Published : 07 Jun 2026, 06:16 PM
চোখেমুখে সবসময়ই লেগে থাকে কিশোরসুলভ হাসি। তবে বল পায়ে এলেই চোখের পলকে বদলে যায় তার হাবভাব। বয়স মাত্র ১৮; কিন্তু প্রতিপক্ষের জন্য এই বয়সেই ভীষণ বিপজ্জনক হয়ে উঠেছেন লামিনে ইয়ামাল। দুই বছর আগে স্পেনকে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ জেতানো এবং টুর্নামেন্টের সেরা তরুণ খেলোয়াড়ের স্বীকৃতি পাওয়া এই ফরোয়ার্ডের সামনে এবার আরও বড় উপলক্ষ-বিশ্বকাপের মঞ্চ। শ্রেষ্টত্বের পথে কতটা এগোতে পারবেন ইয়ামাল?
২০২৬ বিশ্বকাপে নিজ দেশের স্বপ্নের সারথীদের নিয়ে ফিফার আয়োজন ২৬ সুপারস্টার। এই পর্বে আছেন স্প্যানিশ ফরোয়ার্ড লামিনে ইয়ামাল।
২০২৪ সালে ইউরোর ট্রফি উঁচিয়ে ধরে ১৮ বছরে পা রাখেন এই সেনসেশন। আগামী ১৩ জুলাই ১৯ বছর পূর্ণ করে ২০-এ যাত্রা করবেন তিনি, আসছে বিশ্বকাপের সেমি-ফাইনালের ঠিক আগের দিন। তবে ইয়ামালের স্বপ্নের পরিধি নিশ্চয় আরও বড়; ১৯ জুলাইয়ে মেট লাইফ স্টেডিয়ামে সেরার মুকুট মাথায় তোলা।
জাতীয় দলে অভিষেকের এক বছরের মধ্যে, ২০২৪ সালে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ জয়ের স্বাদ পান ইয়ামাল। বার্সেলোনার জার্সিতে যে দুরন্ত গতিতে তিনি ছুটছেন, পাশাপাশি দেশের হয়েও পারফরম্যান্সে যে ধারাবাহিক মান ধরে রেখেছেন, তাহলে এবার সোনালী ট্রফিটি কেন নয়?
ফুটবলের ময়দানে ইয়ামালের অর্জন
এই বয়সেই ছয়টি শিরোপা জয়ের স্বাদ পেয়েছেন ইয়ামাল; ক্লাব বার্সেলোনার হয়ে পাঁচটি, অন্যটি স্পেনের হয়ে মহাদেশ সেরার ট্রফি।
বার্সেলোনা ‘বি’ দলে নিজেকে শাণিয়ে তোলা ইয়ামালের মূল দলে অভিষেক হয় ২০২৩ সালের এপ্রিলে। পরের মাসেই লা লিগা ট্রফি জয় নিশ্চিত করে ক্লাবটি, যে দলের অংশ ছিলেন ইয়ামাল।
এর পরের বছর, জার্মানিতে লুইস দে লা ফুয়েন্তের কোচিংয়ে ইউরোপ জয় করে ইয়ামাল ও তার সতীর্থরা, চতুর্থ ইউরো ট্রফি ঘরে তোলে তারা।
গত মৌসুমে বার্সেলোনার হয়ে ইয়ামাল জিতেছেন তিনটি ট্রফি- লা লিগা, কোপা দেল রে ও স্প্যানিশ সুপার কাপ। আর গত জানুয়ারিতে দ্বিতীয়বারের মতো এই সুপার কাপ জয়ের স্বাদ পেয়েছেন তিনি।
গ্রেটদের চোখে ইয়ামাল
“লামিনে (মাঠে) যা কিছু করছে এবং এখন পর্যন্ত যা অর্জন করেছে, দারুণ ব্যাপার। স্পেনের হয়ে ইতোমধ্যেই সে একবার ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন।”
- লিওনেল মেসি
“সে অসাধারণ খেলোয়াড়। সে ঈশ্বরের আশীর্বাদপুষ্ট। কিছু খেলোয়াড়ের নিজস্ব কিছু বিশেষত্ব থাকে। আমি কারো মধ্যে তুলনা করতে চাই না। তবে যারা মেধাবী, সুপারস্টার, ফুটবল জিনিয়াস এবং যারা ইতিহাস গড়েছেন, তাদের সবারই স্পেশাল কিছু ছিল।”
- লুইস দে লা ফুয়েন্তে
“সে অনন্য ধাঁচের খেলোয়াড়, জিনিয়াস। সে সত্যিই স্পেশাল।”
- হান্সি ফ্লিক
“মেসি ও আমি ইতিহাস গড়েছি এবং এখন লামিনে ইয়ামালের পালা। এই তরুণ বয়সেই সে যা দেখিয়েছে, অসাধারণ। সে অবিশ্বাস্য রকমের মেধাবী। আমি তার মতো ফুটবলারদের খেলা উপভোগ করি। আশা করি, তারও আমাদের মতো ক্যারিয়ার হবে।”
- রোনালদিনিয়ো
“এখনই সে (ইয়ামাল) যতটা পরিণত, খেলোয়াড়রা সাধারণত ২৪-২৫ বছর বয়সের আগে হয় না। তবে বিষয়টা যখন এমন প্রতিভাবান খেলোয়াড়ের, তখন আপনার মনে হতে পারে যখনই সে বল পাবে তখনই অবিশ্বাস্য কিছু করবে…কিন্তু সেটা হবে না (সবসময়)। সে বল হারাবে, ওয়ান-টাচে খেলবে, তিন মিনিট বিশ্রাম নেবে এবং এরপর আবার ওয়ান-টাচে খেলবে। সে ছোট দুরত্বে ড্রিবল করবে, সঙ্গে লেগে থাকা প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করবে এবং নিয়ন্ত্রিত পাস দেবে। এরপর সে এগিয়ে যাবে এবং আপনাকে ম্যাচ জেতাবে।”
- পেপ গুয়ার্দিওলা
“এই ছোট ছেলেটা শুরু থেকেই দারুণ খেলছে। সে এমন এক ক্লাবে আছে, যারা তাকে (বেড়ে উঠতে) সাহায্য করছে এবং তার জাতীয় দলও ঠিক তাই করছে। তার অনেক প্রতিভা আছে এবং সেই প্রতিভা বিকাশের জন্য সে আদর্শে আবহে আছে।”
- ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো
পরিসংখ্যানের আলোয় ইয়ামাল
• ২০২৩ সালের ২৯ এপ্রিল, ১৫ বছর ৯ মাস ১৬ দিন বয়সে বার্সেলোনার মূল দলে অভিষেক হয় ইয়ামালের। গড়েন ক্লাবটির ইতিজহসে সর্বকনিষ্ট খেলোয়াড় হওয়ার কীর্তি।
• বার্সেলোনার একাডেমি লা মাসিয়া থেকে উঠে আসা এই ফরোয়ার্ড পরবর্তীতে আরও গড়েন উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগে সবচেয়ে কম বয়সে (১৬ বছর ৮৩ দিন) শুরুর একাদশে খেলার রেকর্ড, সবচেয়ে কম বয়সে (১৬ বছর ১০৭ দিন) ক্লাসিকোয় খেলার কীর্তি এবং সবচেয়ে কম বয়সে (১৬ বছর ৩১০ দিন) বার্সেলোনার হয়ে ৫০টি অফিসিয়াল ম্যাচ খেলার রেকর্ড।
• স্পেন জাতীয় দলের হয়েও সর্বকনিষ্ট ফুটবলারের রেকর্ডটি ইয়ামালের; ২০২৩ সালের ৮ সেপ্টেম্বর জর্জিয়ার বিপক্ষে ৭-১ গোলে জয়ের ম্যাচে মাঠে নেমে কীর্তিটি গড়েন তিনি, সেদিন তার বয়স ছিল ১৬ বছর ৫৭ দিন। কেবল তাই নয়, ওই ম্যাচে জালে বল পাঠিয়ে জাতীয় দলের ইতিহাসে সবচেয়ে কম বয়সে গোল করার রেকর্ড গড়েন তিনি।
• লা লিগার ইতিহাসের সবচেয়ে কম বয়সী গোলদাতাও ইয়ামাল; ২০২৩ সালের ৮ অক্টোবর গ্রানাদার বিপক্ষে রেকর্ডটি গড়েন তিনি, ১৬ বছর ৮৭ দিন বয়সে।
• সবচেয়ে কম বয়সে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে মাঠে নামার কীর্তিও গড়েন ইয়ামাল। এর ঠিক ২৪ দিন পর, অসাধারণ এক বাঁকানো শটে জালে বল পাঠিয়ে টুর্নামেন্টের ইতিহাসে সর্বকনিষ্ট গোলস্কোরারের রেকর্ডটিও গড়েন তিনি।
তার ওই গোলেই ফ্রান্সের বিপক্ষে সমতায় ফিরেছিল স্পেন, পরে ম্যাচটি তারা জেতে ২-১ ব্যবধানে। আর ফাইনালে ইংল্যান্ডকে একই ব্যবধানে হারিয়ে শিরোপা ঘরে তোলে স্প্যানিশরা।
• ২০২৪-২৫ মৌসুমে বার্সেলোনার জার্সিতে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ১৮ গোল ও ২৫টি অ্যাসিস্ট করেন ইয়ামাল। চলতি মৌসুমেও একই ছন্দে ছুটছেন তিনি; ক্লাবের হয়ে এখন পর্যন্ত ৩৬ ম্যাচে ১৯টি গোল ও ১৫টি অ্যাসিস্ট করেছেন তিনি।
বিশ্বকাপে ইয়ামাল ও স্পেনের আশা
স্পেনের মতো একটা দলের বিশ্বকাপ ঘিরে প্রত্যাশা একটাই-শিরোপা জয়। টপ ফেভারিটদের একটি হয়েই বিশ্বকাপ অভিযানে নামবে ২০১০ আসরের চ্যাম্পিয়নরা।
২০২৪ এর ইউরো জয়ের অভিযানে দলের আক্রমণভাগের শক্তি আরও বাড়িয়ে এবং প্রতিপক্ষ শিবিরে ভীতি ছড়িয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ তো ইতোমধ্যেই দিয়েছেন ইয়ামাল। সময়ের সঙ্গে তা আরও বিকশিত হয়েছে। দলটির দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্নের বড় নিয়ামক হতে পারেন তিনি।
জাতীয় দলের হয়ে এখন পর্যন্ত ২৩ ম্যাচ খেলে ছয়টি গোল ও ১২টি অ্যাসিস্ট করেছেন ইয়ামাল। আর বার্সেলোনার জার্সিতে তো নিয়মিতই ব্যবধান গড়ে দিচ্ছেন।
এবার দেশের মানুষকে আরও বড় উৎসব উপহার দেওয়ার চ্যালেঞ্জ। পারবেন ইয়ামাল? পারবে স্পেন?
প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পাওয়া কেপ ভার্দের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে আগামী ১৫ জুন আসরে যাত্রা শুরু হবে স্পেনের। ‘এইচ’ গ্রুপে তাদের অন্য দুই প্রতিপক্ষ উরুগুয়ে ও সৌদি আরব।