নান্দনিক ফুটবলের ফুল ফুটিয়ে বাংলাদেশের শিরোপার সৌরভ

টুর্নামেন্টে জুড়ে ছন্দময় ফুটবলের প্রদর্শনী মেলে ধরে শেষ পর্যন্ত চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরবে নিজেরে রাঙিয়েছে গোলাম রব্বানী ছোটনের দল।

কাঠমান্ডু থেকে মোহাম্মদ জুবায়েরবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 20 Sept 2022, 03:56 AM
Updated : 20 Sept 2022, 03:56 AM

শেষ বাঁশি বাজতেই যেন কেঁপে উঠল বাংলাদেশের ডাগআউট। নেচে উঠল মেয়েরা। শুরু হলো দ্বিগ্বিদিক ছুটোছুটি আর বাঁধনহারা উদযাপন। আকাশ ছুঁয়ে পরস্পরকে আলিঙ্গনে জড়ানোর উচ্ছ্বাস। যার এতদিনের শ্রমে-ঘাম-ত্যাগে এতটা পথ পেরিয়ে ধরা দিল স্বপ্নের ট্রফি, রচিত হলো ইতিহাস, সেই কোচ গোলাম রব্বানী ছোটনকে শূন্যে ছুঁড়ে সম্মান আর ভালোবাসার চিহ্ন এঁকে দিলেন সাবিনা-কৃষ্ণা-মনিকারা। উৎসব যেন শেষই হতে চায় না।

শেষ হবেই বা কী করে! কত অপেক্ষার পর, কত উপেক্ষা আর যন্ত্রণার পথ পেরিয়ে, হাজারও পারিপার্শ্বিকতার সঙ্গে লড়াই করে তবেই এলো এমন দিন। এতদিনের শূন্যতার হাহাকার ঘুঁচিয়ে প্রাপ্তির পূর্ণতায় মেতে ওঠার উৎসব তো শেষ হওয়ার নয়।

শুধু অধরা ট্রফি ধরা দিয়েছে বলেই নয়, বাংলাদেশের মেয়েরা মন জয় করেছে ছন্দময় ফুটবলের নান্দনিক প্রদর্শনীতে। টুর্নামেন্ট জুড়ে সুন্দর ফুটবলের পসরা সাজিয়েই শেষ পর্যন্ত বিজয়মঞ্চে পা রেখেছে এই মেয়েরা।

এ নিয়ে পঞ্চমবারের মতো ফাইনাল হওয়া নেপালের মনটা ভারী। ম্যাচের আগেই হুট করে কাঠমান্ডুর আকাশেরও মন খারাপ। দুপুরে ছিল কাঠফাটা রোদ, এরপরই আকাশ মেঘলা।

সূর্য যখন পশ্চিম দিগন্তে একটু করে হেলতে শুরু করল, আকাশের কান্না রূপ নিল ভারি বর্ষণে। র দশরথ স্টেডিয়ামের সবুজ আঙিনা হয়ে উঠল কর্দমাক্ত, পিচ্ছিল। সাবিত্রা ভান্ডারি-অনিতা বাসনেতরা পারলেন না শতদলে ফুটে উঠতে। কিন্তু কাঁদা-জলে মাখামাখি হয়ে যাওয়া ক্যানভাসে সুন্দর ফুটবলের তুলির আঁচড়ে প্রথম শিরোপা জয়ের ছবিটা ঠিকই আঁকলেন সাবিনা-শামসুন্নাহাররা।

শুরু থেকেই আগ্রাসী বাংলাদেশ। বড় একটা ধাক্কাও এলো শুরুতে। ভারতের বিপক্ষে জোড়া গোলের উৎসব করা, ভুটানের বিপক্ষে সেমি-ফাইনালে ১ মিনিট ৩৪ সেকেন্ডে জাল খুঁজে নেওয়া সিরাত জাহান স্বপ্না মাঠ ছাড়লেন খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। ম্যাচের বয়স যখন মাত্র ১০ মিনিট, আক্রমণভাগের বড় ভরসাকে হারাল দল।

ছোটখাট গড়নের শামসুন্নাহার জুনিয়র নামলেন স্বপ্নার অভাব পূরণের পাহাড়সমান চাপ নিয়ে। চার মিনিটেই মধ্যেই শঙ্কার কালো মেঘটা সরিয়ে দিলেন তিনিই।

একজনকে কাটিয়ে বাইলাইনের একটু উপর থেকে মনিকা চাকমা চকিতে টার্ন করে দারুণ ক্রস বাড়ালেন বক্সে, শামসুন্নাহারের দুরন্ত ফ্লিকে চোখের পলকে বল লুটোপুটি খেল জালে। স্বাগতিক সমর্থকে কানায় কানায় ভরা গ্যালারিতে তখন শ্মশানের নীরবতা। বাংলাদেশের প্রাপ্তির ছবিতেও পড়ল প্রথম আচঁড়টি।

৩৪তম মিনিটে অবিশ্বাস্য দৃঢ়তায় বাসনেতের শট ঝাঁপিয়ে কর্নারের বিনিময়ে ফেরালেন গোলরক্ষক রুপনা চাকমা। ওই কর্নারের পর জটলার ভেতরে থেকে নেপালের শট একদফা ফিরল পোস্টে লেগে, এরপর গোললাইন থেকে দলকে বাঁচালেন মাসুরা পারভীন। ২০১৯ সালে বিরাটনগরে সাফে নেপালের বিপক্ষে সেমি-ফাইনালে ষষ্ঠ মিনিটে আত্মঘাতী গোল করার শাপমোচন এবার কী দারুণভাবেই না করলেন এই ডিফেন্ডার।

পরে ম্যাচ যখন শেষ, চোয়ালবদ্ধ প্রতিজ্ঞার অভিযান সফল, মাসুরা তখন নাচতে শুরু করলেন। তার সঙ্গে যোগ দিলেন মনিকা-মারিয়ারা। মাসুরার নাচের তালে যেন বিরাটনগের সেই কষ্ট ভোলার সুর বেজে উঠল। শোনালেন দুঃস্বপ্ন থেকে মুক্তির স্বস্তি।

“এবার কিন্তু গোল-লাইন থেকে সেভ করে দলকে বাঁচিয়েছি। এখন আর কেউ বলতে পারবে না ওই আত্মঘাতী গোলের কথা!”

ঘড়ির কাঁটার ঘুর্ণনের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক অর্জনের ছবি ফুটে উঠতে লাগল একটু একটু করে। ৪১তম মিনিটে ব্যবধান দ্বিগুণের উচ্ছ্বাসে মেতে ওঠল বাংলাদেশ।

প্রতিপক্ষের এক খেলোয়াড়ের ভুলে বল পেয়ে অধিনায়ক সাবিনা খাতুন পাস বাড়ান কৃষ্ণার উদ্দেশে। প্রথম ছোঁয়ায় নিয়ন্ত্রণে নিয়ে একটু এগিয়ে বাঁ পায়ের নিখুঁত শটে গোলরক্ষকের মাথার উপর দিয়ে লক্ষ্যভেদ করেন এই ফরোয়ার্ড। পরে আরও একবার গোলের আনন্দে দশরথের আঙিনায় ডানা মেলেন তিনি।

ফাইনালে জোড়া গোল করা কৃষ্ণার আনন্দ যেন বাঁধ মানছিল না।

“ভারতের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের ম্যাচে এক গোল করেছিলাম। ফাইনালে দুই গোল করলাম। এই আনন্দ কীভাবে প্রকাশ করব… সত্যিই খুব-খুব ভালো লাগছে।”

বাংলাদেশের এই ভালো লাগার দেয়ালে একবারই ঝাঁকুনি দিতে পেরেছে নেপাল। ৭০তম মিনিটে যখন বক্সের ভেতরে ফাঁকায় বল পেয়ে জোরালো কোনাকুণি শটে লক্ষ্যভেদ করেন বাসনেত। রুপনা ঝাঁপিয়ে পড়েও বলের নাগাল পাননি। টুর্নামেন্টে এই প্রথম তিনি পরাস্ত হলেন; বাংলাদেশও হজম করল প্রথম গোল!

কিন্তু ম্যাচের চিত্রনাট্যে চালকের আসনে বাংলাদেশই। ৭৭তম মিনিটে নেপালের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দিল দল। সতীর্থের থ্রু পাস ধরে ঠাণ্ডা মাথায় নেপাল গোলরক্ষককে ফাঁকি দিলেন কৃষ্ণা। শুরু হলো জয়ের রঙ মেখে মেয়েদের সাফের প্রথম শিরোপা উৎসবে মেতে ওঠার ক্ষণ গণনা।

গত চার ম্যাচের মতো ফাইনালেও নিজেদের কাজগুলো করতে থাকল মেয়েরা। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নেপালের আক্রমণের তানগুলো কখনও নিখুঁত স্লাইডে, কখনও দারুণ ট্যাকলে কেঁটে দিয়েছেন আঁখি খাতুন-শিউলি আজিমরা। মাঝে মধ্যে একটু খেই হারালেও মাঝমাঠের লাগাম ঠিকই মুঠোয় রেখেছেন মনিকা-মারিয়া-সানজিদারা। ফরোয়ার্ড সাবিনাও একটু নিচে নেমে খেলে আক্রমণভাগ-মাঝমাঠের সুর বেঁধে দিয়েছেন ম্যাচজুড়ে। কখনও কখনও রক্ষণে এসে যোগ্য দলনেতার মতো বাড়িয়েছেন সহযোগিতার হাত।

এভাবেই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়ে যাওয়া, সুন্দর-উপভোগ্য-দাপুটে ফুটবল খেলার রঙ-তুলিতে আঁকা হয়েছে বাংলাদেশের সাফের কোনো আসরে মুঠোভরে পাওয়ার ছবিটা। কোচ ছোটনের কণ্ঠেও বেজে উঠল তা।

“এই টুর্নামেন্টের শুরু থেকে ফাইনাল পর্যন্ত মেয়েরা একই ধারাবাহিকতায় খেলেছে। সব বিভাগে আধিপত্য করেছে। বলেছিলাম আমরা সুন্দর ফুটবল খেলব, উপভোগ্য ফুটবল খেলব। ফাইনালেও মেয়েরা সেটাই করেছে। এই মেয়েদেরকে স্যালুট।”

টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় এবং সর্বোচ্চ গোলদাতা সাবিনা, সেরা গোলরক্ষক রুপনা চাকমা, দক্ষিণ এশিয়ার মেয়েদের ফুটবলের সর্বোচ্চ আসরের চ্যাম্পিয়নের মকুট তো বটেই, একই সঙ্গে ফেয়ার প্লে অ্যাওয়ার্ডও বাংলাদেশের!

নেপালে এসে তাদের বিপক্ষের ফাইনালে এর বেশি আর কী চাইতে পারত দল! ইতিহাসে খোদাই হয়ে গেল হিমালয়ের দেশে বাংলাদেশের মেয়েদের দৃপ্ত পদচারণা।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক