Published : 31 Jul 2026, 03:33 PM
আভাসটা মিলেছিল আগেই। এবার এলো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা। ফিফা যদি বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে তাদের টুর্নামেন্টগুলোর অংশীদারিত্ব বিক্রি করার পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যায়, তাহলে বিশ্বকাপসহ ফিফার সব ধরনের টুর্নামেন্ট বর্জন করবে উয়েফা।
উয়েফা সদস্যরা বৃহস্পতিবার সর্বসম্মতভাবে ভোট দিয়েছে এই সিদ্ধান্তে।
ইউরোপিয়ান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের ৫৫টি সদস্য রাষ্ট্রের একটি জরুরি ভার্চুয়াল বৈঠকে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর সাম্প্রতিক পরিকল্পনাকে ‘দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রত্যাখ্যান’ করা হয়।
ইএসপিএন জানিয়েছে যে, এই বৈঠকে ৫০টিরও বেশি অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধিরা তাদের বক্তব্যে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে।
কনক্যাকাফ আগেই ঘোষণা করেছে, উত্তর আমেরিকা, মধ্য আমেরিকা এবং ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে তাদের ৪১টি সদস্যও ফিফার এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করছে।
তবে ফিফা শুক্রবার জানায়, তীব্র বিরোধিতা সত্ত্বেও তারা এই প্রস্তাবনা নিয়ে তাদের আলোচনা প্রক্রিয়া এগিয়ে নিবে।
উয়েফা এক বিবৃতিতে বলেছে, “বিশ্বকাপকে কোনো বিনিয়োগ পণ্য হিসেবে গণ্য করা যায় না। এটি ফুটবলের সেরা ক্রীড়া ঐতিহ্যগুলোর একটি। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এটি প্রতিটি মহাদেশের ফুটবলার, জাতীয় দল এবং সমর্থকদের মাধ্যমে গড়ে উঠেছে। এর কোনো অংশই বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে হস্তান্তর করা উচিত নয়। বিশ্বকাপ বিক্রির জন্য নয়।”
কয়েক ঘণ্টা পর ফিফা সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে প্রতিক্রিয়া জানায়, যেটির অংশবিশেষে বলা হয়েছে, “কেউ ফুটবল বিক্রি করছে না। এটি এমন কিছু নয়, যা ফিফা কখনো বিবেচনা করবে।”
‘ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ (এফএফই)’ নামক সহায়ক প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করে সেটির শেয়ার বিক্রি করে ২০ বিলিয়ন ডলারের বাইরের বিনিয়োগ সংগ্রহের একটি পরিকল্পনা গত মঙ্গলবার তুলে ধরেছে ফিফা। বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্তা সংস্থার একজন মুখপাত্র জানান, এই প্রস্তাবটি শিগগিরই ২১১টি সদস্য সংস্থা এবং ফিফার ৩৭ সদস্যের কাউন্সিলের কাছে উপস্থাপন করা হবে। তারাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী হবে।
ফিফার মতে, এই পদক্ষেপটি এমন একটি পরিকল্পনার অংশ, যা সদস্য সংস্থাগুলোর উন্নয়ন তহবিলের পরিমাণ তিনগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে। এর মাধ্যমে অবকাঠামো, কোচিং, জাতীয় দল, প্রতিযোগিতা, তৃণমূল ফুটবল এবং নারী ফুটবলের উন্নয়নে ব্যয়ের জন্য সদস্য দেশগুলোর এককালীন মূলধন হিসেবে ২ কোটি ডলার পর্যন্ত পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
উয়েফার বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ফিফা তাদের প্রস্তাব পুরোপুরি বাতিল না করা পর্যন্ত বর্জনের এই ঘোষণা বহাল থাকবে।
“আজকের আলোচনার ফলস্বরূপ, যতদিন এই প্রস্তাবগুলো কার্যকর থাকবে, ততদিন উয়েফার কোনো জাতীয় দল ফিফার কোনো প্রতিযোগিতায় অংশ নেবে না, যদি না এই প্রস্তাবটি সম্পূর্ণরূপে বাতিল করা হয় এবং এই মর্মে বাধ্যতামূলক আশ্বাস দেওয়া হয় যে, ফিফা আর কখনও তার পরিচালনা পর্ষদ বা প্রতিযোগিতাগুলোকে বেসরকারি মালিকানার জন্য উন্মুক্ত করবে না।
“কারও মনে কোনো সন্দেহ থাকা উচিত নয়: উয়েফা এবং এর জাতীয় অ্যাসোসিয়েশনগুলো চূড়ান্ত দৃঢ়তার সাথে এই পরিকল্পনাগুলোর বিরোধিতা করবে।”
বিশ্বকাপ নিয়ে বিন্দুমাত্র আপস করা হবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে ফিফা।
“এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিচার করা হয় তারা কী মেনে নিতে প্রস্তুত তা দিয়ে নয়, বরং তারা কিসের সাথে আপস করতে অস্বীকার করে, তা দিয়ে। এটি তেমনই একটি মুহূর্ত। কিছু জিনিস এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, তা বিক্রি করা যায় না। ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবলেরই সম্পত্তি। এটি চিরকাল তা-ই থাকবে। যতদিন ইউরোপের কণ্ঠস্বর থাকবে, এটি কখনও বিক্রির জন্য নয়।”
উয়েফা বলেছে, পরিকল্পনা ঘোষণা করার আগে কোনো ‘অর্থপূর্ণ আলোচনা’ করেনি ফিফা।
“ফুটবলের জন্য এত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রস্তাব গোপনে তৈরি করা এবং খেলাটির তত্ত্বাবধানের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের সঙ্গে কোনো অর্থপূর্ণ আলোচনা ছাড়াই অনুমোদনের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে আসাটা একাধারে দায়িত্বজ্ঞানহীন ও অমার্জনীয়। এটি কেবল নেতৃত্বের এক চরম ব্যর্থতাই নয়, বরং বিশ্ব ফুটবলের তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে ফিফার দায়িত্বের অবহেলা।
বিশ্বজুড়ে জাতীয় সংস্থাগুলোকে এখন একটি চরমপত্র দেওয়া হয়েছে: ফুটবলের সেরা প্রতিযোগিতাগুলোর এই অপরিবর্তনীয় দখল মেনে নিন, নতুবা এর পরিণতি ভোগ করুন। এটি কোনো গণতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে শাসন -- এমন একটি জবরদস্তিমূলক কাজ, যা বিশ্ব ফুটবলের তত্ত্বাবধানের দায়িত্বে থাকা একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য অযোগ্য।”
উয়েফার সদস্যদের মধ্যে রয়েছে ২০২৬ বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়ন স্পেন; সাথে জার্মানি, ফ্রান্স এবং ইংল্যান্ড।
উয়েফার জন্য এই বর্জন কার্যকর করার প্রথম সুযোগ আসবে সেপ্টেম্বরে, তখন পোল্যান্ডে অনূর্ধ্ব-২০ নারী বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা।
উয়েফা বলেছে, তাদের উদ্বেগের তালিকায় বাইরের বিনিয়োগকারীদের সম্ভাব্য প্রভাবও রয়েছে।
“যে মুহূর্তে বাইরের বিনিয়োগকারীরা ফিফা প্রতিযোগিতায় মালিকানা লাভ করবে, ফুটবল চিরতরে বদলে যাবে। বাণিজ্যিক মুনাফা একটি স্থায়ী বাধ্যবাধকতায় পরিণত হবে।
বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা একটি দৈনন্দিন চাপে পরিণত হয়। সেই মুহূর্ত থেকে, আন্তর্জাতিক সূচির প্রতিটি সিদ্ধান্ত, প্রতিযোগিতার বিন্যাসের প্রতিটি সিদ্ধান্ত এবং ফুটবলের ভবিষ্যৎ নির্ধারণকারী প্রতিটি সিদ্ধান্ত আর খেলার সর্বোত্তম স্বার্থে নয়, বরং শেয়ারহোল্ডারদের সর্বোত্তম স্বার্থে পরিচালিত হয়।
উয়েফা আবারও স্পষ্ট করে জানিয়ে দেয়, এই সহায়ক সংস্থা তারা কোনোভাবেই মেনে নেবে না।
“বিশ্ব ফুটবলে এই মডেলের কোনো স্থান নেই। ফুটবলের ভবিষ্যৎ তাদের প্রত্যাশা দ্বারা নির্ধারিত হতে পারে না, যাদের প্রথম কর্তব্য হলো আর্থিক মুনাফা সর্বোচ্চ করা। তেমনি জাতীয় সংস্থা, লিগ, ক্লাব, ফুটবলার এবং সমর্থকদের স্বার্থও বিনিয়োগকারীদের মুনাফার অধীন হতে পারে না।
আর্থিক লাভের জন্য ফুটবল তার ভবিষ্যৎ বন্ধক রাখতে পারে না। ইউরোপের অবস্থান স্পষ্ট। আমরা কখনোই এই মডেলকে আমাদের বৈধতা ধার দেব না। পরবর্তী প্রজন্মের জন্য আমানত হিসেবে যা রাখা হয়েছে, তা বিক্রি করার নৈতিক অধিকার কারও নেই।”
ইনফান্তিনোর প্রস্তাব সম্পর্কে কনক্যাকাফের বিবৃতিতে আংশিকভাবে বলা হয়েছে, “সদস্যরা প্রস্তাবটি ঘিরে যথাযথ প্রক্রিয়ার অভাব, কৃত্রিমভাবে আরোপিত সংক্ষিপ্ত সময়সীমা এবং সংশ্লিষ্ট ফিফা পরিচালনা পর্ষদের কোনো পর্যালোচনা বা অনুমোদনের অনুপস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। এছাড়াও ইতিহাসের সবচেয়ে লাভজনক ফিফা বিশ্বকাপের পর নতুন ও বিদ্যমান ফিফা ফরোয়ার্ড প্রোগ্রামগুলোতে অর্থায়নের জন্য বেসরকারি বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।”
কনক্যাকাফ অবশ্য বর্জনের ঘোষণার কথা উল্লেখ করেনি সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে।
এসবের জবাবে ফিফা যে বিবৃতি দিয়েছে, সেটিকে তারা ‘স্পষ্টীকরণ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। প্রস্তাবটি সম্পর্কে গণমাধ্যমের প্রতিবেদনগুলোকে ভুল বলে উল্লেখ করেছে তারা।
“প্রস্তাবিত ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ (এফএফই) প্রতিষ্ঠার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কনফেডারেশনগুলোর মতামত শুনেছি আমরা এবং মঙ্গলবার গণমাধ্যমে প্রাথমিক প্রতিবেদন প্রকাশের পর থেকে যে বিষয়গুলো সামনে এসেছে, সেগুলোর সমাধান করতে চাই। সংবাদমাধ্যমের ভুলের কারণে আমাদের পরিকল্পিত আলোচনা প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়েছে। আমরা এই আলোচনা প্রক্রিয়া নিয়ে এগিয়ে যাব যাতে প্রতিটি সদস্য সংস্থা তথ্যের ভিত্তিতে তাদের ভোট দেওয়ার সুযোগ পায়।
আমরা জনসমক্ষে প্রকাশিত মতামত ও উদ্বেগকে সম্মান করি এবং একটি উন্মুক্ত ও গণতান্ত্রিক আলোচনার প্রতি আমাদের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করছি। এফএফই প্রস্তাব করার একমাত্র উদ্দেশ্য হলো এটা নিশ্চিত করা যে, ফিফার সকল সদস্য সংস্থা যেন তাদের নিজ নিজ দেশে ফুটবলের বাণিজ্যিক সুযোগের অর্থপূর্ণ মালিকানা গ্রহণের সুযোগ পায় এবং এই উদ্যোগ যেন ফিফা বা ফুটবলের মূল চেতনা, শাসনব্যবস্থা বা স্বয়ং ফুটবলের কোনো ক্ষতি না করে।”
উয়েফার দিকে ইঙ্গিত করে ফিফা বলছে, কোনো একটি সংস্থার চাওয়ায় তাদের পরিকল্পনা বদলাবে না।
“প্রত্যেকেরই বিরোধিতা প্রকাশ করার এবং আরও স্পষ্টীকরণ চাওয়ার অধিকার আছে, কিন্তু কোনো একক সত্তা বিশ্বের ২১১টি সদস্য রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করার দাবি করতে পারে না।
প্রতিটি সদস্য রাষ্ট্রকে প্রস্তাবটি পর্যালোচনা করার এবং তাদের নিজেদের ভবিষ্যৎ গঠনে মতামত দেওয়ার সুযোগ দেওয়া উচিত। এগুলোই ফিফার গণতান্ত্রিক নীতি।”