১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

২০২৬ বিশ্বকাপের ২৬ সুপারস্টার: কিলিয়ান এমবাপে

এই দলে এমবাপের চারপাশে তারকার যে ছড়াছড়ি, তাতে আসছে বিশ্বকাপেও টপ ফেভারিট ফ্রান্স।

২০২৬ বিশ্বকাপের ২৬ সুপারস্টার: কিলিয়ান এমবাপে
১৮ বছর বয়সে রূপকথার গল্প লিখে ছুটছেন কিলিয়ান এমবাপে। ছবি: ফিফা

স্পোর্টস ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 07 Jun 2026, 06:17 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:17 PM

ক্লাব ফুটবলেও যথেষ্ট দ‍্যুতিময় কিলিয়ান এমবাপে, অনেক অর্জন আর রেকর্ডে ঋদ্ধ। কিন্তু বিশ্বকাপের এমবাপের কাছে তিনিও যেন ম্লান। পরপর দুটি বিশ্বকাপে দলকে ফাইনালে নিয়ে যাওয়া, এক ফাইনালে দ্বিতীয় সর্বকনিষ্ট খেলোয়াড় হিসেবে গোল করা, অন‍্যটিতে হ‍্যাটট্রিক! রাশিয়ায় মুঠো ভরে পাওয়ার পর কাতারে ট্র‍্যাজেডির নায়ক, এবার কী অপেক্ষা করছে ফরাসি তারকার জন‍্য?

২০২৬ বিশ্বকাপে নিজ দেশের স্বপ্নের সারথীদের নিয়ে ফিফার আয়োজন ২৬ সুপারস্টার। এই পর্বে আছেন ফরাসি ফরোয়ার্ড কিলিয়ান এমবাপে।

ক্লাব ফুটবলে দ্যুতি ছড়িয়ে ১৮ বছর তিন মাস বয়সে জাতীয় দলে অভিষেক, পরের ১৬ মাসেই মাথায় বিশ্ব চ্যাম্পিয়নের মুকুট এবং টুর্নামেন্টের সেরা তরুণ খেলোয়াড়ের স্বীকৃতি-এমন অনেক কৃতিত্বে ভরা এমবাপের ক্যারিয়ার। শুরুটা সত্যিই যেন এক রূপকথার গল্প।

অমন শুরুর পর অনিন্দ‍্য সেই গল্পে রোমাঞ্চকর সব অধ্যায় যোগ করে চলেছেন এমবাপে। নামের পাশে তারকা শব্দটি পাকাপোক্ত হয়ে গেছে। তিনি যে বয়সে আছেন এবং যেভাবে এগিয়ে চলেছেন, তার গল্পের অনেকটা যে এখনও বাকি, তা বলাই যায়।

২০১৮ সালের ওই রাশিয়া বিশ্বকাপে এমবাপে ছিলেন তরুণ সেনশেসন। অনেকে হয়তোবা তাকে কেবলই সৌভাগ্যবান ভেবেছিলেন, সময়ের সঙ্গে তাদেরকে ভুল প্রমাণ করেন তিনি। চার বছর পর তার চওড়া কাঁধে চড়েই কাতার বিশ্বকাপের ফাইনালে পৌঁছে যায় ফ্রান্স, রুদ্ধশ্বাস শিরোপা লড়াইয়ে তার হ্যাটট্রিকে ট্রফি ধরে রাখার দারুণ সম্ভাবনাও জাগায় দলটি; কিন্তু স্বপ্নভঙ্গ হয় টাইব্রেকারে।

ফরাসি দলটি এখনও আগের মতোই শক্তিশালী, রাশিয়া ও কাতারে আলো ছড়ানো দলটির পুরনো সদস্যদের এখনও অনেকেই আছেন। ঘুরেফিরে একটা প্রশ্ন তাই উঁকি দিচ্ছে-প্যারিসের শহরতলী বঁদির এই ছেলেটি কি পারবে টানা তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলতে?

উত্তর মিলবে আগামী জুন-জুলাইয়ে ৪৮ দলের বিশ্বকাপে।

এর আগে, মোনাকো ও পিএসজিতে দারুণ সব কীর্তি গড়ে এবং সাফল্য পেয়ে এখন রেয়াল মাদ্রিদে মাঠ মাতানো এমবাপের ক্যারিয়ারে ফিরে দেখা যাক।

ফুটবলের আঙিনায় এমবাপের অর্জন

ক্লাব ফুটবলে ইতোমধ্যে ১৮টি শিরোপার স্বাদ পেয়ে গেছেন এমবাপে; ২০১৫ সালে মোনাকোয় যোগ দিয়ে ক্লাবটির হয়ে দুটি, পিএসজির জার্সিতে ছয়টি লিগ আঁসহ ১৪টি এবং রেয়াল মাদ্রিদের হয়ে দুটি, ২০২৪-এর জুন থেকে মাদ্রিদের দলটিতে খেলছেন তিনি।

২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপ জয়ের চার বছর পর, কাতারে রুপার পদক গলায় পরেন এমবাপে ও তার সতীর্থরা। এছাড়া ফ্রান্সের জার্সিতে ২০১৬ সালে ইউরোপিয়ান অনূর্ধ্ব-১৯ ও ২০২১ সালে জাতীয় দলের হয়ে হয়ে উয়েফা নেশন্স লিগ জয় করেন তিনি।

ক্যারিয়ারের শুরুতে বল পায়ে অবিশ্বাস্য গতির জন্যও আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসেন এমবাপে। মাঝমাঠ থেকে ক্ষিপ্রতায় ছুটে ও দারুণ ড্রিবলিংয়ে প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভেঙে ডি-বক্সে ঢুকে পড়তে পারেন তিনি, গোলও করেন নিয়িমিত, যার প্রমাণ মেলে পরিসংখ্যানেও।

পিএসজির ইতিহাসে রেকর্ড সর্বোচ্চ ২৫৬টি গোল করেছেন এমবাপে এবং দলটির হয়ে ২০১৬ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত টানা ছয়বার লিগ আঁর সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়ার কীর্তি গড়েছেন তিনি।

বিশ্বকাপ ফাইনালে তার চেয়ে বেশি গোল করতে পারেনি কেউ; ২০১৮ সালে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে দূরপাল্লার শটে একটি দর্শনীয় গোলের পর, ২০২২ আসরে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করেন এমবাপে।

গ্রেটদের চোখে এমবাপে

“এমবাপে আমার উত্তরাধিকারী হতে পারে, আমি মজা করছি না। তার গতিময় ফুটবল খেলার যে সামর্থ্য, এর মধ্যে আমি আমার অনেকটা দেখতে পাই। সে একজন ফরোয়ার্ড এবং দ্রুত চিন্তা করে। বল পাওয়ার সময়ই সে জানে, কী করতে হবে, কোন দিকে ছুটতে হবে, আগেই সে বুঝে যায়।”

-    পেলে

“সে ইতিহাস গড়বে এবং সবাইকে ছাড়িয়ে যাবে।”

-    জিনেদিন জিদান

“কিলিয়ান ব্যতিক্রমী এক খেলোয়াড়। যেন একটা দানব, যে ওয়ান-অন-ওয়ানে খুবই শক্তিশালী, যে অনেক গোল করে। সে এক পরিপূর্ণ খেলোয়াড়, বছরের পর বছর ধরে সে এটা প্রমাণ করেছে এবং আগামীতেও আরও অনেক বছর ধরে তাই করে যাবে। সে অবশ্যই ইতিহাসের সেরাদের কাতারে বিবেচিত হবে।”

-    লিওনেল মেসি

“সে (সাফল্যের জন্য) খুবই ক্ষুধার্ত। মানসিকতার বিচারে সে একটা শার্কের মতো। সে যতটা সম্ভব সবতিছু পেতে চায়। আবার ব্যক্তি জীবনে সে অসাধারণ একজন মানুষ, দারুণ বুদ্ধিমান, সবসময় হাসিখুশি। তবে মাঠে নামলেই সে হাঙ্গরের মতো হয়ে যায়।”

-    টমাস টুখেল

“কী দুর্দান্ত এক খেলোয়াড়! আপনি শুধু তাকে খেলতে দেখতে চাইবেন। সে অসাধারণ একজন মানুষ। খেলার এই ধরণটাই আমি পছন্দ করি।”

-    রোনালদিনিয়ো

গল্পের একটু অন্যরকম দিক

** ফ্রান্স জাতীয় এমবাপেকে তার কয়েকজন সতীর্থ ‘৩৭’ নামে ডাকে। কারণ? ২০১৮ বিশ্বকাপে শেষ ষোলোয় আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ম্যাচের ত্রয়োদশ মিনিটে ঘণ্টাপ্রতি ৩৭ কি:মি: গতিতে ছুটে দলের প্রথম গোলটি করেন এমবাপে, সেই থেকেই তার ওই ভিন্ন ধরণের নাম।

** ২০২৪ সালে, ২৫ বছর বয়সে, সবচেয়ে কম বয়সীদের একজন হিসেবে ইউরোপিয়ান ক্লাবের মালিক হয়েছেন এমবাপে; ফ্রান্সের ক্লাব এসএম কঁ-য়ের ৮০ শতাংশ মালিকানা কিনেছেন তিনি। 

** ইনস্টাগ্রামে সবচেয়ে জনপ্রিয় ফরাসি খেলোয়াড় হচ্ছেন এমবাপে, ফলোয়ার ১৩ কোটির বেশি। অনেকটা পেছনে থেকে তালিকার দুইয়ে কারিম বেনজেমা (সাড়ে সাত কোটি) ও তিনে পল পগবা (সাড়ে ছয় কোটি)।

পরিসংখ্যানের আলোয় এমবাপের ক্যারিয়ার

•    ২০২২ সালে কাতারে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করে বিশ্বকাপের কোনো আসরে ফাইনালে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড স্পর্শ করেন এমবাপে; ১৯৬৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে ইংল্যান্ডের ৪-২ ব্যবধানে জয়ে তিনটি গোল করেছিলেন জিওফ হার্স্ট।

•    ২০২২ সালের ১৮ ডিসেম্বর লুসাইল স্টেডিয়ামে সর্বকনিষ্ঠ ফুটবলার হিসেবে দুটি বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলেন এমবাপে, ২৩ বছর ১১ মাস ২৯ দিন বয়সে।

•    আগামী ১৯ জুলাই ২০২৬ আসরের ফাইনালে যদি ফ্রান্স উঠতে পারে, তাহলে ব্রাজিলের কাফুর টানা তিনটি ফাইনাল (১৯৯৪, ১৯৯৮ ও ২০০২) খেলার রেকর্ডে ভাগ বসাতে পারেন এমবাপে। 

•    আগের দুই বিশ্বকাপে এমবাপে গোল করেছেন ১২টি। আসছে আসরে পাঁচটি করতে পারলে তিনি ছাড়িয়ে যাবেন টুর্নামেন্টের বর্তমান রেকর্ড গোলদাতা মিরোস্লাভ ক্লোসাকে (১৬টি), ২৭ বছর বয়সেই।

•    বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত পাঁচবার ম্যাচ সেরা হয়েছেন এমবাপে। উত্তর আমেরিকার এবারের আসরে এই রেকর্ডও ভাঙতে পারেন তিনি; বর্তমানে রেকর্ডটি লিওনেল মেসির দখলে, ৯ বার ম্যাচ সেরা হয়েছেন তিনি।

২০২৬ বিশ্বকাপে এমবাপে ও ফ্রান্সের প্রত্যাশা

স্কোয়াডে তারকা খেলোয়াড়দের যে ছড়াছড়ি, এবং কয়েক বছরে দলটির যে দারুণ ধারাবাহিক পারফরম্যান্স, তাতে আসছে বিশ্বকাপেও টপ ফেভারিট হিসেবেই থাকবে ফ্রান্স। 

এমবাপের সঙ্গে গত বছরের ফিফা বর্ষসেরার পুরস্কার জয়ী উসমান দেম্বেলে, তরুণ তারকা উগো একিটিকে-দিজিরে দুয়েদের উপস্থিতিতে দলটির আক্রমণভাগ যেন হয়ে উঠেছে আরও ভয়ঙ্কর। রক্ষণে উইলিয়াম সালিবা ও দায়ত উপামেকানো এবং সেরি আর প্রতিষ্ঠিত মিডফিল্ডার আদ্রিওঁ রাবিও ও মাঝমাঠের নতুন সদস্য মানু কোনেদের নিয়ে মাঠে আরও কার্যকর হয়ে উঠেছে দিদিয়ে দেশমের দল।

অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার মাইকেল ওলিসেও উত্তর আমেরিকায় দলের কাণ্ডারি হয়ে উঠতে পারেন। সেই সামর্থ্য তার যথেষ্টই আছে, বায়ার্ন মিউনিখের জার্সিতে প্রমাণও দিয়েছেন তিনি, বুন্ডেসলিগায় ৫৫ ম্যাচ খেলে ২২ গোলের পাশাপাশি ৩৬টি অ্যাসিস্টও করেছেন তিনি।

আছেন আরেক অ্যটাকিং মিডফিল্ডার হায়ান শেহকি, ম্যানচেস্টার সিটির জার্সিতে বেশ ভালো ফর্মে আছেন তিনি; অভিষেক মৌসুমে দলটির হয়ে সব মিলিয়ে এখন পর্যন্ত ৩৫ ম্যাচ খেলে ৯টি করে গোল ও অ্যাসিস্ট করেছেন তিনি।

আর ডাগআউটে থাকবেন অনেক সাফল্যের কাণ্ডারি কোচ দিদিয়ে দেশম। 

কোচ ও খেলোয়াড় হিসেবে দেশকে বিশ্বকাপ জেতানো দেশম এই টুর্নামেন্ট দিয়েই বিদায় জানাবেন জাতীয় দলকে। প্রিয় কোচের শেষটা সবচেয়ে বড় সাফল্যের রঙে রাঙাতে হয়তো মুখিয়ে থাকবে খেলোয়াড়রাও।

তবে বিশ্বকাপ ঘিরে এমবাপেকে নিয়ে একটা অনিশ্চয়তার জায়গাও আছে। ক্লাব রেয়াল মাদ্রিদের হয়ে খেলার সময় গত ডিসেম্বরে হাঁটুতে চোট পেয়েছিলেন তিনি, যা এখনও বেশ ভোগাচ্ছে তাকে। মাঝে তিনি মাঠে ফিরলেও, স্পষ্টতই রয়ে গেছে অস্বস্তি। গতিও কমেছেও কিছুটা।

এই শঙ্কাকে তাই উড়িয়ে দেওয়াও যাচ্ছে না, যা সত্যি হলে ফরাসিদের বিশ্বকাপ স্বপ্নে বড় আঘাত হয়ে আসবে।

আগামী ১৬ জুন সেনেগালের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে বিশ্বকাপে যাত্রা শুরু করবে ফ্রান্স। আই গ্রুপে তাদের অন্য দুই প্রতিপক্ষ নরওয়ে ও আন্তঃমহাদেশীয় প্লে-অফ জয়ী দল।