১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

২০২৬ বিশ্বকাপের ২৬ সুপারস্টার: উসমান দেম্বেলে

ক্লাব ফুটবলে অনেক সাফল্যের মাঝে তার লক্ষ্য এবার আরেক ধাপ উপরে ওঠার, বিশ্বকাপের মঞ্চে দেশকে আবার সুউচ্চে তুলে ধরার।

২০২৬ বিশ্বকাপের ২৬ সুপারস্টার: উসমান দেম্বেলে
উসমান দেম্বেলে হয়ে উঠতে পারেন কোচ দিদিয়ে দেশমের মূল অস্ত্র। ছবি: ফিফা

স্পোর্টস ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 07 Jun 2026, 06:14 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:17 PM

উসমান দেম্বেলে: যার ক্যারিয়ারকে অনায়াসেই দুই ভাগে ভাগ করা যায়। অসাধারণ প্রতিভাবান এই ফুটবলার অল্প বয়সেই পেয়ে যান তারকাখ্যাতি। ক্যারিয়ারের শুরুতে অবশ্য একের পর এক চোটের ছোবলে বারবার বাধাগ্রস্ত হয় তার পথচলা। তবে, ঠিকানা পরিবর্তনের পর রূপ বদলে যায় তার। অসাধারণ সব পারফরম্যান্সে বর্ষসেরা ফুটবলারের খেতাবও জয় করেন তিনি। লক্ষ্য এবার আরেক ধাপ উপরে ওঠার, বিশ্বকাপের মঞ্চে দেশকে আবার সুউচ্চে তুলে ধরার।

২০২৬ বিশ্বকাপে নিজ দেশের স্বপ্নের সারথীদের নিয়ে ফিফার আয়োজন ২৬ সুপারস্টার। এই পর্বে আছেন ফরাসি ফরোয়ার্ড উসমান দেম্বেলে।

২০২৫ সালের ব্যালন দ’র ও দা বেস্ট ফিফা মেন’স প্লেয়ারের খেতাব অর্জনের পর, চলতি মৌসুমে অবশ্য চোটের কারণে কিছুটা ভুগতে হয়েছে এই ফরাসি তারকাকে। ফিটনেস সমস্যার প্রভাব পড়ে তার পারফরম্যান্সেও। তবে ২০২৬-এর শুরু থেকে আবার স্বরূপে ফিরতে শুরু করেছেন, নিয়মিত গোলও পাচ্ছেন তিনি।

দেম্বেলের বেড়ে ওঠা ও অর্জন

ফরাসি ক্লাব ইভহুতে দেম্বেলের প্রতিভা প্রস্ফুটিত হয় এবং কৈশোরেই ইউরোপের বেশ কয়েকটি বড় ক্লাবের নজর কাড়েন তিনি। ১২ বছর বয়সে তাকে নিজেদের শিবিরে নিয়ে আসে রেন এবং ফারাসি এই ক্লাবের যুব দলে তিনি আরও বিকশিত হন।

ক্লাবটির মূল দলে দেম্বেলে জায়গা করে নেওয়ার এক বছরের মধ্যে তাকে চুক্তিভুক্ত করে বরুশিয়া ডর্টমুন্ড। বুন্ডেসলিগায় প্রথম মৌসুমে অসাধারণ পারফরম্যান্স করে পরের বছরই তিনি পাড়ি জমান স্পেনে; দশ কোটি ইউরোর বেশি ট্রান্সফার ফিতে তাকে চুক্তিভুক্ত করে বার্সেলোনা।

ডর্টমুন্ডে জার্মান কাপ জিতে ক্যারিয়ারে প্রথম শিরোপার স্বাদ পান দেম্বেলে। বার্সেলোনায় গিয়ে আরও অনেক শিরোপা জয় করেন তিনি; ২০১৮, ২০১৯ ও ২০২৩ সালে লা লিগা, ২০১৮ ও ২০২১ সালে কোপা দেল রে এবং ২০১৯ ও ২০২৩ সালে স্প্যানিশ সুপার কাপ।

তবে বার্সেলোনায় শেষ দিকে ভীষণ প্রতিকূলতার মথ্য দিয়ে যেতে হয় দেম্বেলে। কয়েক দফায় আঘাত হানে চোট। চোট কাটিয়ে মাঠে ফিরলেও ভুগতে হয় ফিটনেস সমস্যায়, যার প্রভাব পড়ে পারফরম্যান্সে। তার বিরুদ্ধে নিয়ম ভাঙার অভিযোগও ওঠে কয়েক দফায়। সব মিলিয়ে একটা সময় সেখানে ব্রাত্য হয়ে পড়েছিলেন দেম্বেলে।

তার চোটাক্রান্ত ও ‘কিছুটা স্থবির’ হয়ে পড়া ক্যারিয়ার নতুন গতি পায় সাত বছর পর দেশের ক্লাবের ফিরে, ২০২৩ সালে পিএসজিতে যোগ দেওয়ার মধ্য দিয়ে। ক্লাবটিতে কোচ লুইস এনরিকের আক্রমণের মূল অস্ত্র হয়ে ওঠেন তিনি। 

২০২৪-২৫ মৌসুমটা তার দারুণ কাটে, বিশেষ করে মৌসুমের দ্বিতীয় অর্থ। গোল পর গোল আর অ্যাসিস্ট করে, আক্রমণভাগকে নেতৃত্ব দেন দেম্বেলে। লিগ আঁ, ফরাসি কাপ ও ফরাসি সুপার কাপসহ দলকে প্রথমবারের মতো জেতান উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ট্রফি। 

আর পিএসজির ওই প্রতিটি সাফল্যেই উল্লেখযোগ্য অবদান ছিল দেম্বেলের। ক্লাব বিশ্বকাপের ফাইনালেও ওঠে তারা, যদিও সেখানে চেলসির বিপক্ষে হেরে যায় দলটি। ওই মৌসুমে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ৫৩ ম্যাচ খেলে ৩৫টি গোল ও ১৬টি অ্যাসিস্ট করেন তিনি।

দারুণ ধারাবাহিকতায় দুর্দান্ত ওই পারফরম্যান্সের জন্য ২০২৫ সালের ব্যালন দ’র ও দা বেস্ট ফিফা মেন’স প্লেয়ারের খেতাব জয় করেন এই ফরাসি উইঙ্গার।

দেশের হয়েও ইতোমধ্যে সর্বোচ্চ সাফল্যের স্বাদ পেয়েছেন দেম্বেলে; ২১ বছর বয়সে ২০১৮ বিশ্বকাপ জয়ী দলের সদস্য ছিলেন তিনি।

কোচ ও সতীর্থদের চোখে দেম্বেলে

“উসমান সবসময়ই ছিল ব্যতিক্রমী খেলোয়াড়, তা সে যে পজিশনেই খেলুক। সবসময়ই সে ড্রিবল করে দুই, তিন কিংবা চারজনের বাধা এড়িয়ে এগিয়ে যেতে পারতো, এবং অনেক অনেক অ্যাসিস্ট ও গোল করে।”

-    লুইস এনরিকে

“তিনি অসাধারণ এক খেলোয়াড় - তার সঙ্গে খেলতে পারাটা সৌভাগ্যের। আমি যখন পিএসজিতে এসেছিলাম, তথন তিনি আমাকে অনেক সাহায্য করেছিলেন। আমার কাছে তিনি বড় ভাইয়ের মতো।”

-    দিজিরে দুয়ে

“শিশু বয়সে সবসময় তার সঙ্গে একটা বল থাকতো। বলই ছিল তার বন্ধু – এটা ছাড়া সে কোথাও যেত না, ঠিক যেভাবে আপনি সবসময় আপনার ফোনটা সঙ্গে রাখেন। এমন ছিল যেন, একটা শিশু তার টেডি বিয়ার ধরে আছে।”

-    হোমাহিক বুলতেল (দেম্বেলের শৈশবের ক্লাব ইভহুর যুব দলের কোচ)

পরিসংখ্যানের আলোয় দেম্বেলে

•    অল্প বয়সেই চমৎকার ড্রিবলিংয়ে নজরকাড়া দেম্বেলেকে ২০১৭ সালে বরুশিয়া ডর্টমুন্ড থেকে প্রাথমিকভাবে সাড়ে ১০ কোটি ইউরো (বিভিন্ন বোনাস মিলিয়ে অঙ্কটা স্পর্শ করে সাড়ে ১৪ কোটিতে) ট্রান্সফার ফিতে দলে নেয় বার্সেলোনা। 

ওই সময় সেটাই ছিল ফুটবল ইতিহাসের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ট্রান্সফার ফি। তালিকায় তার ওপরে ছিলেন কেবল নেইমার; কয়েক সপ্তাহ আগেই বার্সেলোনা থেকে ২২ কোটি ইউরোয় নেইমারকে কিনে নেয় পিএসজি। ট্রান্সফার ফিতে এখনও সেটাই রেকর্ড।   

•    বার্সেলোনা অধ্যায়ে চোটের ছোবলে ছয় বছরে প্রায় ১২০টি ম্যাচ খেলতে পারেননি দেম্বেলে, যা দুটি মৌসুমে মোট ম্যাচের সমান।

•    পিএসজির হয়ে ২০২৪-২৫ মৌসুমে ৫৩ ম্যাচ খেলে ৩৫টি গোল ও ১৬টি অ্যাসিস্ট করেন দেম্বেলে, আগের পাঁচ মৌসুমের মোট গোলের চেয়ে বেশি।

২০২৬ বিশ্বকাপ ঘিরে দেম্বেলে ও ফ্রান্সের প্রত্যাশা

ক্লাব ফুটবলে অর্জনের ঝুলি তো বেশ ভরাট আছেই। জাতীয় দলের হয়েও অল্প বয়সে পেয়ে গেছেন বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ; কিন্তু এখানেই রয়ে গেছে এক অপূর্ণতা। বিশ্বকাপ কিংবা ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ, মেজর কোনো টুর্নামেন্টেই জালের দেখা পাননি দেম্বেলে।

জাতীয় দলের হয়ে ৫৮টি ম্যাচ খেলে মাত্র সাতবার জালের দেখা পেয়েছেন তিনি, সঙ্গে অ্যাসিস্ট করেছেন পাঁচটি। বৈশ্বিক আসরে প্রতিপক্ষের জালে বল জড়ানোর সুখানুভূতি এবার নিশ্চয় খুব করে পেতে চাইবেন তিনি।

ফ্রান্স দলটাও তারকায় ঠাসা, যেমন আক্রমণভাগেই দেম্বেলের সঙ্গে আছেন আরেক সুপারস্টার কিলিয়ান এমবাপে। মাঝমাঠ ও রক্ষণেও আছে দারুণ সব খেলোয়াড়। তাদের ভিড়ে দেম্বেলের কাছে অবশ্যই বাড়তি প্রত্যশা থাকবে ফরাসিদের, কারণটা অবশ্যই ক্লাবের হয়ে তার অসাধারণ পারফরম্যান্স।

আর কাতার বিশ্বকাপে ফাইনালে উঠেও, টাইব্রেকারে হেরে যাওয়ার ক্ষত সারাতে এবার মরিয়া হয়ে আছে দুইবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা। দেশের মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে দেম্বেলে হয়ে উঠতে পারেন দিদিয়ে দেশমের দলের কাণ্ডারি।

এবারের উত্তর আমেরিকা বিশ্বকাপে আগামী ১৭ জুন সেনেগালের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে যাত্রা শুরু হবে ফ্রান্সের। ‘আই’ গ্রুপে তাদের অন্য দুই প্রতিপক্ষ ইরাক ও নরওয়ে।