কুমানের মতো এমন ‘অদ্ভুত কোচ’ দেখেননি পিয়ানিচ

অনেক প্রত্যাশা নিয়ে স্বপ্নের ক্লাব বার্সেলোনায় যোগ দিয়েছিলেন মিরালেম পিয়ানিচ। কিন্তু কোনো আশাই পূরণ হয়নি কঠিন বাস্তবতায়। নিজেকে প্রমাণের সুযোগই পাননি তেমন। রোনাল্ড কুমানের দলে অধিকাংশ সময়ই থেকে গেছেন উপেক্ষিত। এক বছরের জন্য ঠিকানা বদলের পর মনের ক্ষোভ উগরে দিলেন রোমা ও ইউভেন্তুসের সাবেক এই মিডফিল্ডার।

স্পোর্টস ডেস্কবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 4 Sept 2021, 12:47 PM
Updated : 4 Sept 2021, 12:47 PM

অভিযোগের তীর কাতালান দলটির কোচের দিকে। কুমান তার সঙ্গে ভালো আচরণ করেননি বলে দাবি বসনিয়া-হার্জেগোভিনার এই খেলোয়াড়ের।

গত মৌসুমে ইউভেন্তুস থেকে বার্সেলোনায় যোগ দেওয়ার পর সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ৩০ ম্যাচে মাঠে নামার সুযোগ পেয়েছেন তিনি। তবে অধিকাংশ ম্যাচেই নেমেছেন বদলি হিসেবে, শেষ দিকে। ১৩ ম্যাচে শুরুর একাদশে থাকলেও ৯০ মিনিট খেলতে পেরেছিলেন মাত্র ৫টিতে।

স্প্যানিশ গণমাধ্যমের খবর, পুরো গ্রীষ্মকালীন দলবদলে পিয়ানিচকে বিক্রি করার চেষ্টা করেও সফল হয়নি বার্সেলোনা। শেষ পর্যন্ত গত বৃহস্পতিবার তাকে এক বছরের জন্য ধারে তুরস্কের দল বেসিকতাসে পাঠানোর খবর দেয় কাতালান ক্লাবটি।

পিয়ানিচ বর্তমানে আছেন জাতীয় দলের সঙ্গে, বিশ্বকাপ বাছাইয়ের ম্যাচ খেলতে। এরই ফাঁকে স্পেনের ক্রীড়া দৈনিক মার্কাকে দেওয়া অনলাইন সাক্ষাৎকারে গত এক বছরের তিক্ত অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন ৩১ বছর বয়সী এই অভিজ্ঞ ফুটবলার। তার সব অভিযোগই কুমানের ওপর।

“ইউভেন্তুসে আমি সুখে ছিলাম। বার্সেলোনা দুই বছর ধরে আমাকে দলে টানার চেষ্টা করেও সফল হয়নি। এরপর আরেকটি সুযোগ পেয়ে তারা সেটি লুফে নেয়। আমি খুব খুশি হয়েছিলাম আর সেটা স্বাভাবিকই ছিল, কারণ আমি সেই দলের হয়ে খেলার অপেক্ষায় ছিলাম যেখানে খেলার স্বপ্ন ছোটবেলায় দেখতাম। অনেক আশা ছিল, কারণ রোমা ও ইউভেন্তুসে আমি সবসময় শুরুর একাদশে খেলেছি এবং ভালো করে এগিয়ে গেছি। কিন্তু এরপর আমি এমন একটা কোচ পেলাম, আমি জানি না…।”

“আজ এই মুহূর্তে আমি জানি না, তিনি (কুমান) ঠিক কী চেয়েছিলেন। তিনি কোনো কিছু ব্যাখ্যা করার বা সমাধানের চেষ্টা করেননি। জিজ্ঞেস করতে পারতাম, তিনি আমার কাছে কী চান(কোন পজিশনে খেলাতে চান), অথবা আমি ভালো করছি নাকি খারাপ। আমি আসলে তখন চেয়েছি, যত দ্রুত সম্ভব দলে মানিয়ে নিতে এবং দলের কাজে লাগতে।”

পিয়ানিচের বিশ্বাস, দলে নিজের জায়গা পাকা করতে যথেষ্ট চেষ্টা করেছেন তিনি। কিন্তু সর্বোচ্চ চেষ্টা করেও কোচের মন জয় করতে পারেননি।

“শিরোপা জিততে দলের ১৭ থেকে ১৮ জনের দরকার হয়। আমার খেলা নিয়ে তার কোনো সমস্যা ছিল না, আবার কোনো জবাবও তিনি দেননি। সময় যত গড়িয়েছে অবস্থা ততই খারাপ থেকে আরও খারাপের দিকে গেছে, কোনো কারণ ছাড়াই। আমি পেশাদার আর তাই সমস্যাটা আমি বুঝে উঠতে পারছিলাম না। এমনকি দলের ভেতরের অনেকেও বিষয়টা বুঝতে পারত না। এরপর এই সুযোগটা এলো ঠিকানা বদলের এবং আমি মেনে নিলাম, কারণ আমি খেলতে চাই।”

“দলে কতটা অবদান রাখতে পারি, আমি জানি। কিন্তু সেজন্য দরকার আত্মবিশ্বাসের এবং মুখোমুখি আলোচনা। এমন আচরণের চেয়ে আমার ভালো লাগতো যদি সবকিছু আমাকে খোলামেলাভাবে বলতো। কিন্তু সবকিছু ছিল এমনই, যেমনটা দেখা যাচ্ছে।…এমন অভিজ্ঞতা আমার আগে হয়নি। এর আগে সব কোচের সঙ্গেই ভালো সম্পর্ক ছিল। আমি জানি না কী ঘটেছিল, আসলেই জানি না। তিনি (কুমান) দায়িত্ব নিতে বা মুখোমুখি হতে চাননি।”

এখানেই থামেননি পিয়ানিচ। মনের দরজা খুলে বলেছেন সব কথাই।

“আমি জানতাম, সময়টা ছিল কঠিন। ক্লাবের ও তাদের সদস্যদের জন্য পরিস্থিতি ছিল ভীষণ কঠিন। বার্সেলোনা সবসময় জিততে চায়। যখন আমি এসেছিলাম তখন খুব শক্তিশালী একটা দল ছিল, খেলোয়াড়রা ছিল মানসম্পন্ন যারা লা লিগা জিততে পারত। কিন্তু এটা হয়নি, এর সঠিক কারণ আমি জানি না।“

“আবহটা ছিল জটিল এবং কোভিড-১৯ এর কারণে আমিও এসেছিলাম দুই সপ্তাহ পর। কোচও নতুন। কিন্তু আমার অবস্থা শুরু থেকেই ছিল জটিল। দুই সপ্তাহ পর একটু একটু করে অনুশীলন শুরু করি, একা, যেন সতীর্থদের সঙ্গে অনুশীলন শুরু করতে পারি। তিন, চার, সাত, দশ দিন চলে গেল; কিন্তু কোচ আমার সঙ্গে মৌসুম সম্পর্কে, আমার সম্পর্কে কিছু বললেন না, কোনো কিছু নিয়েই কথা বলেননি।”

তারপরও নতুন পরিবেশে নতুনভাবে মানিয়ে নিতে শুরু করেছিলেন পিয়ানিচ। খেলার সময় শুরুতে কম পেলেও সেটাকে স্বাভাবিকভাবেই নিলেন তিনি। আশা ছিল, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সমস্যা কেটে যাবে। কিন্তু হলো তার উল্টো।

“একটা সময় আমি আরও কম খেলতে লাগলাম এবং পরিস্থিতি জটিল হতে লাগল। শারীরিক ও মানসিকভাবে যা ছিল কঠিন। এটা আমার আত্মবিশ্বাস শেষ করে দিয়েছিল, কারণ তার(কোচের) সঙ্গে আমার কোনো যোগাযোগই ছিল না। বিষয়টা ছিল খুব অদ্ভুত।“

“আমি এমন একজন খেলোয়াড় যে সবকিছুই মেনে নিতে পারে, কিন্তু আমার চাওয়া ছিল সবকিছু যেন আমার সামনে বলা হয়। আমি শেষ পর্যন্ত লড়েছি, সবার সঙ্গে পেশাদার আচরণ করেছি, তাদের জন্য সবসময় কঠোর পরিশ্রমও করেছি। বুঝতে পেরেছিলাম, যদি কোচ থেকে যান তাহলে আমাকে একটা সমাধান বের করতে হবে।”

বার্সেলোনার জার্সিতে তাকে প্রথম শুরুর একাদশে দেখা যায় চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ম্যাচে। এই প্রতিযোগিতায় তিনি বেশ নিয়মিতই ছিলেন, কিন্তু তেমন সুযোগ পেতেন না লিগায়। এর সঠিক কারণ জানেন না পিয়ানিচ। ক্যারিয়ারে অনেক কোচের সঙ্গেই কাজ করেছেন, কিন্তু এমন ‘অদ্ভুত কোচ’ আগে দেখেননি বলে তার দাবি।

এতকিছুর পরও বার্সেলোনা যোগ দেওয়ায় কোনো হতাশা নেই পিয়ানিচের। ক্লাবের প্রতি তার কোনো ক্ষোভ নেই, অভিযোগ সব কুমানকে নিয়ে। বার্সেলোনায় অসম্মানিত হয়েছেন কিনা, এমন প্রশ্নে তার উত্তর, “হ্যাঁ, কোচের দ্বারা।”

সবকিছুর জন্য নিজের ভাগ্যকে দুষছেন রোমার হয়ে ১৮৫ ও ইউভেন্তুসের হয়ে ১৭৮ ম্যাচ খেলা পিয়ানিচ। এখন তিনি মনোযোগ দিতে চান বেসিকতাসে।

“বার্সেলোনার সঙ্গে আমার চুক্তি আছে এবং সবসময় আমি ক্লাবের বিষয়ে ভালো কথাই বলেছি। আমার কেবল ভাগ্য খারাপ কোচের সঙ্গে। কিন্তু বার্সেলোনা তো বার্সেলোনাই। খেলা ছাড়া আমি আরও একটা মৌসুম কাটাতে পারি না। আমাকে খেলতে হবে। আমি এখন খুশি এবং বেসিকতাসে মনোযোগ দিচ্ছি এবং ক্লাবটির হয়ে মাঠে নামার জন্য আমি ব্যকুল।”

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক