তৃপ্তি-অতৃপ্তি নিয়ে মূল বিশ্বকাপ ঘিরে স্বপ্ন আমিরুলের
জুনিয়র হকি বিশ্বকাপে আলো ছড়ানো এই তরুণ ব্যক্তিগত ও দলীয় পারফরম্যান্সের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি নিয়ে বললেন অনেক কথা।
পাঁচ ম্যাচে ১৫ গোল, এর মধ্যে হ্যাটট্রিকই ৪টি! এই পরিসংখ্যানই দেখাচ্ছে চলমান জুনিয়র হকি বিশ্বকাপে আমিরুল ইসলামের স্টিকের দাপট। প্রথমবারের মতো এই প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া বাংলাদেশের দলীয় পারফরম্যান্স অবশ্য খুব একটা ঝলমলে নয়; তবে আমিরুল ঠিকই স্টিকের কারুকাজে, নিখুঁত ড্র্যাগ অ্যান্ড ফ্লিকে নজর কেড়েছেন সবার। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সাথে আলাপচারিতায় ২০ বছর বয়সী এই খেলোয়াড় শোনালেন হকিতে আসার ও ড্র্যাগ অ্যান্ড ফ্লিকে পারদর্শী হয়ে ওঠার গল্প।
পুল পর্বে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ৫-৩ ব্যবধানে বাংলাদেশের হেরে যাওয়া ম্যাচ দিয়ে দ্যুতি ছড়ানোর শুরু আমিরুলের। সেদিন তিনি পেয়েছিলেন প্রথম হ্যাটট্রিকের দেখা। দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে ৩-৩ ড্র ম্যাচে করেন দলের তিনটি গোলই। এরপর স্থান নির্ধারণী পর্বে এসে ওমানকে ১৩-০ এবং দক্ষিণ কোরিয়াকে ৫-৩ ব্যবধানে হারানো ম্যাচেও হ্যাটট্রিক উপহার দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইনফরমেশন সাইন্স অ্যান্ড লাইব্রেরি সাইন্স বিভাগে পড়ুয়া আমিরুল।
ব্যক্তিগত প্রাপ্তি নিয়ে উচ্ছ্বাসের জোয়ার থাকলেও, ভারতের তামিলনাড়ু থেকে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কিছু আক্ষেপের কথাও শোনালেন এই তরুণ।
টার্ফে নামলেই তো স্টিকে ঝলক দেখাচ্ছেন…
আমিরুল: আলহামদুলিল্লাহ, সব মিলিয়ে ভীষণ ভালো লাগছে। ভালো সময় কাটাচ্ছি। সবাই প্রশংসা করছে। খারাপ লাগার জায়গা বলতে দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে পুল পর্বের ড্র (৩-৩) ম্যাচটি। ওই ম্যাচটা যদি জিততে পারতাম, তাহলে আমরা সেরা ষোলো দলের মধ্যে থাকতে পারতাম। আসলে অনভিজ্ঞতার কারণে ম্যাচটা জিততে পারিনি।
কিন্তু প্রথমবারের মতো জুনিয়র হকি বিশ্বকাপে খেলতে যাওয়ার রোমাঞ্চও তো কম নয়।
আমিরুল: সেটা আছে। তবে এই বিশ্বকাপে যখন সুযোগ পেলাম, তখন শুধু ভেবেছি, আমরা স্রেফ অংশ নেওয়ার জন্য খেলব না। এমনভাবে খেলব, সবাই যেন আমাদেরকে সম্মান করে। সেটা আমরা কিছুটা হলেও আদায় করতে পেরেছি, যেটা ব্যক্তিগতভাবে আমার কাছে আনন্দের, গর্বের।
তাহলে এত দীর্ঘশ্বাস কেন?
আমিরুল: দেখুন, দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে পুল পর্বের ড্র ম্যাচ ছাড়াও হতাশা আছে ফ্রান্স ও অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ম্যাচের ফল নিয়ে। আমি মনে করি, এই দুটি ম্যাচও জেতার সামর্থ্য আমাদের ছিল। ফ্রান্সের কাছে ৩-২ এবং অস্ট্রেলিয়ার কাছে ৫-৩ গোলে হেরেছি। আসলে অনভিজ্ঞতার কারণে এই দুইটা ম্যাচে আমরা ছোট-ছোট ভুল করেছি, যেগুলোর মাশুল শেষ পর্যন্ত দিতে হয়েছে। তা না হলে আমরা আরও ভালো অবস্থানে থাকতে পারতাম।
এবার (সোমবার) অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে খেলবেন। জিততে পারলে ১৭তম হয়ে আসর শেষ করবেন।
আমিরুল: যদিও বিশ্বকাপের মতো আসরে শক্তিশালী দলগুলোর বিপক্ষে খেলা সহজ নয়। পুল পর্বে আমরা কোরিয়ার বিপক্ষে ড্র করেছি, ওমান ও দক্ষিণ কোরিয়াকে (স্থান নির্ধারণী ম্যাচে) হারিয়েছি, এটাও প্রাপ্তি। তবু শেষ ষোলো দলের মধ্যে থাকতে না পারার আক্ষেপটুকু থেকে যাবে।
ব্যক্তিগত প্রাপ্তি, বিশেষ করে ‘ড্র্যাগ অ্যান্ড ফ্লিক স্পেশালিস্ট’ খেতাব পাওয়া নিয়ে নিশ্চয় তুষ্টি আছে?
আমিরুল: এই খেতাব পাওয়া আমার কাছে একই সাথে গর্বের, দায়িত্বেরও। তবে এটা নিয়ে আমি কোনো চাপ নিতে চাই না। যতটা সম্ভব শান্ত থাকার চেষ্টা করব (সামনের দিনগুলোতে)। কেননা, চাপ নিলে কাজের কাজটি ঠিকঠাক করতে পারব না। আমি চাই ড্র্যাগ ফ্লিকে যত বেশি সম্ভব দেশকে গোল এনে দিতে।
ড্র্যাগ অ্যান্ড ফ্লিক হিটের প্রতি এই আগ্রহ কী শুরু থেকে?
আমিরুল: হ্যাঁ; যখন থেকে হকি শুরু করি, তখন থেকে ড্র্যাগ-ফ্লিক নিয়ে আমি অনেক কাজ করেছি। ঘাসের মাঠেই স্টিক দিয়ে টেনে এনে জোরে হিটের চেষ্টা করতাম। এরপর দেশি-বিদেশি যে কোচই পেয়েছি, তাদের কাছে এর কৌশল, হিট নিখুঁত করার নানা দিক নিয়ে প্রশ্ন করতাম, বুঝতে চেষ্টা করতাম, সে অনুযায়ী হিট করার চেষ্টা করতাম। এ কারণেই ড্র্যাগ-ফ্লিকে ভালো করতে পারছি। আসলে এই হিটের প্রতি শুরু থেকে আমার প্রবল আগ্রহ ছিল। এ কারণে এর অনুশীলনও খুব বেশি করতাম।
সত্যি বলতে এটা নিয়ে আমার মনে এমন ভাবনা কাজ করত যে, কেউ যদি ড্র্যাগ-ফ্লিকের কথা মনে করে, তার চোখের সামনে যেন আমার মুখটা ভেসে ওঠে! যেমনটা পিসি স্পেশালিষ্ট (পেনাল্টি কর্নার স্পেশালিস্ট) কথাটি মনে এলেই চয়ন ভাই (মামুনুর রহমান চয়ন), আশরাফুল ভাইয়ের (ইসলাম) কথা মনে আসে মানুষের ।
হকিস্টিক হাতে তুলে নেওয়ার শুরুটা কিভাবে? চয়নের উঠে আসা আপনাদের ফরিদপুর থেকে…
আমিরুল: ছেলেবেলায় পড়াশোনার চেয়ে খেলাধুলার দিকেই মনোযোগ ছিল বেশি। বলতে পারেন, একটু ডানপিটে ছিলাম। আমার বাবা শেখ আব্দুল বাশার, মায়ের নাম সাবিকুন্নাহার বিথী, দুই ভাই এক বোনের মধ্যে আমি দ্বিতীয়। বাবা বিজিবির চাকরি করতেন বলে অধিকাংশ সময় বাইরে থাকতেন, এ কারণে তার শাসন-বারণ তেমন ছিল না। তবে মা চাইতেন না খেলাধুলা নিয়ে পড়ে থাকি। হকিতে আঘাত, চোট পাওয়ার ভয় থেকেই মা চাইতেন না আমি হকি খেলি। তবে বিকেএসপিতে ২০১৬ সালে ভর্তি হওয়ার পর অবশ্য মা আর মানা করেননি। এর আগে অবশ্য ফুটবল, ক্রিকেটও খেলতাম।
হকির প্রতি আগ্রহের শুরুটা নানা কারণে। আমাদের ফরিদপুর থেকে চয়ন ভাইসহ (মামুনুর রহমান চয়ন, সাবেক অধিনায়ক) আরও অনেক হকি খেলোয়াড় উঠে এসেছে, জাতীয় দলের হয়ে খেলেছে। তাদের একটা প্রভাব আগে থেকেই ছিল। আমার এক কাকা নুরুল ইসলাম নুরু আমাকে হকিতে আসতেও বেশি উৎসাহ দিয়েছিলেন। তার হাত ধরে ২০১৫ সালে ইন্টার ইস্কুল হকিতে খেলেছিলাম। এর পরের বছর বিকেএসপিতে ভর্তি হলাম। হকির প্রতি আকর্ষণ আরও বাড়ল। ২০২২ সালে বিকেএসপি পর্ব শেষ করি; এখন পড়ছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবন নিয়ে বলুন তাহলে, বিশেষ করে হল জীবন।
আমিরুল: ইনফরমেশন সাইন্স অ্যান্ড লাইব্রেরি সাইন্স বিভাগে পড়ছি। মাস্টারদা সুর্যসেন হলে থাকি। হলে খুব বেশি থাকা হয় না, তবে যতটুকু সময় থাকি, হলের খাবার, বন্ধুদের সাথে আড্ডা ভীষণ উপভোগ করি। বাইরের জীবন থেকে হলের জীবন একেবারেই আলাদা, এটা আসলে বলে বোঝানো যাবে না।
এবার ভিন্ন প্রসঙ্গে আসি, ড্র্যাগ-ফ্লিকে তো হাত পাকিয়েছেন অনেকটা, যদি দুর্বলতা নিয়ে বলতে বলি…
আমিরুল: ডিফেন্স নিয়ে আমাকে আরও বেশি কাজ করতে হবে। ড্র্যাগ-ফ্লিকে আরও নিখুঁত হতে হবে। গোল করার পাশাপাশি গোল আটকানোর যে মূল কাজ, সেটা করতে হবে।
জাতীয় দলে নিজেকে নিয়ে স্বপ্ন…
আমিরুল: ২০২২ সালে জাতীয় দলে সুযোগ পাই; এশিয়ান গেমস দিয়ে। জাতীয় দলে ডাক পাওয়ার মুহূর্তটি ছিল অসাধারণ। গর্বের। এত দিন যে জার্সি গায়ে জড়ানোর জন্য পরিশ্রম করেছি, সেটা পাওয়ার আনন্দ আসলে বলে বোঝানো সম্ভব নয়। এখন সিনিয়র টিমের বিশ্বকাপে ভালো করতে চাই।
কিন্তু এই চাওয়া পূরণের পথটা তো মসৃণ নয় আপনাদের জন্য। নিয়মিত খেলাই তো হয় না।
আমিরুল: প্রথমত, এজন্য ফেডারেশনের একটা পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন। পৃষ্ঠপোষক, ক্লাবগুলোর সাথে বসে একটা রূপরেখা তৈরি করা প্রয়োজন। যেখানে ঘরোয়া টুর্নামেন্টগুলো আয়োজনের সঠিক কাঠামো থাকবে, নিয়মিত লিগ আয়োজনের নিশ্চয়তা থাকবে, এছাড়া দেশে ও দেশের বাইরের টুর্নামেন্টগুলোতে খেলার সুযোগ থাকতে হবে, যাতে করে অভিজ্ঞতার ঘাটতি আমরা পুষিয়ে নিয়ে বড় আসরে ভালো করতে পারি। দেখা যাক, আপনারা আমাদের জন্য দোয়া করবেন।
