১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪ আশ্বিন ১৪৩৩

আক্রমণের কৌশল বদলে আরও শক্তিশালী মরক্কো

চার বছর আগের বিশ্বকাপে, চমক উপহার দিয়ে সেমি-ফাইনালে ওঠা মরক্কো এবারও ছুটছে দারুণ গতিতে।

স্পোর্টস ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 02 Jul 2026, 08:30 AM

Updated : 11 Sep 2026, 03:33 PM

কাতার বিশ্বকাপের সাফল্যের পর, গত চার বছরে মরক্কো কৌশলে এনেছে বদল। বিশেষ করে, আরও আগ্রাসী ফুটবল খেলার চেষ্টা করছে দলটি। কৌশলের এই বদলের পাশাপাশি, আরও কিছু পরিবর্তন দলটিকে করে তুলেছে আরও শক্তিশালী।

গত বিশ্বকাপে সবচেয়ে বড় চমক উপহার দেওয়া দলটি ছিল মরক্কো। আরব-আফ্রিকার প্রথম দল হিসেবে সেমি-ফাইনালে খেলার ইতিহাস গড়েছিল তারা। স্বপ্নময় সেই যাত্রায় তারা বিদায় ঘণ্টা বাজিয়েছিল স্পেন ও পর্তুগালের মতো ফুটবল পরাশক্তির। সেমি-ফাইনালে হার মেনেছিল ফ্রান্সের কাছে।

সেই বিস্ময়ের রেশ মরক্কো এবার টেনে নিয়ে আসে গ্রুপ পর্বের শুরুতেই, বিশ্বকাপের রেকর্ড পাঁচবারের চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলকে ১-১ ড্রয়ে রুখে দিয়ে। এরপর স্কটল্যান্ড ও হাইতিকে হারিয়ে ব্রাজিলের সমান পয়েন্ট নিয়ে, গোল পার্থক্যে পিছিয়ে গ্রুপ রানার্সআপ হয়ে তারা ওঠে নকআউটের মঞ্চে। এই ধাপে তাদের প্রথম শিকার, ২০১০ বিশ্বকাপসহ তিনবারের রানার্সআপ নেদারল্যান্ডস।

চার বছর আগে ‘ফুটবলের দৈত্য’ বধের যাত্রা মরক্কো শুরু করেছিল ওয়ালিদ রেগরাগির কোচিংয়ে। যে যাত্রা এবার দলটি ধরে রেখেছে নতুন কোচ মোহামেদ ওয়াহবির হাত ধরে। 

বেলজিয়ামে জন্ম নিলেও ওয়াহবির শেকড় পোতা মরক্কোয়। ডাগআউটে শান্ত, স্থির, চুপচাপ থাকা এই কোচ, হাকিমিদের হাল ধরেছিলেন ওয়ালিদ চলে যাওয়ার পর, গত মার্চে। এক মাসের মধ্যে ছাপও রাখতে শুরু করেন তিনি। উত্তর আমেরিকা বিশ্বকাপেও ৪৯ বছর বয়সী এই কোচ দেখিয়ে চলেছেন, তার ছকের কার্যকারিতা।

মজার বিষয় হচ্ছে, ওয়ালিদও মরক্কোর দায়িত্ব নিয়েছিলেন কাতার বিশ্বকাপ শুরুর কিছুদিন আগে। অল্প সময়ের মধ্যে দলের রক্ষণে পাথরের দৃঢ়তা আনেন এবং পাল্টা-আক্রমণে দলকে করে তোলেন পারদর্শী। স্পেন ও পর্তুগালকে ছিটকে দিয়ে সেবার মরক্কোও তরতরিয়ে উঠে যায় সেরা চারের মঞ্চে। দেশটির ফুটবলে নতুন দিগন্তের শুরুটা ওয়ালিদের হাত ধরেই।

সেই দিগন্ত আরও বিস্তৃত হচ্ছে ওয়াহবির কোচিংয়ে। প্রতিপক্ষের খেলার জায়গা সংকুচিত করে দিতে হাই-লাইন ডিফেন্স খেলানোর পাশাপাশি, প্রতিপক্ষকে চাপ দেওয়ার কৌশলও রপ্ত করেছেন হাকিমি-দিয়াসরা। এর সাথে বলের নিয়ন্ত্রণে আধিপত্য করার দিকেও মনোযোগ দিচ্ছে দলটি। এই কৌশলগুলোর সফল প্রয়োগে, ডাচদের বিপক্ষে প্রাপ্য জয়টিই পেয়েছে মরক্কো।

গ্রুপ পর্বের শুরুতে, নিউ ইয়র্কে ব্রাজিলের বিপক্ষে ১-১ ড্র ম্যাচেও তুলনামূলক ‘ভালো’ দল ছিল মরক্কোই। বস্টনে স্কটল্যান্ডকে ১-০ গোলে হারায় তারা। আর হাইতির বিপক্ষে ৪-২ স্কোরলাইনই দেখাচ্ছে, ম্যাচে চালকের আসনে ছিল কোন দলটি।

অথচ, ব্রাজিল ও স্কটল্যান্ড ম্যাচ নিয়ে ওয়াহবিকে তীর্যক প্রশ্নের মুখোমুখিই হতে হয়েছিল সংবাদ সম্মেলনে। প্রথাগত স্ট্রাইকার ছাড়া খেলা এবং ওই দুই ম্যাচে মাত্র দুই গোল পাওয়ায়, কোচের কৌশল নিয়ে অসন্তুষ্ট ছিলেন মরক্কান গণমাধ্যমকর্মীরা।

কিন্তু এই কৌশলেই বাজিমাত করে চলেছেন ওয়াহবি। ২৫ বছর বয়সী ইসমায়েল সাইবারিকে তিনি ফলস নাইন পজিশনে খেলাচ্ছেন। তাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠছে দলটির আক্রমণ। সাইবারি পেছনে নেমে এবং উইং ধরে খেলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন, কিন্তু গোল করার মতো জায়গাতেও পৌঁছে যান সময়মতো। এর প্রমাণও তিনি দিয়েছেন, গ্রুপ পর্বের তিন ম্যাচে সবগুলোতে গোল করে।

মন্তেরেইয়ে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে গোলের একাধিক সুযোগ পান সাইবারি। সেগুলো কাজে লাগাতে না পারলেও, টাইব্রেকারে ঠিকই কাজের কাজটি করেন তিনি। ম্যাচের ভাগ্য নির্ণায়ক শেষ শটে লক্ষ্যভেদ করে, দলকে পৌঁছে দেন শেষ ষোলোর মঞ্চে। সেখানে তাদের জন্য অপেক্ষা করছে বিশ্বকাপের সহ-আয়োজক কানাডা। শনিবার, হিউস্টনে মুখোমুখি হবে দুই দল।

ওয়াহবির সামনে এখন কানাডা বাধা পেরুনোর চ্যালেঞ্জ। তবে, সাহসী এই কোচকে নিয়ে মরক্কানরা আশাবাদী হতেই পারেন। কেননা, ঝুঁকি নিতে ওয়াহবি কখনই দ্বিধা বোধ করেন না। ১৮ বছর বয়সী আইয়ুব বুয়াদ্দিকে তিনি যেমন খেলিয়ে দেন ব্রাজিল ম্যাচে, ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডের মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গায়। 

অথচ, এই তরুণ গত মে মাসেই ‘ফরাসি’ থেকে ‘মরক্কান’ হন! ফ্রান্সে জন্ম হলেও বুয়াদ্দি মরক্কান বংশোদ্ভূত। তবে, ফ্রান্সের বয়সভিত্তিক দলে খেলা এই তরুণ ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারের সামনে ছিল এমবাপেদের সতীর্থ হওয়ার সুযোগ, কিন্তু তিনি শেষ পর্যন্ত বেছে নেন মরক্কোকে।

বিশ্বকাপ স্কোয়াডে বেশ কিছু তরুণ খেলোয়াড়দের রেখেছেন ওয়াহবি, যাদেরকে নিয়ে গত বছর ফিফা অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপ জিতেছিলেন তিনি। সব মিলিয়ে, অভিজ্ঞ-তরুণের মিশেলে যে আক্রমণাত্মক দল তিনি সাজিয়েছেন, নকআউটের রণক্ষেত্রেও তাদের হারানো কঠিন। নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে জয়ের পর তো সেই হুঙ্কারই ছেড়েছেন মরক্কো কোচ।

“আমরা যেভাবে খেলতে জানি, সেই খেলাটাই যদি খেলতে পারি, তাহলে কেউ আমাদের আটকাতে পারবে না। কিন্তু কেউই অপরাজেয় নয়। আমরা যদি ভুল করি, তাহলে আমাদের বাড়ি ফিরতে হবে।”