Published : 26 Apr 2023, 03:30 PM
ঈদের ছুটি শেষে পুঁজিবাজারে শেয়ার কেনায় ঝোঁক বাড়তে দেখা যাচ্ছে।
ঈদের আগে ও পরে মিলিয়ে সূচক বাড়ল টানা আট কর্মদিবস। জানুয়ারির তৃতীয় সপ্তাহের পর প্রথমবার টানা দুই দিন সাতশ কোটি টাকা ছাড়ানো লেনদেন দেখা গেল। এই লেনদেন চলতি বছরের তৃতীয় সর্বোচ্চ।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেইনে রাশিয়ার হামলার পর দরপতন শুরু হওয়া পুঁজিবাজারে এই প্রথমবারের মতো এমন প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
বুধবার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে সাধারণ সূচক ডিএসইএক্স ২.৮ পয়েন্ট বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ২৬৬ পয়েন্টে, যা গত ৯ ফেব্রুয়ারির পর সর্বোচ্চ। সেদিন ডিএসইএক্সের অবস্থান ছিল ৬ হাজার ২৮৩ পয়েন্ট।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে হাতবদল হয়েছে মোট ৩৪৮টি কোম্পানির শেয়ার। গত কয়েক মাসে এই সংখ্যাটিও সর্বোচ্চ। প্রায়ই তালিকাভুক্ত ৩৯২টি কোম্পানির মধ্যে ৮০ থেকে ৯০টি কোম্পানির একটি শেয়ারও হাতবদল না হতে দেখা গেছে। এই সংখ্যাটি নেমে এসেছে ৪২ এ।
এই কোম্পানিগুলোর মধ্যে দাম বেড়েছে ৬৪টির, হারিয়েছে ৭২টি আর আগের দিনের দরে লেনদেন হয়েছে ২১২টি কোম্পানি, সেগুলোর বেশিরভাগই ফ্লোর প্রাইসে আছে।
তবে লোকসানি ও স্বল্প মূলধনী দুর্বল কোম্পানির প্রতি বিনিয়োগকারীদের যে ঝোঁক, সেই প্রবণতা থেকে বের হওয়ার কোনো লক্ষণ নেই।
শেয়ার দরের তুলনায় ব্যাংক খাতে আকর্ষণীয় লভ্যাংশও বিনিয়োগকারীদেরকে এই খাতে আকৃষ্ট করতে পারছে না। বছরের পর বছর ধরে দারুণ লভ্যাংশ দিয়ে আসা বহুজাতিক শক্তিশালী কোম্পানির ক্রেতা নেই। ভালো দেশি কোম্পানির শেয়ারও ফ্লোর প্রাইসে গড়াগড়ি খাচ্ছে।
সূচক ও লেনদেনের প্রবণতায় স্বস্তি
গত ১২ এপ্রিলের পর থেকে এ নিয়ে সাত কর্মদিবসে সূচক বাড়ল ৬৯ পয়েন্ট।
এর মধ্যে ১২ এপ্রিল ৮ পয়েন্ট, পরদিন ১০ পয়েন্ট, ১৬ এপ্রিল ১ পয়েন্ট, তার পরের দিন ৬ পয়েন্ট এবং ঈদের ছুটির আগে সূচক বাড়ে ৫ পয়েন্ট।
ঈদে ৫ দিন ছুটি শেষে সোমবার সূচকে যোগ হয় ২৩ পয়েন্ট, পরদিন ১১ পয়েন্ট।
সূচকের পাশাপাশি লেনদেনও বাড়ছে ধারাবাহিকভাবেই। ১২ এপ্রিল লেনদেন ছিল ৪১১ কোটি টাকার কিছু বেশি। ঈদের ছুটিতে যাওয়ার আগে ১৮ এপ্রিল তা সাড়ে পাঁচশ কোটি টাকা ছাড়ায়।
ঈদের ছুটি শেষে সাধারণত লেনদেন কম থাকে। তবে এবার ছুটি শেষে প্রথম কর্মদিবস সোমবার ছুটিতে যাওয়ার আগের প্রায় সমান লেনদেনে ইঙ্গিত মেলে যে বিনিয়োগকারীরা সক্রিয় হতে শুরু করেছেন। সেদিনও লেনদেন হয় সাড়ে পাঁচশ কোটি টাকার বেশি। পরের দিন বা আরও বেড়ে ছাড়ায় ৭১৩ কোটি টাকা।
বুধবার সেটি আরও বেড়ে হল ৭৬৫ কোটি ৩৩ লাখ ৮৯ হাজার টাকা। চলতি বছর এটি তৃতীয় সর্বোচ্চ লেনদেন।
এর আগে গত ১৭ জানুয়ারি ৯০০ কোটি ৪৮ লাখ টাকা আর পরের দিন ৯৩৪ কোটি ২৯ লাখ ২৫ হাজার টাকা লেনদেন হয়েছিল।
গত দুই দিন বাদ দিলে এরপর আরও চারটি কর্মদিবস সাতশ কোটি টাকা ছাড়িয়ে লেনদেন হলেও পরের দিনই তা কমে যেতে দেখা যায়।
গত ২৫ জানুয়ারি ৭৩৪ কোটি টাকার বেশি লেনদেন হলেও পরের দিনই তা নেমে যায় ৫০৫ কোটিতে। এরপর ৫ ফেব্রুয়ারি আবার লেনদেন সাতশ কোটি টাকা ছাড়িয়ে হয় ৭৫২ কোটি ৭৪ লাখ ৭৬ হাজার টাকা। পরের দিনই তা নেমে আসে ৫৮০ কোটিতে।
৮ ফেব্রুয়ারি লেনদেন আরও বেড়ে হয় ৭৪৮ কোটি ৪৫ লাখ ৪৪ হাজার টাকায়। পরের কর্মদিবস ১২ ফেব্রুয়ারি তা নেমে আসে ৬০৮ কোটি টাকায়। এরপর ৬ মার্চ আবার লেনদেন হয় ৭২৭ কোটি ৩৮ লাখ ৯২ হাজার টাকা। পরের দিনই তা নেমে আসে ৬৪৯ কোটি ৫৪ লাখ টাকায়।
ইতিবাচক প্রবণতাতেও কাটেনি ভারসাম্যহীনতা
পুঁজিবাজারে ইতিবাচক প্রবণতাতেও লেনদেনে ভারসাম্যহীনতা কাটেনি। বুধবার কেবল ২০টি কোম্পানিতে লেনদেন হয়েছে মোট লেনদেনের ৬২ শতাংশেরও বেশি।
টপ টোয়েন্টিতে হাতবদল হয়েছে ৪৭৮ কোটি ৯৭ লাখ ১৪ হাজার টাকার শেয়ার। আর টপ টেনে লেনদেন হয়েছে মোট লেনদেনের ৪৪ শতাংশের মতো বা ৩৩৭ কোটি ৫৬ লাখ ৫৮ হাজার টাকা।
যেসব কোম্পানির দর বেড়েছে, সেগুলোতে হাতবদল হয়েছে মোট ৪০০ কোটি ৭৪ লাখ ৪৬ হাজার টাকা। আর যেগুলোর দরপতন হয়েছে, সেগুলোতে লেনদেন হয়েছে ২৮৫ কোটি ২০ লাখ টাকা।
যেগুলো আগের দিনের দরে হাতবদল হয়েছে, সেই ২১২টি কোম্পানি মিলিয়ে লেনদেন হয়েছে কেবল ৩১ কোটি ২০ লাখ ৫২ হাজার টাকা। এসব কোম্পানির মধ্যে অনেকগুলোই শক্তিশালী মৌলভিত্তির।
দর বৃদ্ধির শীর্ষে আবার লোকসানি কোম্পানির প্রাধান্য
দিনের দর বৃদ্ধির সর্বোচ্চ সীমা ছুঁয়ে লেনদেন হওয়া দুটি কোম্পানির মধ্যে মেঘনা পেট ইন্ডাস্ট্রিজ গত এক যুগেও লভ্যাংশ দিতে পারেনি লোকসানের কারণে।
বেসিক ব্যাংক ঋণ কেলেঙ্কারিতে বন্ধ থাকার পাঁচ বছর পর উৎপাদনে ফেরা এমারেল্ড অয়েলের অবিশ্বাস্য উত্থান থামছে না। গত ২ এপ্রিলও শেয়ারদর ছিল ৩০ টাকা ৮০ পয়সা। সেটি এখন ঠেকেছে ৫২ টাকা ৩০ পয়সায়।
লোকসানি বহুজাতিক কোম্পানি হাইডেলবার্গ সিমেন্ট আগের দুই দিনে ২১ শতাংশ দর বৃদ্ধির পর এদিন বেড়েছে আরও প্রায় ৭ শতাংশ।
এছাড়া স্বল্প মূলধনী এপেক্স ফুডের দর ৮.৭৪ শতাংশ, টানা কয়েক বছর ধরে ব্যবসার পরিস্থিতি ভালো না যাওয়া আফতাব অটোর দর ৮.১৬ শতাংশ, লভ্যাংশের ইতিহাস ভালো না থাকা স্বল্প মূলধনী সোনালী আঁশের দর ৭.৫২ শতাংশ, স্বল্প মূলধনী মনোস্পুল পেপারের দর ৬.৫৫ শতাংশ, দুর্বল কোম্পানি শাইনপুকুর সিরামিকস ৪.৬৫ শতাংশ, আমরা নেটওয়ার্ক ৪.১২ শতাংশ এবং নাভানা ফার্মার দর ৪.২০ শতাংশ বাড়ার পর সেগুলো দর বৃদ্ধির শীর্ষ দশে স্থান পেয়েছে।
আরও ছয়টি কোম্পানির দর ৬ শতাংশের বেশি, ১০টির দর ৩ শতাংশের বেশি, ৯টির দর ২ শতাংশের বেশি, ১৬টির দর বেড়েছে ১ শতাংশের বেশি। এগুলোর মধ্যে মৌলভিত্তির কোম্পানির সংখ্যা খুবই কম।
দরপতনের শীর্ষেও স্বল্পমূলধনীর আধিক্য
তৃতীয় পান্তিকে লোকসানের তথ্য জানানো ১০ কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধনের বিডি ল্যাম্পসের শেয়ারদর ৬.৩৫ শতাংশ কমে তার ফ্লোর প্রাইস ২৫২ টাকা ৩০ পয়সায় নেমে এসেছে।
গত বছরের অক্টোবরে হঠাৎ লাফাতে লাফাতে কোম্পানির শেয়ারদর প্রায় চারশ টাকা ছুঁয়ে ফেলেছিল।
এছাড়া লোকসানি ইয়াকিন পলিমারের দর ৪.৬২ শতাংশ, স্বল্প মূলধনী এপেক্স ফুটওয়্যারের দর ৪.৫১ শতাংশ, লোকসানি খান ব্রাদার্সের দর ৪.৩৮ শতাংশ, স্বল্প মূলধনী বিডি অটোকারের দর ৪.০৬ শতাংশ, ঈদের আগে লাফানো স্বল্প মূলধনী রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি এনটিসি ৩.৮৪ শতাংশ, দুর্বল কোম্পানি ফাইন ফুডস ৩.৪৮ শতাংশ, বিডিথাইফুডস ৩.০৯ শতাংশ, সিএপিএমআইবিবিটএল মিউচুয়াল ফান্ড ২.৯৪ শতাংশ, এবং তৃতীয় প্রান্তিকে মুনাফা সত্ত্বেও তিন প্রান্তিকে বড় লোকসান দেওয়া স্টাইলক্রাফটের দর কমেছে ২.৮৬ শতাংশ।
আরও ১৩টি কোম্পানির দর ২ শতাংশের বেশি, ২৪টির দর ১ শতাংশের বেশি কমেছে।