১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

‘এটিই আমাদের মূল পরিচয়’, জয়ের পর স্কালোনির গর্জন

মিশরকে হারানোর পর আর্জেন্টিনা কোচ বললেন, এই জয় শুধু মেসির কৃতিত্ব নয়, সামগ্রিক দলীয় পারফরম্যান্সে জিতেছে তার দল।

স্পোর্টস ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 08 Jul 2026, 01:52 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:36 PM

প্রথম গোল ছিল একটি ধাক্কা। পরের গোল তো প্রচণ্ড আঘাত। জোড়া ঝাঁকুনিতে টালমাটাল আর্জেন্টিনা চলে গিয়েছিল খাদের কিনারায়। কিন্তু সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে যেভাবে ম্যাচটি জিতে নিল তারা, তাতেই যেন ফুটে উঠল এই দলের চরিত্র। বিশ্বকাপ ইতিহাসের স্মরণীয় এক প্রত্যাবর্তনের গল্প রচনা করে কোচ লিওনেল স্কালোনি বললেন, তার দল কখনও হাল ছাড়ে না।

পরিষ্কার ফেভারিট হয়ে মাঠে নামা আর্জেন্টিনা ম্যাচের বেশির ভাগ সময় পরিষ্কারভাবেই ছিল পিছিয়ে। বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর লড়াইয়ে পঞ্চদশ মিনিটে মিশরকে এগিয়ে দেন ইয়াসের ইব্রাহিম। ২০২২ বিশ্বকাপে প্রথম ম্যাচে সৌদি আরবের কাছে সেই পরাজয়ের ম্যাচটির পর এই প্রথমবার পিছিয়ে পড়ে তারা। 

সেই চমক রেখে ম্যাচে দাপট দেখিয়ে যায় মিশর। আর্জেন্টিনাকে মনে হচ্ছিল ম্রিয়মান। পেনাল্টি কাজে লাগাতে ব্যর্থ হওয়া লিওনেল মেসি ছিলেন নিজের ছায়া হয়ে।

দ্বিতীয়ার্ধে আর্জেন্টিনার জালে বল পাঠান মোস্তাফা জিকো। তবে ফাউলের কারণে ভিএআর দেখে গোল দেননি রেফারি। একটু পর সেই জিকো আবার গোল করেন। ৭৮ মিনিট পর্যন্ত সেই ২-০ ব্যবধান ধরে রাখে আফ্রিকার দলটি।

তখন কজন ভাবতে পেরেছিলেন, নির্ধারিত সময়েই ম্যাচ জিতে নেমে আর্জেন্টিনা!

৭৯তম মিনিটে ক্রিশ্চিয়ান রোমেরোর হেড ম্যাচেই জিইয়ে রাখে আর্জেন্টিনাকে। ৮৩তম মিনিটে মেসির গোলে ফেরে সমতা। মিনিট দশেক পর এন্সো ফের্নান্দেসের গোলে নাটকীয় জয়ে কোয়ার্টার-ফাইনালে পৌঁছে যায় বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা। 

এই নিয়ে টানা দুটি ম্যৌাচে প্রত্যাশিতভাবে কঠিন পরীক্ষায় পড়তে হলো আর্জেন্টিনাকে। আগের ম্যাচে কেইপ ভার্ডের বিপক্ষেও স্নায়ুক্ষয়ী লড়াইয়ের পর অতিরিক্ত সময়ে গিয়ে ৩-২ গোলে জিতেছিল তারা। এবার মিশরের সঙ্গে আরও বড় বাধা টপকে শেষ পর্যন্ত জয় আদায় করে নিল স্কালোনির দল।

আবেগাপ্লুত স্কালোনি ম্যাচের পর তেলেমুন্দোকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ঠিকমতো কথাই বলতে পারছিলেন না। 

“আমি চোখ তুলতে পারছি না... দুঃখিত, খুব আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছি। কী অসাধারণ একদল ফুটবলার আমার! ভাইয়েরা, আপাতত এটুকুই...।”

স্কালোনির চেয়ে বেশি আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিলেন অবশ্য লিওনেল মেসি। সমতা ফেরানো গোলটির পর যেভাবে উদযাপন করেন তিনি, অমন খ্যাপাটে উদযাপন কমই দেখা যায় তার। শেষ বাঁশি বাজার পর তো তার চোখ বেয়ে নামতে থাকে আবেগের বান। বিশ্বকাপ জয়ের পরও এতটা কাঁদদে দেখা যায়নি তাকে। 

ম্যাচ শেষে অনুবাদকের মাধ্যমে সাংবাদিকদের মেসি বললেন, দলের হার না মানা মানসিকতায় তিনি আপ্লুত। 

“আমরা স্বস্তি পেয়েছি। দুই গোলে পিছিয়ে থেকে ফিরে আসা সহজ ছিল না, কিন্তু আমি যেমনটা সবসময় বলি, এই দল কখনও হাল ছাড়ে না। এই নকআউট পর্বে আমাদের দল যা করেছে তা অবিশ্বাস্য এবং আমি খুবই খুশি।

আমাদের কোয়ার্টার-ফাইনালে ওঠা এবং এই সাফল্য যারা উদযাপন ও উপভোগ করতে পারছেন, তাদের জন্য আমি দারুণ খুশি। আশা করি, আমরা এই ধারা অব্যাহত রাখতে পারব।”

ম্যাচের শুরুর দিকে যদিও দুর্ভাগ্যের রেকর্ডে নাম লেখান মেসি, যখন তার পেনাল্টি ঠেকিয়ে দেন মিশরের গোলকিপার মোস্তাফা শুবির। আগের ম্যাচে পেনাল্টিতে তিনি বল মেরেছিলেন বাইরে। একই বিশ্বকাপে একাধিক পেনাল্টিতে ব্যর্থ প্রথম ফুটবলার তিনিই।

তবে পরে গোল করে ঠিকই নিজেকে রাঙান গৌরবের অর্জনে। বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলস্কোরার নিজের রেকর্ড আরও সমৃদ্ধ করেন ২১তম গোলে। ৯ গোল করে গোল্ডেন বলের লড়াইয়েও নিজেকে এগিয়ে নেন এক ধাপ। এছাড়াও বিশ্বকাপে টানা ৯ ম্যাচে গোল, নকআউটে টানা ছয় ম্যাচে গোল, এমন অনেক কীর্তি গড়া হয়ে তার। 

পেনাল্টিতে ব্যর্থতার পরও শেষ পর্যন্ত ম্যান অব দা ম্যাচ মেসিই। কোচ স্কালোনির মতে, এটিই ফুটিয়ে তুলছে এই জাদুকরের চরিত্রকে।  

“হয়তো সে একটা পেনাল্টি মিস করেছে, আপনি সেটিকেই তুলে ধরতে পারেন চাইলে। আমরা তো বাদ, ওরা দুই গোলে এগিয়ে গেল। কিন্তু তারপর মেসি আবার বল চাাইতে থাকল, বারবার চেষ্টা করে গেল… সত্যি বলতে, আমার গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে।”

"... আমি নিশ্চিত, এই ধরনের মুহূর্তগুলোর জন্যই ফুটবল খেলে সে। সে বল ভালোবাসে, সে বল নিয়ে খেলতে ভালোবাসে। তার ক্যারিয়ারের এই পর্যায়ে এই আবেগগুলো অনুভব করাটা ভাষায় প্রকাশ করা খুব কঠিন।”

জয়সূচক গোলে অবশ্য মেসির তেমন কোনো ভূমিকা ছিল না। হুলিয়ান আলভারেস একটি লম্বা বল বাড়ান লাউতারে মার্তিনেসের দিকে। তার দারুণ ক্রসে হেডে গোল করেন এন্সো ফের্নান্দেস। 

মেসির শ্রেষ্ঠত্বের প্রশংসার স্রোতে অন্যদের অবদান যেন ভেসে না যায়, সেটিও নিশ্চিত করতে চাইলেন স্কালোনি। 

“এটা শুধু মেসির কৃতিত্ব নয়। শুধু মেসিকে নিয়ে কথা বলতে চাই না, কারণ তার সতীর্থরাও অবিশ্বাস্যভাবে বাধা জয় করে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। এটিই আমাদের দলের মূল পরিচয়, যে দলটির নেতৃত্বে আমি আছি। এটা একটা বিশাল পরীক্ষা ছিল, যা আপনার উপর গভীর ছাপ ফেলে যায়, আপনার মনে এক বিশাল ছাপ রেখে যায়।।“

“যারা এই ম্যাচটি দেখেছে, যারা আর্জেন্টিনার জার্সি পরতে চায়, সেই সব তরুণ খেলোয়াড়দের জন্য এটি সামনের পথ দেখাচ্ছে। দিস ইজ হু উই আর… আমরা এমনই।”