২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫ আশ্বিন ১৪৩৩

‘দ্য লিটল ডেভিল’ গ্রিজমান

টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয়ের জন্য ফরাসিরা এই ফরোয়ার্ডের দিকেও তাকিয়ে থাকবে বড় আশা নিয়ে।

মোহাম্মদ জুবায়ের মোহাম্মদ জুবায়ের

দোহা থেকে

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 17 Dec 2022, 11:23 AM

Updated : 17 Dec 2022, 11:23 AM

ভূমিকায় একটু বদল। ক্লাব ফুটবলে যতটা সম্মুখভাগের যোদ্ধা, ফ্রান্স দলে ঠিক ততটা নন। সামনে অলিভিয়ে জিরুদ আর দুই পাশে কিলিয়ান এমবাপে ও উসমান দেম্বেলের মধ্যে যোগসূত্র ধরে রাখার নাটাই অঁতোয়ান গ্রিজমানের হাতে। প্রয়োজন অনুযায়ী তিনি সুতো ছাড়ছেন, টেনে ধরছেন, কাতার বিশ্বকাপে ফ্রান্সের পতাকাও উড়ছে দুর্বার গতিতে।

লুসাইল স্টেডিয়ামে রোববার আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ফাইনালে মুখোমুখি হবে ফ্রান্স। ব্রাজিলের (১৯৫৮ ও ১৯৬২ আসরে জয়ী) ৬০ বছর পর প্রথম দল হিসেবে টানা দুইবার শিরোপা জয়ের হাতছানি ফরাসিদের সামনে। ৩৬ বছরের হাহাকারের ইতি টানতে মরিয়া আর্জেন্টিনা।

ফরাসি কোচ দিদিয়ের দেশমও দাঁড়িয়ে আছেন রেকর্ড বইয়ের সামনে। বাজিমাত করতে পারলে পাতায় পাতায় উঠবে তার নাম। এরমধ্যে সবচেয়ে উজ্জ্বলটি হতে পারে, ফুটবল ইতিহাসের প্রথম কোচ হিসেবে দুটি ও খেলোয়াড় হিসেবে একটি বিশ্বকাপ জয়ের অনন্য কীর্তি গড়া। অনির্বচনীয় প্রাপ্তির হাতছানিতে সাড়া দিতে এবং এমন কঠিন মহারণে জয়ের ছকে ফরাসি কোচ তাকিয়ে থাকবেন গ্রিজমানের দিকেও।

ফাইনালের আগে অবশ্য ফ্রান্সের তাঁবুতে হানা দিয়েছে অসুখ-বিসুখ। সবশেষ খবর, নির্ভরযোগ্য দুই ডিফেন্ডার রাফায়েল ভারানে ও ইব্রাহিমা কোনাতে সর্দি-কাঁশিতে ভুগছেন। এর আগে অসুস্থতার কবলে পড়েছিলেন সেন্টার-ব্যাক দায়দ উপেমেকানো ও মিডফিল্ডার আদ্রিওঁ রাবিও। মরক্কোর বিপক্ষে ২-০ গোলে জেতা সেমি-ফাইনালে খেলতে পারেননি কেউই। এমন চলতে থাকলে গ্রিজমানের কাঁধে দায়িত্বের চাপ বাড়তে পারে আরও।

মরুদ্যানে ফাইনাল পর্যন্ত পথচলায় মাত্র একবারই হার মেনেছে ফরাসিরা। গ্রুপ পর্বে নিজেদের শেষ ম্যাচে দেশমের দল হোঁচট খায় তিউনিসিয়ার কাছে হেরে। এরপর একের পর এক জয়ের গল্প দলটি লিখছে দুই গোলমেশিন এমবাপে ও জিরুদের চওড়া কাঁধে সওয়ার হয়ে। এ দুজনকে প্রতি ম্যাচে আক্রমণের রসদ নিরবিচ্ছিন্নভাবে জুগিয়ে চলেছেন গ্রিজমান, যদিও আতলেতিকো মাদ্রিদের এই ফরোয়ার্ড রয়েছেন আড়ালে।

ফুটবলে যেহেতু গোলই শেষ কথা, ৫ গোল করা এমবাপে ও ৪ বার জালের দেখা পাওয়া জিরুদকে নিয়ে যত মাতামাতি। গ্রিজমান হয়তো গোল পাননি, কিন্তু বন লতার মতো আড়ালে বেড়ে উঠছেন, রং ছড়াচ্ছেন ঠিকই।

কখনও নিচে নেমে জুল কুন্দে, রাফায়েল ভারানেদের সঙ্গে কাঁধ মেলাচ্ছেন রক্ষণে, এরপর বল কুড়িয়ে ছুটছেন এমবাপে-দেম্বেলেদের দিকে। দিগ্বিদিক ছুটছেন, কিন্তু দিশেহারা নন মোটেও। এরই মধ্যে তাই অ্যাসিস্ট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে তিনটি। চলতি আসরে এখন পর্যন্ত যা যৌথভাবে সর্বোচ্চ।

এর মধ্যে দুটি ইংল্যান্ডের বিপক্ষে কোয়ার্টার-ফাইনালের দ্বৈরথে। সপ্তদশ মিনিটে অহেলিয়া চুয়ামেনি ও ৭৮তম মিনিটে জিরুদের গোলের সুর তিনি বেঁধে দিয়েছিলেন নিখুঁত পাসে। গ্রুপ পর্বে ডেনমার্ককে হারিয়ে নকআউট পর্ব নিশ্চিত করার ম্যাচে ৮৬তম মিনিটে এমবাপের গোলের নেপথ্যেও গ্রিজমানের ক্রস। আড়ালে-আবডালে থেকে হাসিমুখে প্রতিপক্ষের স্বপ্ন খুন করে দিতে পারদর্শী বলেই তার নাম ‘দ্য লিটল ডেভিল।”

সম্প্রতি অবশ্য পল পগবা প্রিয় সতীর্থকে নতুন নাম দিয়েছেন- গ্রিজমানকঁতে। ২০১৮ বিশ্বকাপে ফরাসিদের বাজিমাত করার পেছনে দারুণ ভূমিকা ছিল মাঝমাঠের দুই তারকা পগবা ও এনগোলো কঁতের। দেশমের পরিকল্পনা এবারও দুজন ছিলেন গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু চোটের হানায় মরুর আসর থেকে ছিটকে যান দুজনই।

মুকুট ধরে রাখার মিশন শুরুর আগে নড়বড়ে মাঝমাঠ নিয়ে একটু দুঃশ্চিন্তা দেশমের ছিলই। কিন্তু গ্রিজমান বজ্র আটুঁনি দিয়ে চিন্তামুক্ত রেখেছেন কোচকে। দূর থেকে তাই ৩১ বছর বয়সী সতীর্থকে প্রশংসায় ভাসিয়েছেন পগবা। অবশ্য ‘গ্রিজমানকঁতে’ উপমার সঙ্গে তিনি চাইলে নিজের নাম জুটিয়ে বিশেষণটি বড় করলেও মন্দ হত না!

ফুটবলের আঙিনায় গ্রিজমানের পথচলায় যা একটু ‘মন্দ’ তা অবশ্য ঘটে গেছে তার ছেলেবেলাতে। ধনী পরিবারে জন্ম। বাবা ছিলেন ম্যকঁর একসময়ের কাউন্সিলর। মা চাকরি করতেন হাসপাতালে। ছোট বেলায় তিনি হাত ধরেছিলেন পর্তুগিজ ফুটবলার দাদা আমারো লোপেসের। কিন্তু ছোটখাট ধনীর দুলাল হলেও গড়নে এবং হালকা-পাতলা বলে লিওঁ ছাড়াও কয়েকটি দল ফিরিয়ে দিয়েছিল তাকে।

এরপর ম্যকঁর স্থানীয় দলে খেলার সুযোগ মেলে। লোকে বলে, রাজনীতিক বাবা প্রভাব খাটিয়ে পথটা করে দিয়েছিলেন। সেই যাই হোক, পরে আর পথহারা হননি গ্রিজমান। জিনেদিন জিদান, থিয়েরি অঁরিকে আদর্শ মেনে বেড়ে উঠেছেন। ক্লাব ফুটবলে, জাতীয় দলে পারফরম্যান্স মেলে ধরে উঠে এসেছেন পাদপ্রদীপের আলোয়।

এরই মধ্যে একটি বিশ্বকাপ জয়ের অনির্বচনীয় স্বাদ তার সঙ্গী; আরেকটি জয়ের অপেক্ষা। প্রাপ্তির হাসিতে এই অপেক্ষার সমাপ্তি টানতে আড়ালে থেকে আবারও নিজের কাজটুকু ঠিকঠাক করতে হবে গ্রিজমানকে। অবশ্য রাজনীতিক পরিবারের ছেলে হলেও একটু আড়াল পছন্দ করেন তিনি। এমনকি বিয়েটাও তিনি সেরেছিলেন গোপনে। লোকে গ্রিজমানের বিয়ের নাম দিয়েছিল ‘সিক্রেট ওয়েডিং!’