১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

২০২৬ বিশ্বকাপের ২৬ সুপারস্টার: ভিনিসিউস জুনিয়র

বিশ্বকাপে দুই যুগের শিরোপা খরা কাটাতে রেয়াল মাদ্রিদের হয়ে দ‍্যুতি ছড়ানো ভিনিসিউস জুনিয়রের দিকে তাকিয়ে ব্রাজিল।

২০২৬ বিশ্বকাপের ২৬ সুপারস্টার: ভিনিসিউস জুনিয়র
এবার আন্তর্জাতিক ফুটবলে নিজেকে চেনানোর পালা ভিনিসিউস জুনিয়রের। ছবি: ফিফা

স্পোর্টস ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 07 Jun 2026, 06:18 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:17 PM

রেয়াল মাদ্রিদে সম্ভাব‍্য সব শিরোপা জিতেছেন, বর্ষসেরা ফুটবলারের পুরস্কার পেয়েছেন; কিন্তু জাতীয় দলের হয়ে এখনও কিছুই করতে পারেননি ভিনিসিউস জুনিয়র। কোপা আমেরিকায় একবার রানার্সআপ হওয়াই একমাত্র ‘প্রাপ্তি।’ ফুটবল পাগল ব্রাজিল অবশ‍্য শিরোপা ছাড়া আর কোনো কিছুকেই হিসাবের মধ‍্যে রাখে না। সেই হিসেবে এই ঘর শূন‍্যই। গত ২৪ বছর ধরে বিশ্বকাপ থেকেও শূন‍্য হাতে ফিরছে ব্রাজিল। এই দুই আক্ষেপ এবার মিটিয়ে দেওয়ার সুযোগ সময়ের সেরা ফরোয়ার্ডদের একজন ভিনিসিউসের সামনে। 

২০২৬ বিশ্বকাপে নিজ দেশের স্বপ্নের সারথীদের নিয়ে ফিফার আয়োজন ২৬ সুপারস্টার। এই পর্বে আছেন ব্রাজিলের ফরোয়ার্ড ভিনিসিউস জুনিয়র।

পারবেন তিনি? উত্তর মেলাতে তাকে অবশ্যই ‘রেয়াল মাদ্রিদের ভিনিসিউস’ হয়ে উঠতে হবে। 

মাঠে তার বিচরণে ফুটে ওঠে মরিয়া ভাব, তবে মুখে লেগে থাকে এক চিলতে হাসি, মেজাজ হারিয়ে নানা কাণ্ড করে সমালোচিতও হন- এসবে ফুটবলের প্রতি ভিনিসিউসের অকৃতিম ভালোবাসা স্পষ্ট। যেন তার শিরায় শিরায় প্রবাহিত হয় ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের ডিএনএ। আধুনিক ফুটবলে যে কজন ব্রাজিলিয়ানের পায়ে সবচেয়ে সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে জোগো বোনিতো, তাদের একজন এই ভিনিসিউস।

বিশ্বকাপের মঞ্চে যে ২৪ বছরের শিরোপা খরা চলছে ব্রাজিলের, ‘হেক্সা’ জয়ের যে স্বপ্নে বিভোর হয়ে আছে প্রত্যেক ব্রাজিলিয়ান, এই সবকিছুকে সত্যি করতে আসছে বিশ্বকাপে নিশ্চিতভাবেই আনচেলত্তির সবচেয়ে সেরা না হলেও, প্রধান অস্ত্রগুলোর একটি হতে যাচ্ছেন ভিনিসিউস।

সবুজ আঙিনায় ভিনিসিউসের অর্জন

রিও দে জেনেইরোর শহর সাও গন্সালোয় জন্ম ভিনিসিউসের। কৈশোরেই তার ফুটবল প্রতিভা নজর কাড়ে, বিশেষ করে বললে ফুটসালে। ওই বয়সেই বল পায়ে তার অবিশ্বাস্য কারুকাজ দেখে মুগ্ধ হয়ে তাক দলে টানে ফ্ল্যামেঙ্গো।

ইনডোর কোর্ট ছেড়ে ব্রাজিলের দারুণ সফল এই ক্লাবের হয়েই সবুজ ঘাসে যাত্রা শুরু হয় ভিনিসিউসের এবং এখানেই নিজেকে পুরোপুরি শাণিত করেন তিনি। 

ইউরোপের জায়ান্ট ক্লাবগুলোর নজর কাড়তেও সময় নেননি ভিনিসিউস। ২০১৮ সালে তার ঠিকানাও বদলে যায়, যোগ দেন স্পেন ও ইউরোপের সবচেয়ে সফল ক্লাব রেয়ালে।

১৬ বছর বয়সে ফ্ল্যামেঙ্গোর হয়েই সিনিয়র ফুটবলে পা রাখেন ভিনিসিউস। দুই বছরের মধ্যে রেয়ালে যোগ দিয়ে ক্লাবটির হয়ে অভিষেকও হয়ে যায় তার।

স্প্যানিশ ক্লাবটিতে প্রথমদিকে অবশ্য বেশ ভুগতে দেখা যায় তাকে। দুই পায়ে ফুটবলের ঝলক দেখা গেলেও, ধারাবাহিকতা পেতে লড়াই করতে হয় তাকে। তবে, কঠিন সেই সময়কে পেছনে ফেলার পর আর তাকে পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি।

স্প্যানিশ জায়ান্টদের হয়ে এখন পর্যন্ত ৩০০টির বেশি ম্যাচ থেলে ২০০টির বেশি গোলে অবদান রেখেছেন তিনি। এরই মধ্যে তিনি জিতেছেন তিনটি লা লিগা, দুটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগসহ অনেক শিরোপা। উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ওই দুই ফাইনালেই গোল করেন তিনি। ২০২৪ সালে জয় করেন ‘দা বেস্ট ফিফা মেন’স প্লেয়ার’ পুরস্কার। 

ভিনিসিউসের ফুটবলে সবচেয়ে নজর কাড়া দিক তার গতি; বল পায়ে দারুণ ক্ষীপ্রতায় ছুটে প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভেঙে দিতে পারেন তিনি। এরপর কৌশলগত মেধা; দুর্দান্ত ড্রিবলিংয়ে সামনের জনকে বোকা বানাতে পারেন এবং প্রতিপক্ষের সীমানায় বিশেষ মুহূর্তে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, যা গড়ে দিতে পারে ব্যবধান।  

তবে, জাতীয় দলের হয়ে এখনও নিজেকে সেভাবে মেলে ধরতে পারেননি, দিতে পারেননি প্রত্যাশার প্রতিদান। তাই আগামী জুন-জুলাইয়ের বিশ্বকাপে তার সামনে চ্যালেঞ্জ এখন একটাই, ক্লাবের সাফল্য বিখ‍্যাত হলুদ জার্সিতেও ফুটিয়ে তোলার। 

সতীর্থ, কোচ ও গ্রেটদের চোখে ভিনিসিউস

“ভিনিকে আমি ভালোবাসি। সে খুব ভালো একজন বন্ধু, ফুটবল যা আমাকে দিয়েছে। সে সত্যিকারের এক যোদ্ধা, জীবনে যার অনেক কিছু সইতে হয়েছে, কিন্তু সব প্রতাশাকে সে ছাড়িয়ে গেছে এবং সব সমালোচনার জবাব দিয়েছে। আমাদের জন্য সে একজন আদর্শ এবং নায়ক।”

-নেইমার

“এই মুহূর্তে, সে বিশ্বের সবচেয়ে নির্ণায়ক খেলোয়াড়।”

-কার্লো আনচেলত্তি

“সে অনেক দলগত ট্রফি ও ব্যক্তিগত পুরস্কার জিতেছে, কিন্তু তার যে দিকটাকে আমি বেশি সম্মান করি, সেটা হলো তার নম্রতা। সে সবসময় আমাদের পাশে থাকে, তার মানুষদের সঙ্গে থাকে। তার এই দিকটা সত্যিই আমার খুব ভালো লাগে।”

-কিলিয়ান এমবাপে

“(দা বেস্ট ফিফা মেন’স প্লেয়ার) এর অর্থ তার ম্যাচের ফল নির্ণায়ক দক্ষতা এবং ২০২৩-২৪ মৌসুমে পরিসংখ্যানের চেয়েও অনেক বেশি। ভিনিসিউসের প্রতিভাই তার এই পুরস্কার প্রাপ্তির ন্যায্যতা প্রমাণে যথেষ্ট, কিন্তু মাঠে তার প্রভাব আরও অনেক বেশি।”

-রোনালদো

পরিসংখ্যানে ভিনিসিউস জুনিয়র

•     উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগে এখন পর্যন্ত ৩২টি গোল করেছেন ভিনিসিউস। প্রতিযোগিতাটির ইতিহাসে রোনালদো, রোনালদিনিয়ো ও কাকার মতো গ্রেটদের ছাড়িয়ে ব্রাজিলিয়ানদের মধ‍্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতা এখন তিনিই, তার ওপরে আছেন কেবল নেইমার।  

•    ভিনিসিউস যেন অনেক গ্রেটদের মতো হয়ে উঠেছেন ফাইনালের তারকা, শিরোপা লড়াইয়ে নিয়মিত গোল করেন তিনি। সবশেষ, গত জানুয়ারিতে স্প্যানিশ সুপার কাপের ফাইনালে বার্সেলোনার বিপক্ষে ৩-২ গোলে হারের ম্যাচেও গোল করেন তিনি।

•    রেয়াল মাদ্রিদের জার্সিতে এখন পর্যন্ত ফাইনালে ১৬টি গোল করেছেন ভিনিসিউস, ক্লাবটির জার্সিতে ফাইনালে গোলের হিসেবে রোনালদো, কারিম বেনজেমা ও পুসকাসের সঙ্গে যৌথভাবে এই তালিকায় আছেন শীর্ষে।

•    রেয়াল মাদ্রিদের হয়ে এখন পর্যন্ত ১৪টি ট্রফি জিতেছেন ভিনিসিউস; দুটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, তিনটি লা লিগা, একটি কোপা দেল রে, তিনটি সুপার কাপ, তিনটি ফিফা ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপ এবং দুটি উয়েফা সুপার কাপ।

•    ব্রাজিল জাতীয় দলে ভিনিসিউস প্রথম ডাক পান ১৮ বছর বয়সে, সেই থেকে সেলেসাওদের হয়ে আটটি গোল ও ছয়টি অ্যাসিস্ট করেছেন তিনি। আন্তর্জাতিক ফুটবলে এখনও অবশ্য কোনো ট্রফি জয়ের স্বাদ তিনি পাননি।

•    ২০২১-২২ মৌসুম থেকে প্রতি মৌসুমে অন্তত ২১টি করে গোল করেছেন ভিনিসিউস। চলতি মৌসুমের শুরুতে অনেকটা সময় তাকে গোল খরায় ভুগতে দেখা গেছে, তবুও এই মৌসুমে এখন তার গোল ১৩টি। অ্যাসিস্ট যোগ করলে প্রতি মৌসুমে তার গোলে অবদান রাখার সংখ্যাটা ৩০ ছাড়িয়ে যায়।

বিশ্বকাপে ভিনিসিউসের পথচলা

কেবল ২০২২ বিশ্বকাপেই খেলেছেন ভিনিসিউস। 

ওই টুর্নামেন্টে ব্রাজিলের পাঁচ ম্যাচের চারটিতে খেলেন তিনি এবং ম্যাচগুলোয় উল্লেখযোগ্য অবদানও রাখেন। বিশ্বকাপ অভিষেকে সার্বিয়ার বিপক্ষে রিশার্লিসনের গোলে অ্যাসিস্ট করেন তিনি। পরে সেটাই টুর্নামেন্টে সেরা গোল নির্বাচিত হয়। 

এরপর, শেষ ষোলোয় দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে অসাধারণ পারফরম্যান্স করেন ভিনিসিউস। একটি গোল করার পাশাপাশি লুকাস পাকেতার গোলেও রাখেন অবদান। কোয়ার্টার-ফাইনালে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষেও শুরুর একাদশে ছিলেন তিনি; কিন্তু বিরতির পর তাকে তুলে নেন কোচ। পরে ওই ম্যাচ টাইব্রেকারে হেরে টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে যায় ব্রাজিল। 

বিশ্বকাপ ঘিরে ভিনিসিউস ও ব্রাজিলের প্রত্যাশা 

ব্রাজিলের মতো এই জাতির কাছে বিশ্বকাপ মানেই স্বপ্ন একটাই, জিততে হবে ট্রফি। কেবল তাই নয়, উপহার দিতে হবে সুন্দর ফুটবলও। যদিও সবশেষ তারা বিশ্ব সেরার মুকুট পরেছিল ২০০২ সালে।

এরপর সময় পেরিয়ে গেছে প্রায় দুই যুগ, কেটে গেছে পাঁচটি আসর; কিন্তু ষষ্ঠ বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন আর পূরণ হয়নি তাদের।

ক্লাব ফুটবলের অবিশ্বাস্য সফল কোচ কার্লো আনচেলত্তির হাত ধরে ষষ্ঠ বিশ্বকাপ জয়ের আশায় আছে ব্রাজিল। আর এই স্বপ্ন পূরণের অভিযানে মূল কাণ্ডারি হয়ে ওঠার সামর্থ্য আছে ভিনিসিউসের, এখন সেটাই মাঠে করে দেখানোর চ্যালেঞ্জ তার সামনে।আগামী ১৪ জুন বাংলাদেশ সময় ভোরে মরক্কোর বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে বিশ্বকাপে যাত্রা শুরু হবে ব্রাজিলের। ‘সি’ গ্রুপে তাদের অন্য দুই প্রতিপক্ষ হাইতি ও স্কটল্যান্ড।