১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

২০২৬ বিশ্বকাপের ২৬ সুপারস্টার: ব্রুনো ফের্নান্দেস

প্রিমিয়ার লিগে নিজেকে যে উচ্চতায় তুলেছেন, একই মানের ফুটবল সর্বোচ্চ মঞ্চে কি খেলতে পারবেন তিনি- প্রত্যাশার সঙ্গে এখন উত্তর মেলার অপেক্ষা।

স্পোর্টস ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 07 Jun 2026, 06:14 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:17 PM

খেলাটাকে খুব দ্রুত পড়তে পারেন, আশেপাশের সবার চেয়ে সবসময়ই যেন কয়েক সেকেন্ড এগিয়ে থাকেন ব্রুনো ফের্নান্দেস। যার কোনো ক্লান্তি নেই, প্রতিপক্ষের কৌশল ভেঙে দিতে দারুণ পারদর্শী। ক্লাব ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড হোক কিংবা পর্তুগাল জাতীয় দল-অসাধারণ মেধা আর দক্ষতায় দুই শিবিরেই হয়ে উঠেছেন ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ একজন। আলাদা করে নজর কেড়েছে যার নেতৃত্বগুণও। তার দেশের মানুষ খুব করে চাইবে, আসছে বিশ্বকাপেও যেন পার্থক্য গড়ে দিতে পারেন এই প্লেমেকার।

২০২৬ বিশ্বকাপে নিজ দেশের স্বপ্নের সারথীদের নিয়ে ফিফার আয়োজন ২৬ সুপারস্টার। এই পর্বে আছেন পর্তুগিজ অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার ব্রুনো ফের্নান্দেস।

ব্রুনো ফের্নান্দেসের পথচলা ও অর্জন 

স্বদেশের ক্লাব বোয়াভিস্তার যুব দল থেকে উঠে আসা ফের্নান্দেসের পেশাদার ক্যারিয়ার শুরু ইতালির ফুটবলে। নোভারা, উদিনেজে ও সাম্পদোরিয়ায় নিজেকে আরও শানিয়ে তুলে তিনি ফিরে যান পর্তুগালে, যোগ দেন স্পোর্তিং সিপিতে। মূলত এখান থেকেই তারকারাজিতে নিজের নাম যোগ করার যাত্রা শুরু করেন ফের্নান্দেস।

লিসবনের ক্লাবটিতে অল্প সময়েই নিজেকে খুব গুরুত্বপূর্ণ একজন করে তোলেন তিনি। তারকা উইঙ্গার নানি স্পোর্তিং ছেড়ে অরল্যান্ডো সিটিতে পাড়ি জমালে, তার শূন্যস্থানে নিজের নেতৃত্বগুণকে আরও বিকশিত করেন ফের্নান্দেস, সেই সঙ্গে গোল করাতেও। ক্লাবটির হয়ে লিগ ও সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে মৌসুমের সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়ার কীর্তিও গড়েন তিনি এবং টানা দুই মৌসুমে (২০১৭-১৮ ও ২০১৮-১৯) পর্তুগালের বর্ষসেরা ফুটবলারের স্বীকৃতিও পান এই মিডফিল্ডার। 

স্পোর্তিংয়ের জার্সিতে সব মিলিয়ে করেন ১৩৭ ম্যাচে ৬৩টি গোল ও ৫০টি অ্যাসিস্ট-একজন মিডফিল্ডারের জন্য যা অসাধারণ।

এরপর তার ক্যারিয়ারে সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং পর্বের শুরু, ২০২০ সালের জানুয়ারিতে ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে যোগ দেওয়ার মধ্য দিয়ে। যে ক্লাব দীর্ঘদিন ধরে সাফল্য খরায় ভুগছে, তাদেরকে পুনরায় শ্রেষ্টত্বের আসনে বসানোর খুব কঠিন এক লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নামেন ফের্নান্দেস। 

সেই লক্ষ্য এখনও পূরণ হয়নি; তবে গত ছয় বছরে দলটির উত্থান-পতনের যাত্রাপথে কখনোই তার সামর্থ্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠেনি। মাঝেমধ্যে পারফরম্যান্সে কিছুটা ছন্দপতন হলেও, ক্লাব কর্তা থেকে শুরু করে কোচদের পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতেই থেকেছেন তিনি।

রেড ডেভিলদের জার্সিতে এরই মধ্যে গোল ও অ্যাসিস্টের সেঞ্চুরি করে ফেলেছেন ফের্নান্দেস, জিতেছেন ২০২২-২৩ লিগ কাপ ও ২০২৩-২৪ এফএ কাপ।

জাতীয় দলের হয়ে এখনও মেজর কোনো শিরোপার স্বাদ অবশ্য পাননি ফের্নান্দেস; তবে জিতেছেন ২০১৮-১৯ ও ২০২৪-২৫ মৌসুমের উয়েফা নেশন্স লিগ। ২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপ ও ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ এবং ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের ২০২০ ও ২০২৪ আসরেও দেশকে প্রতিনিধিত্ব করেছেন তিনি। তাই অভিজ্ঞতায় ঝুলি তার বেশ ভরাট, এবার সেখানে সবচেয়ে বড় সাফল্য যোগ করার চ্যালেঞ্জ।

কীর্তিমানদের দৃষ্টিতে ফের্নান্দেস

“ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড দলটা দুই রকমের, একটি ব্রুনোকে ছাড়া এবং আরেকটি ব্রুনোসহ। সে অ্যাসিস্টের রাজা, আগেভাগে খেলাটার গড়ে ওঠা দেখতে পারে। তাকে নাম্বার সিক্স হিসেবে খেলানো হলে সে দলের প্রাণ হয়ে উঠতে পারে। আবার তাকে নাম্বার টেন হিসেবে খেলানো হলে, তার গোলের সংখ্যা লাফিয়ে ওঠে। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের ইতিহাসের যে কোনো দলেই সে খেলতে পারতো।”

-    রবের্তো মার্তিনেস

“কখনও তার পারফরম্যান্সের অত্যুক্তি করতে পারবেন না। আমি তার সঙ্গে খেলতে ভালোবাসি। সে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের মুখ। ক্যারিয়ারে আমি যাদের সঙ্গে খেলেছি, তাদের মধ্যে আক্রমণভাগে সবচেয়ে ধারালদের একজন সে। একজন সতীর্থকে গোলমুখে এগিয়ে নিতে বলে তার কেবল একটা ছোঁয়া্ই যথেষ্ট।”

-    কাসেমিরো

“বল পায়ে যে কোনো কিছু করতে পারে ব্রুনো ফের্নান্দেস। মাঠে তার প্রভাব অসাধারণ, অবিশ্বাস্য। আমার দেখা সর্বোত্তম কিছু সৃষ্টিশীল কাজ করতে সক্ষম সে।”

-    পেপ গুয়ার্দিওলা

“সে যা কিছু করেছে, সত্যিই বিস্ময়কর। তার সংখ্যাগুলো অবিশ্বাস্য। সে আমার চেয়ে ভালো। আমার থেকে সে ব্যতিক্রম। সে আমার চেয়ে বেশি গোল করেছে এবং বেশি সুযোগ তৈরি করেছে। তার সঙ্গে খেলতে পারলে দারুণ হতো।”

-    পল স্কোলস

পরিসংখ্যানে ব্রুনো ফের্নান্দেস

•    ২০২০ সালের জানুয়ারিতে ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে যোগ দেওয়ার পর ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের জার্সিতে ২০০টির বেশি গোলে সরাসরি অবদান রেখেছেন ফের্নান্দেস; ১০৬টি গোল ও ১০৩টি অ্যাসিস্ট করেছেন তিনি।

•    পর্তুগাল জাতীয় দলের হয়ে ৮৬টি ম্যাচ খেলে ২৮টি গোল ও ২৪টি অ্যাসিস্ট করেছেন তিনি।

•    ২০২৬ বিশ্বকাপের বাছাইপর্বে নিজেদের শেষ ম্যাচে আর্মেনিয়ার বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করেন ফের্নান্দেস, ম্যাচটি ৯-১ গোলে জিতে সরাসরি বিশ্বকাপের মূল পর্বে জায়গা করে নেয় পর্তুগাল।   

বিশ্বকাপে যা করেছেন ফের্নান্দেস

ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে ফের্নান্দেসের অভিষেক ২০১৮ আসরে। চার বছর পর, কাতার বিশ্বকাপে দলের প্রতি ম্যাচেই শুরুর একাদশের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিলেন তিনি। গ্রুপ পর্বে দলের সাফল্যে উল্লেখযোগ্য ভূমিকাও রাখেন তিনি।

ঘানার বিপক্ষে ৩-২ গোলে জয়ের দিনে করেন দুটি অ্যাসিস্ট। পরের ম্যাচে তার জোড়া গোলেই উরুগুয়েকে ২-০ ব্যবধানে হারিয়ে নকআউট পর্বে ওঠে পর্তুগাল।

এরপর, শেষ ষোলোয় সুইজারল্যান্ডকে ৬-১ গোলে বিধ্বস্ত করার পথে একটি অ্যাসিস্ট করেন ফের্নান্দেস। তবে, দারুণ শক্তিশালী স্কোয়াড নিয়েও কোয়ার্টার-ফাইনালে থেমে যায় দলটির পথচলা। তাদেরকে হারিয়ে প্রথম আফ্রিকান দল হিসেবে বিশ্বকাপের সেমি-ফাইনালে ওঠে মরক্কো।

২০২৬ বিশ্বকাপ ঘিরে ফের্নান্দেস ও পর্তুগালের প্রত্যাশা

৩১ বছর বয়সে পারফরম্যান্সের চূড়ায় থেকে উত্তর আমেরিকা বিশ্বকাপে মাঠে নামতে প্রস্তুত ফের্নান্দেস। সঙ্গে পাবেন ফুটবলের মহাতারকা ক্রিস্তিয়ানো রোনালদোকেও। এখন প্রশ্ন একটাই, প্রিমিয়ার লিগে নিজেকে যে উচ্চতায় তুলেছেন, একই মানের ফুটবল খেলতে এবং নেতৃত্বগুণ সর্বোচ্চ মঞ্চে কি মেলে ধরতে পারবেন তিনি? 

প্রত্যাশার সঙ্গে উত্তরটা মিলে গেলে পর্তুগালের অধরা বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্নও পূরণ হয়ে যেতে পারে।

আন্ত:মহাদেশীয় প্লে-অফ পেরিয়ে আসা একটি দলের বিপক্ষে লড়াই দিয়ে আগামী ১৭ জুন বিশ্বকাপ যাত্রা শুরু হবে পর্তুগালের। ৪৮ দলের আসরে ‘কে’ গ্রুপে তাদের অন্য দুই প্রতিপক্ষ উজবেকিস্তান ও কলম্বিয়া।