, একটি ৪ শতাংশের বেশি একটি প্রায় দুই শতাংশ দর হারিয়েছে।
জীবন বীমা কোম্পানিগুলোতে লেনদেন হয়েছে ১৪৮ কোটি টাকার কিছু বেশি, যা মোট লেনদেনের ২২ শতাংশ। গত সপ্তাহের শেষ কর্মদিবস বৃহস্পতিবার এই খাতের সব কোম্পানির দর বেড়েছিল, হাতবদল হয়েছিল ৩১০ কোটি ৪১ লাখ টাকা।
জীবন বীমার ১৫টি কোম্পানির মধ্যে দর হারিয়েছেন ১৪টি, একটি দর ধরে রেখে লেনদেন শেষ করে।
সাধারণ বীমার অবস্থা সে তুলনায় কিছুটা ভালো। হাতবদল হয়ো ৪১টি কোম্পানির মধ্যে দর হারিয়েছে ২৩টি। দর বেড়েছে ৯টির। আগের দিনের দরে হাতবদল হয়েছে সমান সংখ্যক কোম্পানি।
এই ৪১ কোম্পানিতে হাতবদল হয়েছে ৩১ কোটি ৮৬ লাখ টাকা, যা মোট লেনদেনের ৫ শতাংশেরও কম। দুই সপ্তাহ আগে পৌনে দুইশ কোটি টাকাও লেনদেন দেখা গিয়েছিল খাতটিতে।
দরপতনে লোকসানি কোম্পানির তেজ
জীবন বীমার ঢালাও পতনের দিন উত্থানে থাকা বেশিরভাগ কোম্পানিই লোকসানি এবং স্বল্প মূলধনী।
এর মধ্যে সার্কিট ব্রেকার ছুঁয়ে লেনদেন হওয়া চারটি কোম্পানির প্রতিটিই লভ্যাংশ দেওয়ার মতো অবস্থানে নেই।
এগুলো গলো আজিজ পাইপস, মেঘনা মিল্ক ও মেঘনা পেট ইন্ডাস্ট্রিজ এবং খুলনা পেপার মিলস।
দর বৃদ্ধির শীর্ষ দশে থাকা ইমাম বাটন, শ্যামপুর সুগার গত এক যুগেও লভ্যাংশ নিতে পারেনি। দুটি কোম্পানিরই দর বেড়েছে ৬ শতাংশেরও বেশি। ৫ শতাংশ দর বৃদ্ধি পাওয়া এপেক্স ট্যানারিও চলতি বছর বিপুল পরিমাণ লোকসানে আছে।
অষ্টম স্থানে থাকা ইয়াকিন পলিমারও লোকসানি প্রতিষ্ঠান। এর পরের দুটি কোম্পানি হলো পেপার প্রসেসিং ও দেশবন্ধু পলিমার। এগুলোর লভ্যাংশের ইতিহাস ভালো নয়।
