Published : 02 Jul 2026, 12:10 PM
দুজনের পজিশন এক নয়। খেলার ধরন ভিন্ন। ব্যক্তিত্ব এবং আরও অনেক কিছুই আলাদা। তবে মিলও কম নেই। এক ক্লাবে ছয় বছর একসঙ্গে খেলেছেন। খুব ভালো বন্ধু দুজন। সবচেয়ে বড় মিল, দুজনই কিংবদন্তি, নিজ দেশের ইতিহাসের সেরা এবং দুজনই চিরকালীন! তাদের পথের যেন শেষ নেই। তবে অন্তত এই বিশ্বকাপে একজনের পথচলা নিশ্চিতভাবেই শেষ হচ্ছেই। ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো ও লুকা মদ্রিচ যে এবার মুখোমুখি!
বিশ্বকাপের শেষ ষোলোয় ওঠার লড়াইয়ে বাংলাদেশ সময় শুক্রবার ভোর ৫টায় মাঠে নামবে পর্তুগাল ও ক্রোয়েশিয়া। দুই দলের লড়াই ছাপিয়ে এটি হয়ে উঠছে যেন রোনালদো ও মদ্রিচের লড়াই।
যদিও ‘লড়াই’ ব্যাপারটি তাদের মধ্যে সেভাবে ছিল না। রেয়াল মাদ্রিদে ২০১২ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত একসঙ্গে খেলেছেন দুজন। মাঠের ভেতরে-বাইরে তাদের রসায়ন ছিল চমৎকার। রোনালদো রেয়াল ছাড়ার পর তারা আর সতীর্থ নন। তবে বন্ধুত্ রয়ে গেছে।
রয়ে গেছে বিশ্ব ফুটবলে তাদের আবেদন আর নিজ দলে গুরুত্বও। গত বিশ্বকাপের পর কজনই বা ভাবতে পেরেছিলেন, পরের বিশ্বকাপেও দেখা যাবে তাদের! কিন্তু এই ৪১ বছর বয়সে বিশ্ব মঞ্চে রয়েছেন রোনালদো, ৪০ বছর বয়সে মদ্রিচ।
তাদের নিয়ে আলাদা করে বলার আছে সামান্য। দুজনের যুগলবন্দি ধরলে, দুজন মিলে বিশ্বকাপে খেলেছেন ৪৭ ম্যাচ। একসঙ্গে দুজন জিতেছেন চারটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ। ২০০৮ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে পাঁচটি ব্যালন দ’র জিতেছেন রোনালদো। তবে রোনালদো ও লিওনেল মেসির বলয় ভেঙে এই পুরস্কার জিতে নিয়েছিলেন মদ্রিচ।
তাদের হাত ধরে নিজ দেশের ফুটবলও পৌঁছে গেছে অনন্য উচ্চতায়। গত বিশ্বকাপে তৃতীয় হয়েছে ক্রোয়েশিয়া, আগের বিশ্বকাপে রানার্স আপ। ফুটবলের প্রতিষ্ঠিত শক্তি না হয়েও বিশ্ব আসরে এই সাফল্য চোখধাঁধানো এবং সেখানে সবচেয়ে বড় অবদান মদ্রিচেরই।
দেশের জার্সিতে ম্যাচ খেলার ডাবল সেঞ্চুরি করেছেন তিনি এই বিশ্বকাপেই। মিডফিল্ডার হয়েও দেশের ইতিহাসের পঞ্চম সর্বোচ্চ গোলস্কোরার। আরও কত কত গোলে সহায়তা করেছেন, কত গোলের উৎস তিনি, কত লড়াইয়ের প্রতীক, কতটা দৃঢ়তায় নেতুত্ব দিয়েছেন, সেসবের স্বাক্ষী গোটা ফুটবল বিশ্ব।
ক্রোয়েশিয়ার তুলনায় ফুটবলের বড় প্রথাগত শক্তি পর্তুগাল। যদিও বিশ্বকাপের ফাইনালে কখনও উঠতে পারেনি তারা। তবে রোনালদো জমানার আগের ১৭ বিশ্বকাপের স্রেফ তিনবার তারা জায়গা করে নিতে পেরেছিল। কিন্তু ২০০২ সালে বিশ্ব আসরে প্রত্যাবর্তন, ২০০৬ সালে সেমি-ফাইনাল খেলা থেকে প্রতিবারই এখন তারা বিশ্বকাপে খেলছে এবং ফেভারিটদের তালিকায় থাকছে।
এই সময়ে ইউরো জিতেছে পর্তুগাল, উয়েফা নেশন্স লিগ জিতেছে দুবার। আন্তর্জাতিক ফুটবলের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলস্কোরার হয়ে গেছেন রোনালদো। ১৪৫ গোল এখন তার। পর্তুগালের হয়ে ৫০ গোলও নেই আর কারও। ম্যাচ খেলেছেন ২৩১টি। দেড়শ ম্যাচ খেলতে পারেননি তার দেশের আর কেউ।
তার অভিষেকের আগে পর্তুগাল খেলেছে তিনটি বিশ্বকাপে। তিনি এবার খেলছেন ষষ্ঠ বিশ্বকাপ!
রোনালদো ও মদ্রিচের অবদান ও আবেদন তাই কথায় বা লেখায় ধারণ করা কঠিন।
ম্যচের আগে দুই কিংবদন্তির প্রতি শ্রদ্ধা জানালেন ভিতিনিয়া। পর্তুগালের এই মিডফিল্ডারের আশা, তার অধিনায়ক যেন টিকে থাকে এবারের দ্বৈরথ শেষে।
“ক্রিশ্চিয়ানোর সঙ্গে ড্রেসিংরুম এবং নিত্যদিনের জীবন ভাগাভাগি করে নেওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। পরম আনন্দের অভিজ্ঞতা এটি। ভালো লাগত, যদি লুকা মদ্রিচের সঙ্গে আরও সময় কাটাতে পারতাম। আমি যতটুকু দেখেছি, তাতে তাকে খুব আন্তরিক এবং বন্ধুত্বপূর্ণ একজন মানুষ বলেই মনে হয়েছে।
কিন্তু আগামীকাল দুজনের এই যাত্রার একটির সমাপ্তি ঘটতে চলেছে। আশা করি, সেটা লুকা মদ্রিচেরই হবে।”
ক্রোয়েশিয়ার গোলরক্ষক দমিনিক লিভাকোভিচও ঘোষণা দিয়েছেন মদ্রিচের জন্য নিজেদের উজাড় করে দেবেন।
“লুকার পথচলা অব্যাহত রাখতে সহায়তা করতে গোটা দল এবং আমি সম্ভাব্য সবকিছু করব।”
পর্তুগালের কোচ রবের্তো মার্তিনেসের মতে, কোনো মানদণ্ডে এই দুজনকে আটকে রাখা কঠিন।
“আমরা এমন ফুটবলারদের কথা বলছি, যারা জনমতের ঊর্ধ্বে। তাদের দীর্ঘস্থায়ীত্বই ফুটবলে তাদের স্পেশাল করে তুলেছে। আপনি লুকা মদ্রিচের কথা বলছেন, যার বয়স এখন ৪০ বছরের বেশি, যিনি এখনও প্রচুর ম্যাচ খেলে চলেছেন এবং এখনও দারুণ গুরুত্বপূর্ণ ফুটবলার।”
আমাদের অধিনায়কের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। যারা বয়স নিয়ে কথা বলে -- বয়স তো শুধু একটা সংখ্যা। আসল ব্যাপার হলো, তারা কী করে এবং ড্রেসিংরুমে তারা কী উদাহরণ তৈরি করে।”
এবারের বিশ্বকাপে এই দুজনের পারফরম্যান্স যদিও অধরাবাহিক। ক্যারিয়ারের সেরা সময় তো অতীতে ফেলে এসেছেন দুজনই। তার পরও দুজনের কাছ থেকে যতটা প্রত্যাশা, তা পুরোপুরি পূরণ করতে পারেননি, তা বয়সের কারণেই হোক বা অন্য কারণে।
রোনালদো এখনও পর্যন্ত পর্তুগালের তিন ম্যাচের সবকটিতেই পুরো সময় খেলেছেন। উজবেকিস্তানের সঙ্গে দুটি গোলও করেছেন। অনন্য কীর্তি গড়েছেন। তবে অন্য দুই ম্যাচে ছিলেন নিষ্প্রভ। সতীর্থদেরর জন্যও তেমন কোনো সুযোগ তৈরি করতে পারেননি। বিশ্বকাপে এখনও পর্যন্ত ২৫০ মিনিটের বেশি খেলা ৩৮ জন ফরোয়ার্ডের মধ্যে তিনি বল স্পর্শে (৯৪) ৩১তম, বল পুনরুদ্ধারে (পাঁচ) ৩২তম, প্রগ্রেসিভ পাসে (তিন) ৩৪তম এবং ডুয়ালে (১২) ৩৮তম স্থানে আছেন।
মদ্রিচ খেলেছেন ২২৯ মিনিট। একটি অ্যাসিস্টসহ পাঁচটি সুযোগ তৈরি করেছেন তিনি। কিন্তু কমপক্ষে ২২৫ মিনিট খেলা ১০৩ জন মিডফিল্ডারের মধ্যে তিনি বল পুনরুদ্ধারে (সাত) ৯৪তম এবং ডুয়ালে (১৪) ৯৮তম স্থানে রয়েছেন। নিশ্চিতভাবেই আগের মতো মিডফিল্ড জেনারেল এখন আর নন তিনি।
তবে চ্যাম্পিয়নদের নিয়ে তো শেষ কথা বলে কিছু নেই। মদ্রিচ এখনও হয়ে উঠতে পারেন কার্যকর, রোনালদোও গড়ে দিতে পারেন ম্যাচের ভাগ্য।
পর্তুগালের কোচ যেমন দুজনকে নিয়ে কোনো সমীকরণেই যেতে চান না।
“লাখ লাখ তরুণ ক্রীড়াবিদ এবং ফুটবলপ্রেমী তরুণ প্রজন্মের জন্য উদাহরণ লুকা মদ্রিচ। সে এবং আমাদের অধিনায়ক (রোনালদো) যে দীর্ঘস্থায়ীত্ব দেখিয়েছে, তা তাদেরকে এই খেলার আইকনে পরিণত করেছে।”
দুজনের মধ্যে কে টিকে থাকবেন এই ম্যাচ শেষে, তা নির্ভর করবে তাদের সতীর্থদের পারফরম্যান্সেও। বিশেষ করে, মাঝমাঠের পারফরম্যান্সই গড়ে দিতে পারে ম্যাচের ভাগ্য।
মাঝমাঠে তারকার সংখ্যা আর শক্তির গভীরতায় এগিয়ে পর্তুগাল। ভিতিনিয়া, ব্রুনো ফের্নান্দ্স, জোয়াও নেভ্স, বের্নার্দো সিলভা, হুবেন নেভ্সরা প্রত্যেকেই নিজ নিজ পজিশনে বিশ্বের সেরাদের মধ্যে থাকবেন।
ক্রোয়েশিয়ার মদ্রিচ ছাড়াও আছে মাতেও কোভাচিচের মতো অভিজ্ঞ ফুটবলার, পাশাপাশি পেতার সুচিচসহ উদীয়মান তরুণ আছেন কয়েকজন।
ক্রোয়েশিয়ার কোচ জ্লাতকো দালিচ তো বলেই দিয়েছেন, ফলাফল নির্ধারিত হবে মাঝমাঠের পারফরম্যান্সেই।
“এখানে অবশ্যই বিশাল লড়াই হবে। সম্ভবত এখানেই ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারিত হবে।”
“পর্তুগাল চমৎকার টেকনিক্যাল ফুটবল খেলে, তাই আমাদের খুব সতর্ক থাকতে হবে। এই ম্যাচে আমাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কোনো ভুল না করা, বিশেষ করে বল দখলে রাখার সময়। আমরা যে ভুলগুলো করেছি, তা শুধরে নিতে হবে, নইলে প্রতিটি ভুলেরই খেসারত দিতে হবে।”
সেই খেসারত মানে রোনালদো কিংবা মদ্রিচের কারও একজনের পথের সমাপ্তি।